মার্চের গোড়াতে প্রিন্স ব্যাগ্রেশনের সম্মানে ইংলিশ ক্লাবে একটা ডিনারের ব্যবস্থাপনার কাজে বুড়ো কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ড্রেসিং-গাউনটা পরে হলঘরে পায়চারি করতে করতে কাউন্ট ক্লাবের ভাণ্ডারী ও প্রধান রাঁধুনিকে ডিনারের খাদ্যতালিকার নির্দেশ দিচ্ছে। রাঁধুনি ও ভাণ্ডারীও খুশি মনে মনোযোগসহকারে সব শুনছে, কারণ তারা জানে যে কয়েক হাজার রুবল ব্যয় করে কাউন্ট যে ডিনার দেবে এবং তাতে তাদের যে মোটা অংকের লাভ হবে, অন্য কোথাও তেমনটি হবে না।
এমন সময় দরজায় হাল্কা পায়ের শব্দ ও বুটের খটখট আওয়াজ শোনা গেল। ঘরে ঢুকল ছোট কাউন্ট। সুদর্শন চেহারা, গোলাপি রং, কালো ছোট গোঁফ : মস্কোর নিরুপদ্রব জীবনের প্রতিচ্ছবি যেন।
ছেলের সামনে কিছুটা বিব্রত বোধ করে স্মিত হাসির সঙ্গে বুড়ো কাউন্ট বলল, এস বাবা, আমার মাথাটা ঘুরছে! তুমি যদি একটু সাহায্য কর। গায়কদের ব্যবস্থাও তো আমাকে করতে হবে। আমার অর্কেস্ট্রা তো থাকছেই, কিন্তু জিপসি গায়কদের আনা কি উচিত নয়? তোমরা মিলিটারি মানুষরা তো আবার ওসবই পছন্দ কর।
ছেলেও হেসে বলল, সত্যি বাপি, আমার তো বিশ্বাস তোমাকে এখন যতটা চিন্তিত দেখছি, শোন গ্ৰেবার্ন যুদ্ধের আগে স্বয়ং প্রিন্স ব্যাগ্রেশনও ততটা চিন্তিত হননি।
বুড়ো কাউন্ট রাগের ভান করল।
হ্যাঁ, মুখেই বলা যায়, একবার চেষ্টা করে দেখ না!
কাউন্ট রাঁধুনির দিকে ঘুরে দাঁড়াল। বলল, আজকালকার ছেলেরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে দেখছ ফিয়োকতিস্তা খালি বুড়োদের নিয়ে ঠাট্টা!
যা বলেছেন হুজুর, ওদের কাজ শুধু ভালো বাল খানা খাওয়া, কিন্তু সে সবের ব্যবস্থা করা, পরিবেশন করা, সেটা ওদের কাজ নয়!
কাউন্ট চেঁচিয়ে বলল, ঠিক, ঠিক! তারপর দুই হাতে ছেলেকে ধরে খুশিভরে বলল, এবার তোমাকে পেয়েছি, এখনই স্লেজ ও ঘোড়া ঠিক কর, বেজুখভের বাড়িয়ে গিয়ে তাকে বলবে, কাউন্ট ইলিয়া তোমাকে পাঠিয়েছে স্ট্রবেরি ও তাজা আপেলের জন্য। অন্য কারো কাছ থেকে ওগুলো নেওয়া চলবে না। তিনি এখন বাড়ি নেই, কাজেই তোমাকে ভিতরে গিয়ে প্রিন্সেসকে বলতে হবে। সেখান থেকে যাবে রাসগুল্যায়-কোচয়ান ইপাকা সব জানে-জিপসি ইলিউশকাকে খুঁজে বের করবে, তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে শাদা কসাক কোট পরে সে কাউন্ট অর্লভ-এর বাড়িতে নেচেছিল, তাকে সঙ্গে করেই নিয়ে আসবে।
নিকলাস হেসে বলল, জিপসি মেয়েগুলোকেও সঙ্গে নিয়ে আসব না কি? কী যে বল তুমি…
ঠিক সেই সময় নিঃশব্দ পায়ে ঘরে ঢুকল আন্না মিখায়লভনা। আস্তে চোখ বুঝে সে বলল, কিছু ভাববেন না কাউন্ট। আমি নিজে যাব বেজুখভের বাড়ি। পিয়ের এসে পড়েছে, এখন আমরা তার সজি-ঘর থেকে সব কিছুই পাব। তার সঙ্গে তো আমাকে দেখা করতেই হবে। বরিসের একটা চিঠি সে আমাকে পাঠিয়েছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, তার এখন পদোন্নতি হয়েছে।
আন্না মিখায়লভনা একটা কাজের ভার নেওয়ায় কাউন্ট খুশি হল, তার জন্য ছোট ঢাকা গাড়িটা আনতে বলে দিল।
বেজুখভকে আসতে বলে দেবেন। তার নামটা লিখে নিচ্ছি। তার স্ত্রীও কি সঙ্গে এসেছে?
