জয়ের আনন্দের বজ্রনিনাদে তোমরা জাগো,
বীর রুশগণ, জয়-গৌরবে হও অগ্রসর!…
কবির দিকে সক্রোধে তাকিয়ে কাউন্ট রস্তভ ব্যাগ্রেশনকে অভিবাদন করল। কবিতার চাইতে ডিনার অধিক মূল্যবান–এটা বুঝতে পেরে সকলেই উঠে পড়ল। ব্যাগ্রেশন সকলের আগে আগে খাবার ঘরে ঢুকল।
ডিনারের ঠিক আগে কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ ছেলেকে ব্যাগ্রেশনের সামনে উপস্থিত করল। ব্যাগ্রেশন তাকে চিনতে পেরে কয়েকটা অসংলগ্ন কথা বলল, আর কাউন্ট ইলিয়া সানন্দে ও সগর্বে চারদিকে তাকাতে লাগল।
দেনিসভ ও নবপরিচিত দলখভকে সঙ্গে নিয়ে নিকলাস রস্তভ বসল টেবিলের প্রায় মাঝখানে। তাদের মুখোমুখি প্রিন্স নেসভিৎস্কির পাশে বসল পিয়ের। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ বসল ব্যাগ্রেশনের দিকে মুখ করে এবং মস্কো-আতিথেয়তার মূর্ত প্রতীক হিসেবে প্রিন্সের প্রতি সম্মান দেখাতে লাগল।
তার প্রচেষ্টা বৃথা গেল না। ডিনারটা চমৎকার হল, তবু খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত যেন তার স্বস্তি নেই। সবই ভালোয় ভালোয় শেষ হল। অবশেষে পরিচারক গ্লাসে গ্লাসে শ্যাম্পেন ঢালতে শুরু করল। কমিটির সদস্যদের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করে নিজের গ্লাসটা হাতে নিয়ে কাউন্ট উঠে দাঁড়াল। তার কথা শুনবার জন্য সকলেই চুপচাপ অপেক্ষা করতে লাগল।
আমাদের সার্বভৌম সম্রাটের স্বাস্থ্যের উদ্দেশ্যে, চেঁচিয়ে কথাগুলি বলতে গিয়ে আনন্দে ও উৎসাহে তার চোখ দুটি ভিজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ব্যান্ড বেজে উঠল জয়ের আনন্দের বজ্রনিনাদে তোমরা জাগোর সুরে। সকলে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, হুররা! ব্যাগ্রেশনও উঠে দাঁড়াল, যে কণ্ঠস্বরে শোন গ্রেবার্নের রণক্ষেত্রে চিৎকার করেছিল সেই স্বরেই বলে উঠল হুররা! তিনশো মানুষের গলাকে ছাপিয়ে শোনা গেল হোট স্তভের উচ্ছ্বাসপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তার প্রায় কেঁদে গলাকে ছাপিয়ে শোনা গেল ছোট রস্তভের উচ্ছ্বাসপূর্ণ কণ্ঠস্বর। তার প্রায় কেঁদে ফেলার উপক্রম হল। সগর্জনে বলল, আমাদের সার্বভৌম ম্রাটের স্বাস্থ্যের উদ্দেশে! হুররা! এক চুমুকে নিজের গ্লাসটা খালি করে সেটাকে মেঝেতে ছুঁড়ে দিল। অনেকেই তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করল, হৈ-চৈ চিৎকার চলল অনেকক্ষণ পর্যন্ত। সেটা থামলে পরিচারক মেঝে থেকে ভাঙা কাঁচের টুকরো সরিয়ে নিল, সকলে আবার আসনে বসে পড়ল। বুড়ো কাউন্ট আবার উঠে দাঁড়াল, থালার পাশে রাখা কাগজের দিকে তাকাল, তারপর বলল, আমাদের বিগত অভিযানের নায়ক প্রিন্স পিতর আইভানভিচ ব্যাগ্রেশনের স্বাস্থ্যের উদ্দেশে। তার নীল চোখ দুটো আবার ভিজে উঠল। তিনশো কণ্ঠস্বরে আবার ধ্বনি উঠল হুররা! এবার কিন্তু ব্যান্ড বাজল না, তার পরিবর্তে একদল গায়ক পল আইভানভিচ কুতুজভের (প্রধান সেনাপতি কুতুজভ নয়) রচনা একটি গীত-কাব্য গাইতে শুরু করল :
রুশগণ! সব বাধাতে পায়ে দলে চল এগিয়ে!
