হাত দুটি দুলিয়ে নাতাশা ঘাঘড়াটাকে নাচিয়েদের মতো তুলে ধরে কয়েক পা পিছিয়ে গেল, ঘুরে দাঁড়াল, নাচের ভঙ্গিতে ছোট পা দুটোকে একত্র জুড়ে একেবারে আঙুলের ডগায় ভর করে কয়েক পা এগিয়ে গেল।
বলল, দেখ, কেমন দাঁড়িয়ে আছি! দেখ! আমার মন এখন এতেই পড়ে আছে! কাউকেই আমি বিয়ে করব না, আমি হব নৃত্যশিল্পী। এ-কথা কাউকে বল না যেন।
রস্তভ হো-হো করে হেসে উঠল, নাতাশাও সে হাসিতে যোগ না দিয়ে পারল না। সে পুনরায় বলল, না, কিন্তু ব্যাপারটা বেশ মজার নয় কি?
মজা! তাহলে এখন আর তুমি বরিসকে বিয়ে করতে চাও না?
নাতাশা অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। কাউকেই আমি বিয়ে করতে চাই না। তার সঙ্গে দেখা হলে তাকেও এই কথাই বলে দেব।
বেচারী! রস্তভ বলল।
নাতাশার মুখে কথার ফোয়ারা, যত সব বাজে! দেনিসভ খুব ভালো, তাই না?
হ্যাঁ, সত্যি ভালো।
ও, ঠিক আছে, চলি : যাও, পোশাক পরে এস। সে কি খুব ভয়ংকর, মানে দেনিসভ?
নিকলাস বলল, ভয়ংকর কেন? না, ভাস্কা চমৎকার মানুষ।
তুমি তাকে ভাস্কা বল? মজার তো! সে কি খুব ভালো!
খুব।
ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি কর। আমরা একসঙ্গে প্রাতরাশে বসব।
নাতাশা উঠল, ব্যালে-নর্তকীর মতো আঙুলের উপর ভর দিয়ে বেরিয়ে গেল, তার মুখে সেই হাসি যা একমাত্র সুখী পঞ্চদশীরাই হাসতে পারে। বসবার ঘরে সোনিয়ার সঙ্গে দেখা হতেই রভের মুখ লাল হয়ে উঠল। সোনিয়ার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করবে বুঝতে পারছে না। কাল সন্ধ্যায় প্রথম দর্শনের খুশির মুহূর্তে পরস্পরকে চুমো খেয়েছিল, কিন্তু এখন তার মনে হল, সেটা করা যাবে না। সে সোনিয়ার হাতে চুমো খেল, তাকে তুমি বলে সে সম্বোধন করল। কিন্তু তাদের চোখে-চোখে মিলন হল, চোখের ভাষা বলল তুই, চোখে-চোখেই হল চুম্বন-বিনিময়। নাতাশার মারফৎ সে রস্তভকে তার প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, চোখের চাউনি দিয়েই সে ক্ষমা চেয়ে নিল, তাকে ভালোবাসার জন্য রস্তভকে ধন্যবাদও জানাল। রস্তবও তার চাউনি দিয়ে নিজের মুক্তির জন্য সোনিয়াকে ধন্যবাদ জানাল, তাকে জানিয়ে দিল যেভাবেই হোক সে কোনোদিন তাকে ভালোবাসা থেকে বিরত হবে না, কারণ সেটা অসম্ভব।
সকলে চুপ করলে একসময় ভেরা সুযোগ বুঝে বলে উঠল, কী আশ্চর্য যে সোনিয়া ও নিকলাস আজ পরস্পরকে বলছে তুমি, আর মিলিত হচ্ছে অপরিচিতের মতো।
অন্য সবসময়ের মতোই এখনো ভেরা খাঁটি কথাটিই বলল, কিন্তু তাতে সকলেই কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতে লাগল, শুধু সোনিয়া, নিকলাস ও নাতাশাই নয়, বুড়ি কাউন্টেস পর্যন্ত ভয় পেল যে এই প্রেমের ব্যাপারটা হয় তো নিকলাসের উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, তাই ছোট মেয়ের মতো সেও লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।
