সারা মস্কো জুড়ে লোকের মুখে মুখে ফিরতে লাগল দলগরুকভের উক্তি : অনবরত যদি মূর্তি গড়া চলতে থাকে তাহলে তো হাতে কাদামাটি লাগবেই। অস্তারলিজে আমাদের অফিসার ও সৈনিকদের ব্যক্তিগত সাহসিকতার নতুন নতুন ঘটনার কথা শোনা যেতে লাগল। একজন পতাকাকে রক্ষা করেছে, একজন মেরেছে পঁচজন ফরাসিকে, কেউ বা এক হাতে পাঁচটা কামানে বারুদ ঠেসেছে। বেৰ্গকে যারা চেনে না তারা বলতে লাগল, ডান হাতে আঘাত লাগলে সে বাঁ হাতে তরবারি নিয়ে সামনে ছুটে গিয়েছিল। বলকনস্কির কথা কিছুই শোনা গেল না, শুধু যারা তাকে ঘনিষ্ঠভাবে জানত তারা দুঃখ করতে লাগল-আসন্নপ্রসবা স্ত্রীকে ছিটগ্রস্ত বাবার কাছে রেখে বেচারি বড় অকালেই মারা গেল।
*
অধ্যায়-৩
৩ মার্চ ইংলিশ ক্লাবের সবগুলি ঘর বসন্তকালের মৌমাছিদলের গুঞ্জনের মতো নানা মানুষের কলগুঞ্জনে ভরে উঠল। ক্লাবের সদস্য ও অতিথিরা এখানে-ওখানে ঘুরছে, বসছে, দাঁড়াচ্ছে, একত্র হচ্ছে। আবার সরে যাচ্ছে, কারো পরনে ইউনিফর্ম, কারো বা সান্ধ্যপোশাক, আবার এখানে-ওখানে কেউ বা চুলে পাউডার মেখে গায়ে রুশ কাফতান চড়িয়েছে। উপস্থিত লোকদের মধ্যে অধিকাংশই প্রবীণ সম্ভ্রান্ত মানুষ, আত্মবিশ্বাসে ভরা চওড়া মুখ, মোটা আঙুল এবং দৃঢ় অঙ্গভঙ্গি ও কণ্ঠস্বর। কিছু কিছু সামরিক অতিথিও এসেছে, তারা অধিকাংশই যুবক, যেমন দেনিসভ, রস্তভ ও দলখভ।
নেসভিস্কি সেখানে এসেছে ক্লাবের পুরোনো সদস্য হিসেবে। স্ত্রীর হুকুমে পিয়ের বড় বড় চুল রেখেছে, চশমা পরা ছেড়ে দিয়েছে। তোমাফিক পোশাক পরে সে এ-ঘর ও-ঘর ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে বড়াই বিষণ্ণ ও নির্জীব দেখাচ্ছে।
কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ ব্যস্তসমস্ত হয়ে নরম জুতো পায়ে একবার খাবার ঘর একবার বসবার ঘর করছে, সাধারণ ও অসাধারণ সকল পরিচিত জনকেই সমানভাবে সাদরে অভ্যর্থনা করছে, আর বার বার ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপছে। ছোট রস্তভ দলখভকে নিয়ে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে, সম্প্রতি দলখভের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে, আর সে পরিচয়কে সে যথেষ্ট মূল্যবান মনে করে। বুড়ো কাউন্ট তাদের কাছে এগিয়ে এসে দলখভের হাতটা চেপে ধরল।
দয়া করে আমাদের বাড়িতে এস…আমার সাহসী ছেলেকে তুমি তো চেন…সেখানে তো একসঙ্গে ছিলে…দুজনই তো বীর…আরে, ভাসিলি ইগনাভিচ যে…কেমন আছেন? একটি বুড়ো মানুষকে দেখে কথাটা বলতে না বলতেই সকলে চঞ্চল হয়ে উঠল, আর পরিচারক ভীত মুখে ঘোষণা করল : তিনি এসে গেছেন!
