ভাসিলি দেনিসভের ফাসফেঁসে গলা শোনা গেল, আরে, গয়িশকা–আমার পাইপ! হেই রস্তভ, উঠে পড়!
রস্তভ চোখ রগড়াতে রগড়াতে গরম বালিশের উপর থেকে এলোমেলো মাথাটা তুলল।
আরে, অনেক দেরি হয়ে গেছে না কি?
দেরি! এখন তো প্রায় দশটা বাজে, নাতাশার গলা শোনা গেল। পাশের ঘর থেকে ভেসে এল মাড় দেওয়া পেটিকোটের খসখস ও অনেক মেয়ের হাসি ও ফিস ফিস শব্দ। সশব্দে দরজাটা খুলে গেল, নীল ফিতে, কালো চুল ও হাসি মুখের ঝিলিক দেখা দিল দরজা। দুজন ঘুম থেকে উঠেছে কিনা তাই দেখতে এসেছে নাতাশা, সোনিয়া ও পেতয়া।
নাতাশার গলা আবার শোনা গেল, নিকলাস! উঠে পড়!
এক্ষুণি উঠছি!
এদিকে বাইরের ঘরে তরবারি দেখে সেটা হাতে নিয়ে পেতয়া শোবার ঘরের দরজাটা খুলে ফেলল, পোশাক ছাড়ার সময় মেয়েদের যে পুরুষদের দেখতে পাওয়াটা শোভন নয় সে-কথা সে একেবারেই ভুলে গেল। হাঁক দিয়ে বলল, এটা কি তোমার তলোয়ার?
মেয়েরা লাফ দিয়ে একপাশে সরে গেল। সাহায্যের জন্য ভীত মুখে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে দেনিসভ তাড়াতাড়ি তার লোমশ পা দুটি কম্বলের নিচে লুকিয়ে ফেলল। পেতয়া ঘরে ঢুকতেই দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। ওপার থেকে হাসির হররা উঠল।
নিকলাস! ড্রেসিং-গাউনটা পরে বেরিয়ে এস। নাতাশার গলা শোনা গেল।
পেতয়া বলল, এটা কি তোমার তলোয়ার? না কি তোমার? পরের প্রশ্নটা করল কালো গোঁফওয়ালা দেনিসভকে।
রস্তভ তাড়াতাড়ি একটা কিছু পায়ে গলিয়ে ড্রেসিং-গাউনটা টেনে নিয়ে বেরিয়ে এল। সকলে মিলে বসবার ঘরে গিয়ে আড্ডা জমাল। হাজার তুচ্ছ কথা নিয়ে চলল প্রশ্ন আর উত্তরের পালা। প্রতিটি কথায় উছলে পড়তে লাগল নাতাশার হাসি। যা শোনে তাতেই সে বলে, আঃ, কী সুন্দর, কী চমৎকার!
ভালোবাসার এই উষ্ণ আলোর প্রভাবে রস্তভ মনে মনে বুঝতে পারল, বাড়ি থেকে চলে যাবার পর থেকে যে শিশুসুলভ হাসি একদিনের জন্যও ফোটেনি তার মুখে, আঠারো মাস পরে এই প্রথম সে হাসি আবার তার অন্তরকে, তার মুখকে উদ্ভাসিত করে তুলেছে।
নাতাশা বলল, না, আমার কথা শোন। তুমি তো এখন একটা পুরুষ মানুষ হয়ে উঠেছ, না কি বল? তুমি আমার দাদা এ-কথা ভাবতেও ভালো লাগছে। নাতাশা তার গোঁফ জোড়া স্পর্শ করল। তোমরা পুরুষরা কী রকম হয়ে ওঠ জানতে ইচ্ছা করে। আমাদের মতোই কি না?