আন্না মিখায়লভনা চোখ তুলে তাকাল, গভীর বিষণ্ণতা আঁকা তার মুখে।
বলল, কি জানেন, সে বড়ই দুর্ভাগা। যা শুনেছি তা যদি সত্যি হয় তাহলে তো ভয়ংকর কথা। তার সুখে আমরা যখন নৃত্য করছিলাম তখন তো এ-কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। আর তরুণ বেজুখভের মতো এমন দেবদূতের মতো মহৎ যার মন। সত্যি, তার জন্য আমার করুণা হয়, সাধ্যমতো সান্ত্বনা তাকে দেব।
চোট ও বড় রস্তভ দুজনেই জিজ্ঞাসা করল, ব্যাপার কি?
আন্না মিখায়লভনা বড় করে নিঃশ্বাস ফেলল।
অস্ফুট রহস্যময় স্বরে বলল, সকলে বলছে, মারি আইভানভনার ছেলে দলখভ মেয়েটিকে সম্পূর্ণ কজা করে ফেলেছে। পিয়ের তাকে সঙ্গে করে পিটার্সবুর্গে নিজের বাড়িতে নিয়ে এল, আর এখন…মেয়েটি এখানে এসেছে আর সেই দুঃসাহসী লোকটাও তার পিছু নিয়েছে। আন্না মিখায়লভ কথাগুলি বলল পিয়েরের প্রতি সহানুভূতি জানাতে, কিন্তু নিজের অজ্ঞাতেই তার কথায় প্রকাশ পেল দুঃসাহসী দলখভের জানাতে, কিন্তু নিজের অজ্ঞাতেই তার কথায় প্রকাশ পেল দুঃসাহসী দলখভের প্রতি সহানুভূতি। লোকে বলছে, এই দুর্ভাগ্যের ফলে পিয়ের একেবারেই ভেঙে পড়েছে।
আহা, আহা! কিন্তু তবু তাকে ক্লাবে আসতে বলবেন-ওসব কিছু উড়ে যাবে। যা দারুণ একটা ভোজসভা হবে না!
পরদিন ৩ মার্চ একটা পর থেকেই ইংলিশ ক্লাবের আড়াইশো সদস্য ও পঞ্চাশজন নিমন্ত্রিত অতিথি অস্ট্রিয়া অভিযানের নায়ক ও সম্মানিত অতিথি প্রিন্স ব্যাগ্রেশনের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল।
অস্তারালিজ যুদ্ধের খবর যখন প্রথম এল তখন মস্কো একেবারে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। সেসময় রুশ জনসাধারণ জয়লাভে এতই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে অনেকে পরাজয়ের খবরটা বিশ্বাসই করল না, আবার অনেকে এরকম একটা অদ্ভুত খবরের নানা রকম অসাধারণ ব্যাখ্যা দিতে শুরু করল। রাশিয়ার পরাজয়ের এই অবিশ্বাস্য, অশ্রুতপূর্ব ও অসম্ভব ঘটনার কারণ খুঁজে বের করা হল, সকলেই সবকিছু বুঝে ফেলল, আর মস্কোর মোড়ে মোড়ে একই কথা বলা হতে লাগল। সে কারণগুলি হল অস্ট্রিয়দের বিশ্বাসঘাতকতা, কমিসারিয়েটের ত্রুটি-বিচ্যুতি, পোল সেনাপতি প্রেবিজেউস্কি ও ফরাসি লাগারোর বিশ্বাসঘাতকতা, কুতুজভের অক্ষমতা, এবং (এ কথাটা বলা হল চুপি চুপি) সম্রাটের অল্প বয়স ও অভিজ্ঞতার অভাব-যার ফলে সে যত সব অযোগ্য ও তুচ্ছ লোকদের উপর বড় বেশি ভরসা করেছিল। কিন্তু একটা কথা সকলেই সমস্বরে ঘোষণা করল-সেনাদল-রুশ সেনাদল–অসাধারণ, তাদের সাহস অঘটন ঘটিয়েছে। কি সৈনিক, কি অফিসার, কি সেনাপতি, সকলেই বীর। কিন্তু সব বীরের সেরা বীর প্রিন্স ব্যাগ্রেশন, শোন গ্রেবার্নের ঘটনা এবং অস্তারলিজ থেকে পশ্চাদপসরণ তাকে বিখ্যাত করেছে। ভলতেয়ারের উক্তির নকল করে রসিক শিনশন বলল, ব্যাগ্রেশন নামে যদি কেউ না থাকত তো একজন ব্যাগ্রেশকে আবিষ্কার করা দরকার হত। কুতুজভের নাম কেউ মুখেই আনল না, শুধু কেউ কেউ চুডপ চুপি গালাগাল দিয়ে তাকে বলল চঞ্চলমতি এক ভ্রষ্টচরিত্র যক্ষবিশেষ।