সাহসই তো জয়ের প্রতিশ্রুতি,
আমাদের কি ব্যাগ্রেশন নেই?
তার সম্মুখে শত্রু চিরপদানত… ইত্যাদি।
গান শেষ হতেই একের পর এক স্বাস্থ্য পানের প্রস্তাব হতে লাগল। আর কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ ক্রমেই অধিকতর চঞ্চল হতে লাগল, বেশি করে গ্লাস ভাঙা হল, চিৎকার হতে লাগল উচ্চ থেকে উচ্চতর। উপস্থিত সকলেরই স্বাস্থ্য পান করা হল, আর শেষপর্যন্ত ভোজসভার উদ্যোক্তা হিসেবে আলাদাভাবে স্বাস্থ্যপান করা হল কাউন্ট ইলিয়া রশুভের। সেইসময়ে কাউন্ট তার রুমালটা বের করে মুখ ঢেকে সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলল।
*
অধ্যায়-৪
পিয়ের বসেছে দলখব ও নিকলাস রস্তভের উল্টোদিকে। যথারীতি যথেষ্ট আগ্রহের সঙ্গে সে প্রচুর ভোজ্য ও পানীয় খেয়েছে। কিন্তু যারা তাকে ঘনিষ্ঠভাবে জানে তারা বুঝতে পারল যে সেদিন তার মধ্যে একটা মস্তবড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। সারাক্ষণ সে নীরবে চারদিকে তাকাল, অথবা স্থির দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অন্যমনস্কভাবে নাকের নিচু জায়গাটা ঘষতে লাগল। তার মুখ বিষণ্ণ, গম্ভীর। চারদিকে যা কিছু চলছে তার কিছু যেন তার চোখেও পড়ছে না, কানেও ঢুকছে না। মনে হল, যেন একটা দুঃখদায়ক অমীমাংসিত সমস্যার মধ্যেই সে ডুবে আছে।
মস্কোতে আসার পরে তার বোন প্রিন্সেস তার স্ত্রীর সঙ্গে দলখভের ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কে ইঙ্গিত করেছে, এবং আজই সকালে একটা বেনামী চিঠি সে পেয়েছে যাতে বেনামী চিঠির স্বাভাবিক নিচ রসিকতার সঙ্গে বলা হয়েছে যে চশমার ভিতর দিয়ে দেখে বলে সে ঠিকমতো না দেখতে পেলেও দলখভের সঙ্গে তার স্ত্রীর সম্পর্কটা একমাত্র তার কাছে ছাড়া আর কারো কাছেই গোপন নেই–এটাই হচ্ছে সেই অমীমাংসিত সমস্যা যা তাকে কষ্ট দিচ্ছে। প্রিন্সেসের ইঙ্গিত এবং বেনামী চিঠি দুটোকেই পিয়ের সম্পূর্ণ অবিশ্বাস করছে, কিন্তু এখন দলখভের দিকে তাকাতে তার ভয় করছে। যতবার দলখভের সুন্দর উদ্ধর চোখ দুটির দিকে চোখ পড়ছে ততবারই একটা ভয়ংকর দানবিয় কিছু তার মনের মধ্যে মাথা তুলছে, আর অতি দ্রুত সে চোখ সরিয়ে নিয়েছে। তার স্ত্রী অতীত জীবন এবং দলখভের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা স্মরণ করে পিয়ের পরিষ্কার বুঝতে পারল যে চিঠিতে যা বলা হয়েছে তা সত্যি হতেও পারে, অন্তত তার স্ত্রীর ব্যাপার না হলে সত্যি বলে মনে হতে পারত।
