প্রিন্সেস পোশাক তুলে অন্ধকার গাড়িতে তার আসনে উঠে বসল। তার স্বামী তরবারিটা ঠিকমতো রাখতে ব্যস্ত। তাদের সাহায্য করতে গিয়ে প্রিন্স হিপোলিৎ দুজনেরই অসুবিধা ঘটাতে লাগল।
প্রিন্স হিপোলিৎ তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে থাকায় প্রিন্স আন্দ্রু অসন্তুষ্ট গলায় রুক্ষ ভাষায় বলল, আমাকে করতে দিন স্যার পরে সেই একই লোক দ্র সাদর গলায় বলল, তোমাকে কিন্তু আশা করব পিয়ের।
ঘোড়া পা তুলল; গাড়ির চাকায় খটখট শব্দ উঠল। প্রিন্স হিপোলিৎ ফটকে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে, ভাইকেতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল; তাকে সে বাড়ি পৌঁছে দেবে বলে কথা দিয়েছে।
গাড়িতে হিপোলিৎতের পাশে বসে ভাইকোঁত বলল, দেখুন প্রিয় বন্ধু, আপনার এই ছোট প্রিন্সেসটি খুব ভালো, পুরোদস্তুর ফরাসি; সে তার আঙুলের ডগায় চুমো খেল। হিপোলিং হো-হো করে হেসে উঠল।
ভাইকোঁত বলল, আপনি কি জানেন, যতই ভালোমানুষেমি দেখান, আসলে আপনি সাংঘাতিক ছেলে। বেচারি স্বামী, সেই ছোট অফিসারটি এমন ভাব দেখায় যেন সে একজন রাজাগজা। তাকে দেখে আমার করুণা হয়।
হিপোলিৎ হাসতে হাসতে মুখে থুথু ছিটিয়ে বলল, আর আপনি বলছিলেন যে রুশ মহিলারা ফরাসিদের সমকক্ষ নয়? তাদের সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে সেটা জানতে হয়!
অন্য সকলের আগে পৌঁছে পিয়ের স্বচ্ছন্দে প্রিন্স আর পড়ার ঘরে ঢুকে পড়ল এবং অভ্যাসমতো সঙ্গে সঙ্গে একটা সোফায় শুয়ে পড়ে প্রথম যে বইটা হাতে পড়ল (সিজারের কমেন্টারিস) সেটাই তুলে নিয়ে কনুইতে ভর দিয়ে মাঝখান থেকে পড়তে শুরু করল।
ছোট ছোট সাদা হাত দুখানি ঘষতে ঘষতে পড়ার ঘরে ঢুকে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, মাদময়জেল শেরেরের সঙ্গে তুমি কি করেছ? তিনি তো এখনই অসুস্থ হয়ে পড়বেন।
পিয়ের গোটা শরীরটাকে মোড় ফেরাল; সোফাটা মচ মচ করে উঠল। আগ্রহে প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকিয়ে হেসে হাতটা নাড়ল।
মঠাধ্যক্ষটি লোক ভালো, কিন্তু বিষয়টিতে তিনি সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে জানেন না।…আমার মতে, শাশ্বত শান্তি সম্ভব, কিন্তু কীভাবে যে কথাটা বলব বুঝতে পারছি না…রাজনৈতিক শক্তি-সাম্যের দ্বারা নয়…
স্পষ্টতই এ ধরনের বিমূর্ত আলোচনায় প্রিন্স আন্দ্রু আগ্রহী নয়।
একটু চুপ করে থেকে সে প্রশ্ন করল, প্রিয় বন্ধু, মনের সব কথা কেউ সর্বত্র বলতে পারে না। আচ্ছা, শেষপর্যন্ত তুমি কি কোনো সিদ্ধান্তে এসেছ? তুমি কি হতে চাও, সৈনিক না কূটনীতিক?