সোনিয়া পালিয়ে গেল কেন? রস্তভ জিজ্ঞেস করল।
তাই তো! সে অনেক কথা! ওকে তুমি কী বলে ডাকবে–তুই, না তুমি? রস্তভ বলল, সে যা হয় হবে।
না, ওকে তুমি বলে ডেক, বুঝলে! পরে তোমাকে সব বলব। না, এখনই বলছি। তুমি তো জান, সোনিয়া আমার প্রিয়তম বন্ধু। এমন বন্ধু যে তার জন্য আমার হাতটাই পুড়িয়েছি। এই দেখ।
মসলিনের আস্তিনটা তুলে নাতাশা দেখাল, সুন্দর হাতটার কনুইয়ের উপরে একটা লাল দাগ।
ওকে যে ভালোবাসি সেটা প্রমাণ করতেই হাতটা পুড়িয়ে দিয়েছি। একটা রুল-কাঠি আগুনে গরম করে এখানে চেপে ধরেছিলাম!
রস্তভ ব্যাপারটা বুঝতে পারল, মোটেই অবাক হল না। প্রশ্ন করল, বাস, এই সব?
আমরা দুজন এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু! রুল-কাঠির ব্যাপারটা অবশ্য খুবই বাজে, কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব চিরদিনের। ও যদি কাউকে ভালোবাসে তো সারা জীবনের জন্যই ভালোবাসে, কিন্তু আমি ও ব্যাপারটা বুঝি না, তাড়াতাড়িই ভুলে যাই।
বেশ তো, তারপর?
দেখ, আমাকে ও তোমাকে ও সেইভাবেই ভালোবাসে।
নাতাশা হঠাৎ লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল।
কেন, চলে যাবার আগের কথা তো তোমার মনে আছে?… দেখ, ও বলছে তুমি যেন সে-সব ভুলে যাও।… ও বলে : আমি তাকে চিরদিন ভালোবাসব, কিন্তু সে মুক্ত থাকুক। এটা কি মধুর ও মহৎ নয়! সত্যি, খুব মহৎ, কী বল?
রস্তভ ভাবতে লাগল।
বলল, আমি কখনো কথার খেলাপ করি না। তাছাড়া, সোনিয়া এতই মনোহারিণী যে একমাত্র কোনো নির্বোধই সে সুখ বিসর্জন দেবে।
নাতাশা চেঁচিয়ে বলল, না, না। আমরা দুজন এ-কথা আলোচনা করেছি। আমরা জানতাম, তুমি এই কথাই বলবে। কিন্তু তা চলবে না, কারণ ভেবে দেখ, তুমি যদি এ-কথা বল–তুমি যদি মনে কর যে তুমি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ–তাহলে মনে হবে যে এটা সোনিয়ার মনের কথা নয়। এতে মনে হবে যে বাধ্য হয়েই তুমি তাকে বিয়ে করছ, কিন্তু সেটাই চলবে না।
রস্তভ বুঝল, ব্যাপারটা নিয়ে এরা ভালোভাবেই ভাবনা-চিন্তা করেছে। আগেরদিন সোনিয়ার রূপ দেখে সে মুগ্ধ হয়েছে। আজ এক ঝলক দেখেই তাকে আরো মনোরমা মনে হয়েছে। সে এখন ষোড়শী সুন্দরী, তাকে একান্তভাবে ভালোবাসে (এ বিষয়ে তার মনে কোনো সন্দেহ নেই) আজ কেন সে তাকে ভালোবাসবে না, বিয়ে করবে না? কিন্তু এই মুহূর্তে তার সামনে রয়েছে আরো অনেক সুখ, অনেক আকর্ষণ! সে ভাবল, হ্যাঁ, ওরা যথাযথ সিদ্ধান্তই নিয়েছে। আমাকে মুক্ত থাকতেই হবে।
বলল, বেশ তো, তাই ভালো। পরে এ বিষয়ে কথা হবে। আঃ, তোমাদের কাছে পেয়ে কী ভালো যে লাগছে!
তারপর বলল, আচ্ছা, বরিসের প্রতি এখনো তোমার সেই মনোভাব আছে তো?
নাতাশা হেসে উঠল, আঃ, যত বাজে কথা! তার কথা, বা অন্য কারো কথাই আমি ভাবি না, ওরকম কোনো ব্যাপারেই আমি নেই।
তাই বুঝি! তাহলে এখন তোমার মনটা কোথায় আছে?
এখনো? নাতাশার মুখে খুশির হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল। তুমি দুপোর্তকে দেখেছ?
না।
বিখ্যাত নতশিল্পী দুপোর্তকে দেখনি? তাহলে বুঝবে না। আমার মনটা সেখানেই আছে।