রস্তভকে অবাক করে দিয়ে দেনিসভ ঘরে ঢুকল, তার চুলে পমেড মাখানো, শরীরে আতর ছিটানো, পরনে নতুন ইউনিফর্ম। যুদ্ধযাত্রার সময় যেমন চটপটে ছিল এখনো তাকে তেমন দেখাচ্ছে, উপস্থিত মহিলা ও ভদ্রজনদের সঙ্গে সে এমন অমায়িক ব্যবহার শুরু করল যা রস্ত তার কাছ থেকে আশাই করেনি।
*
অধ্যায়-২
সেনাবাহিনী থেকে মস্কো ফিরে এলে নিকলাস রশুভকে নানাভাবে স্বাগত জানানো হল। বাড়ির লোকরা তাকে স্বাগত জানাল শ্রেষ্ঠ সন্তান, বীর ও তাদের প্রিয় নিকোলেংকারূপে, আত্মীয়-স্বজনরা স্বাগত জানাল একটি মনোহর, আকর্ষণীয় ভদ্র যুবকরূপে, আর পরিচিতজনরা স্বাগত জানাল একজন সুদর্শন হুজার-লেপটেন্যান্ট, ভালো নাচিয়ে ও শহরের শ্রেষ্ঠ ভাবী বররূপে।
রস্তভরা মস্কোতে সকলেই চেনে। সব সম্পত্তি নতুন করে মর্টগেজ রাখায় বুড়ো কাউন্টের হাতে যথেষ্ট টাকা এসেছে। তাই দিয়ে মনের মতো একটা ঘোড়া কিনে, অতি আধুনিক ছাটকাটের পোশাকপত্র বানিয়ে নিকলাস বেশ ফুর্তিতেই দিন কাটাতে লাগল। পুরোনো জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে কিছুদিন কাটাবার পরেই বাড়িতে বাস করাটা তার কাছে আবার বেশ প্রীতিপদ হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, তার বয়স বেড়েছে, চরিত্রে পরিপক্কতা এসেছে। সে এখন একজন হুজার-লেফটেন্যান্ট, গায়ে রুপো ফিতে বসানো কুর্তা, যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য প্রদত্ত সেন্ট জর্জ ক্রশ লাগানো বুকের উপর, এখন সে নিজের ঘোড়া নিয়ে রেসের শিক্ষানবিশী করছে পরিচিত, প্রবীণ ও শ্রদ্ধেয় রেসুড়েদের কাছে। কোনো মহিলার সঙ্গে রাজপথে পরিচয় হলে সে একদা সন্ধ্যায় তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। আর্থারভদের বল-নাচে সে মাজুকা নেচেছে, ফিল্ড-মার্শাল কামেনস্কির সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছে, ইংলিশ ক্লাবে গিয়েছে, দেনিসভের পরিচিত চল্লিশ বছরের জনৈক কর্নেলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয়েছে।
মস্কোতে আসার পরে ম্রাটের প্রতি অনুরাগে কিছুটা ভাটা পড়েছে। তবু প্রায়ই সে সম্রাটের কথা ও তার প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা বলে। মস্কোতে এখন সকলেই সম্রাটকে দেবদূতের অবতার বলে থাকে, সে মনোভাবের সেও একজন অংমীদার।
সোনিয়ার সঙ্গে এখন আর সে বেশি মেলামেশা করে না, বরং একটু দূরে দূরেই থাকে। তার কতা মনে হলেই সে নিজেকে বোঝায়, আঃ, এরকম মেয়ে তো কোথাও না কোথাও আরো অনেক আছে, আরো অনেক থাকবে। ইচ্ছা যখন হবে তখন ভালোবাসার কথা ভাববার অনেক সময় পাওয়া যাবে, কিন্তু এখন আমার সময়। নেই। তাছাড়া, তার ধারণা মহিলাদের সমাজ তার মনুষ্যত্বের পক্ষে অসম্মানকর। সে যে বল-নাচে বা মহিলাদের মহলে যাতায়াত করে সেটা ইচ্ছার বিরুদ্ধেই করে। অবশ্য ঘোড়দৌড়, ইংলিশ ক্লাব, দেনিসভের সঙ্গে গিয়ে ফুর্তিকরা, কোনো একটি বিশেষ বাড়িতে যাতায়াত–সেসব অন্য ব্যাপার, একজন উঠতি হুজারের পক্ষে সেগুলি দরকার।