ঘণ্টা বেজে উঠল, নায়েব-গোমস্তারা ছুটে বেরিয়ে গেল, নানা ঘরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অতিথিরা বড় বসবার ঘরে এসে নাচ-ঘরের দরজার কাছে ভিড় করল।
দ্বারপথে ব্যাগ্রেশনের আবির্ভাব হল, মাথায় টুপি নেই, হাতে তলোয়ার নেই, ক্লাবের রীতি অনুসারে সেগুলি দরোয়ানের হাতে দিয়ে এসেছে। তার পরনে একটা নতুন আঁটসাট ইউনিফর্ম, তাতে রুশ ও বিদেশী সম্মান-স্মারক এবং সেন্ট জর্জ তারকা লাগানো। দেখেই বোঝা যায় ডিনারে আসবার আগে সে চুল ও জুলফি হেঁটেছে, তাতে তাকে আরো খারাপই দেখাচ্ছে। অদ্ভুত সলজ্জ ভঙ্গিতে সে অভ্যর্থনা-কক্ষের কাঠের কাজ করা মেঝের উপর দিয়ে হাঁটতে লাগল, হাত দুটোকে নিয়ে যে কি করবে বুঝে উঠছে না, শোন গ্রেবার্নে কুন্ঠ রেজিমেন্টের প্রধান হিসেবে যেমন গোলাবর্ষণের ভিতর দিয়ে চষা ক্ষেত পেরিয়ে তাকে ছুটতে হয়েছিল তেমন চলাতেই সে অভ্যস্ত-সেটাই তার পক্ষে সহজতর। কমিটির সদস্যরা দরজাতেই ব্যাগ্রেশকে ঘিরে ধরল, এমন একজন মহামান্য অতিথিকে দেখতে পেয়ে তারা তাদের আহ্লাদের কথা শোনাতে লাগল। এদিকে কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ হাসতে হাসতে বারবার পথ ছেড়ে দাও বাবা! পথ ছাড়! পথ ছাড়! বলতে বলতে সোৎসাহে ভিড় ঠেলে অতিথিদের ভিতরে ঢুকিয়ে মাঝখানের সোফাটায় তাকে বসিয়ে দিল। তারপরেই কাউন্ট ইলিয়া ভিড় ঠেলে বেরিয়ে গেল এবং এক মিনিট পরে একটা মস্ত বড় রুপোর থালা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকে থালাটা প্রিন্স ব্যাগ্রেশনকে উপহার দিল। সেই থালায় রয়েছে বীরের সম্মানে রচিত ও মুদ্রিত কয়েকটি কবিতা। রুপোর থালার দিকে তাকিয়ে ব্যাগ্রেশন সভয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল, যেন কারো সাহায্য খুঁজছে। কিন্তু সকলের চোখেই এক কথা-ওটা গ্রহণ করা হোক। অগত্যা দুই হাত বাড়িয়ে সে থালাটা নিল এবং সেটা উপহার দেবার জন্য কঠোর তিরস্কারের দৃষ্টিতে কাউন্টের দিকে তাকাল। একজন কেউ থালাটা তার হাত থেকে নিয়ে কবিতাগুলোর দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ওঃ, এগুলো তাহলে পড়তে হবে! মুখে না বললেও ব্যাগ্রেশনের ভাবভঙ্গিতে এইরকমই মনে হল। কিন্তু কবি স্বয়ং কবিতাগুলি তুলে নিয়ে উচ্চকণ্ঠে পড়তে শুরু করল। ব্যাগ্রেশন মাথা নিচু করে শুনতে লাগল :
আলেক্সান্দারের শাসনকালকে তুমি গৌরবে ভরিয়ে তোল,
সিংহাসনে রক্ষা কর আমাদের টাইটাসকে,
পাত্ররূপে তুমি ভয়ংকর, আবার মানুষ হিসেবে দয়ার অবতার,
স্বদেশে তুমি হৃফিউস, আর রণক্ষেত্রে তুমি সিজার!
এমন কি ভাগ্যবান যে নেপোলিয়ন।
সেও অভিজ্ঞতায় তোমাকে চিনেছে ব্যাগ্রেশন,
তাই তো হারকিউলিস সদৃশ রুশদের ঘাটাতে সে সাহস করে না…
পড়া শেষ হবার আগেই ঘোষণা করা হল, ডিনার তৈরি! দরজা খুলে গেল, আর খাবার ঘর থেকে ভেসে এল পলোনেসের সুর :