পিয়ের উঠে পা ভেঙে সোফার উপর বসল।
আসলে আমি নিজেই এখনো জানি না। দুটোর কোনোটাই আমি পছন্দ করি না।
কিন্তু তোমাকে তো একটা সিন্ধান্ত নিতেই হবে! তোমার বাবা সেটাই আশা করেন।
পিয়েরের যখন দশ বছর বয়স তখন একজন মঠাধ্যক্ষকে গৃহশিক্ষক রূপে সঙ্গে নিয়ে তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং বিশ বছর বয়স পর্যন্ত সে বিদেশেই ছিল। সে যখন মস্কো ফিরে এল তখন তার বাবা মঠাধ্যক্ষকে বিদায় দিয়ে ছেলেকে বলল, এবার পিটার্সবুর্গে চলে যাও, চারদিক দেখ, নিজের জীবিকা বেছে নাও। তুমি যা করবে তাতেই আমি রাজি। এই নাও প্রিন্স ভাসিলিকে লেখা চিঠি, আর এই নাও টাকা। তিন মাস ধরে পিয়ের জীবিকা খুঁজেই বেড়াচ্ছে, এখনো কিছুই স্থির করতে পারে নি। জীবিকা খুঁজে নেবার কথাই প্রিন্স আন্দ্রু বলছিল। পিয়ের কপাল ঘষতে লাগল।
যে মঠাধ্যক্ষটির সঙ্গে সন্ধ্যায় পরিচয় হয়েছিল তার কথা উল্লেখ করে সে বলল, কিন্তু তিনি তো অবশ্যই ভ্রাতৃসংঘের একজন পরোপকারী লোক।
প্রিন্স আন্দ্রু পুনরায় তাকে বাধা দিয়ে বলল, ওসব বাজে কথা রাখ। অশ্বারোহী রক্ষী বিভাগে গিয়েছিলে কি?
না, যাই নি; কিন্তু সেই কথাই আমি ভাবছি, আর তোমাকেও বলতে চাই। এখন যুদ্ধ হচ্ছে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে। এটা যদি মুক্তির যুদ্ধ হত তাহলে আমি সেটা বুঝতে পারতাম এবং সকলের আগে সেনাবাহিনীতে ঢুকতাম; কিন্তু পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটির বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রিয়াকে সাহায্য করা ঠিক কাজ নয়।
পিয়েরের ছেলেমানুষের মতো কথা শুনে প্রিন্স আন্দ্রু শুধু কাঁধ ঝাঁকুনি দিল। সে এমন ভাব দেখাল যেন এরকম অর্থহীন কথার কোনো জবাব দেওয়াই অসম্ভব। কিন্তু এই অতিসরল প্রশ্নের যে জবাব সে দিল তাছাড়া অন্য কোনো জবাব দেওয়া সত্যি খুব কঠিন।
সে বলল, নিজের বিশ্বাসের তাগিদ ছাড়া কেউ যদি যুদ্ধ না করত, তাহলে তো কোনো যুদ্ধই হত না।
আর সেটাই তো হত চমৎকার, পিয়ের বলল।
প্রিন্স আন্দ্রু ব্যঙ্গের হাসি হাসল।
হয়তো চমৎকারই হত, কিন্তু সেটা কোনোদিনই হবে না…।
আচ্ছা, তুমি যুদ্ধে যাচ্ছ কেন? পিয়ের প্রশ্ন করল।
কিসের জন্য? জানি না। আমাকে যেতে হবেই। তাছাড়া আমি যাবি… সে থামল। আমি যাচ্ছি কারণ এখানে আমি যে জীবন যাপন করছি সেটা আমার ভালো লাগছে না!
*
অধ্যায়-৭
পাশের ঘরে মেয়েদের পোশাকের খসখস শব্দ শোনা গেল। প্রিন্স আন্দ্রু ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো নড়েচড়ে উঠল। আন্না পাভলভনার বসবার ঘরে তার মুখে যে ভাব ছিল সেই ভাবটাই ফিরে এল । পিয়ের সোফার উপর থেকে পা নামাল। প্রিন্সেস ঘরে ঢুকল। সে গাউন ছেড়ে একটা নতুন সুন্দর আটপৌরে পোশাক পরেছে। প্রিন্স আন্দ্রু উঠে বিনীতভাবে একটা চেয়ার এগিয়ে দিল।
আরাম কেদারায় ভালোভাবে বসে সে যথারীতি ফরাসি ভাষায় বলল, আন্নেতের বিয়ে হয় নি কেন? তোমরা পুরুষরা এতই অপদার্থ যে তার বিয়েটাও দিতে পার নি! এ কথা বলার জন্য আমাকে ক্ষমা কর, কিন্তু সত্যি মেয়েদের সম্পর্কে তোমাদের কোনো ধারণাই নেই। আপনি তো আচ্ছা তর্কপ্রিয় মানুষ মঁসিয় পিয়ের!
