হ্যাঁ স্যার, আর ওই আলোটা আপনার বাবার পড়ার ঘরের।
তাহলে তারা এখনো শুতে যায়নি? তোমার কি মনে হয়? ভালো কথা, আমার নতুন কোটটা বের করতে ভুলো না কিন্তু, নতুন গোঁফে আঙুল বুলিয়ে রস্তভ বলল। তারপর কোয়ানকে হাঁক দিয়ে বলল, আরে, চালাও। দেনিসভের দিকে ফিরে বলল, উঠে পড়ো ভাস্কা! তাদের দরজার তিনটে বাড়ি আগে পৌঁছতেই রস্তভ আবার হেঁকে বলল চালাও-ভদকার জন্য তিন রুবল পাবে। তার মনে হল, ঘোড়াগুলো মোটেই নড়ছে না। শেষপর্যন্ত স্লেজটা ডাইনে ঘুরে একটা ফটকের সামনে থামল, রস্তভ মাথার উপরে দেখতে পেল খানিকটা প্লাস্টার ভাঙা পরিচিত কার্নিসটা, ফটকটা, ফুটপাথের থামটা। স্লেজটা থামার আগেই সে লাফিয়ে নেমে দৌড়ে হলঘরে ঢুকল। বাড়িটা নির্বিকার, নিশ্চুপ, যেন কে এসেছে সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই। হলে কেউ নেই। হা ঈম্বর! সকলে ভালো আছে তো? মুহূর্তের জন্য থেমে সে ভাবল, আর পরক্ষণেই পরিচিত সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। দরজার অতি-পরিচিত সেই পুরনো হাতলটা তেমনই সহজেই ঘুরে গেল। ছোট ঘরটাতে একটিমাত্র চর্বি-বাতি জ্বলছে।
বুড়ো মাইকেল সিন্দুকের উপর ঘুমিয়ে আছে। পরিচারক প্রকফি খোলা দরজার দিকে তাকাল, আর অমনি তার মুখের ঘুমন্ত উদাসীনতার বদলে সেখানে ফুটে উঠল সানন্দ বিস্ময়।
তরুণ মনিবকে চিনতে পেরে সে চেঁচিয়ে উঠল, হায় ঈশ্বর! ছোট কাউন্ট যে! এও কি হতে পারে? মানিক আমার! উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে সে বসার ঘরের দরজার দিকে ছুটে গেল, সম্ভবত তার আসার কথা জানাতেই, কিন্তু সে ইচ্ছা ত্যাগ করে ফিরে এসে যুবকটির কাঁধে চুমো খাবার জন্য ঝুঁকে দাঁড়াল।
সকলে ভালো তো? রস্তভ জিজ্ঞেস করল।
হ্যাঁ, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! হা! এইমাত্র সকলের খাওয়া শেষ হয়েছে। আপনাকে একবার ভালো করে দেখি ইয়োর এক্সেলেন্সি।
সত্যি, সকলে ভালো আছে তো?
ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, সকলেই ভালো।
দেনিসভের কথা রস্তভ একেবারেই ভুলে গিয়েছিল। তার আসার কথাটা অন্য কেউ আগে থেকে জেনে ফেলুক এটা সে চায় না, তাই লোমের কোটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে বলনাচের ঘরটার ভিতর দিয়ে পা টিয়ে টিপে ছুট দিল। সবকিছু আগের মতোই আছে : সেই পুরনো তাসের টেবিল, সেই ঢাকনাদেওয়া ঝাড়লণ্ঠন, কিন্তু একজন এর মধ্যেই নতুন মনিবটিকে চিনে ফেলেছে, সে বসার ঘরে পৌঁছবার আগেই পাশের দরজা দিয়ে কে যেন ঝড়ের গতিতে ছুটে এসেই তাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেতে লাগল। তারপর আর একজন, আরো একজন দ্বিতীয় ও তৃতীয় দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল, আরো বেশি করে আদর, বেশি করে চুমো খাওয়া, হৈ-চৈ, আনন্দাশ্রু। রস্তভ বুঝতেই পারছে না কে বাপি, কে নাতাশা, আর কে পেতয়া। সকলেই এক সঙ্গে হৈচৈ করছে, কথা বলছে, চুমো খাচ্ছে। তার খেয়াল হল, শুধু মা আসেনি।
আমি কি জানতাম না… নিকলাস… সোনা আমার…!
এই তো এসেছে… আমাদের আপনজন… কলিয়া, সোনা… ও কেমন বদলে গেছে!…মোমবাতিগুলো কোথায়?… চা!…
আর আমি, আমাকে চুমো খাও!
সোনারে… আর আমি!
সোনিয়া, নাতাশা, পেতয়া আন্না মিখায়লভনা, ভেরা ও বুড়ো কাউন্ট সকলেই তাকে আদর করতে লাগল, ভূমিদাস, চাকর-বাকর, দাসীরা সকলেই ঘরের মধ্যে ভিড় করে হৈ-চৈ শুরু করে দিল।
পেতয়া অনবরত চেঁচাচ্ছে, আর আমাকেও!
চারদিকে ভালোবাসা মাখা চোখগুলি আনন্দের অশ্রুজলে চিকচিক করছে, চারদিকে সবগুলি ঠোঁটেই চুম্বনের আহ্বান।
গোলাপরাঙা সোনিয়াও হাত চেপে ধরে একদৃষ্টিতে তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বয়স এখন ষোল, সে সুন্দরী, বিশেষত এই আনন্দঘন মুহূর্তে। বুড়ি কাউন্টেস এখনো আসেনি। দরজায় পায়ের শব্দ শোনা গেল, সে শব্দ এত দ্রুত যে তার মায়ের পায়ের শব্দ হতে পারে না।
কিন্তু মাই এসেছে, পরনে একটা নতুন গাউন, এটা সে দেখে যায়নি। তার চলে যাবার পরে তৈরি করা হয়েছে। রস্তভ মার কাছে ছুটে গেল। মা তার বুখে মুখ রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মা মুখ তুলতেও পারছে না, ছেলের হুজার জ্যাকেটের উপর মুখটা চেপে ধরে আছে। সকলের অলক্ষ্যে দেনিসভ সেখানে এসে দাঁড়িয়েছিল, এই দৃশ্য দেখে সেও চোখ মুছতে লাগল।
কাউন্টের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টির উত্তরে আত্মপরিচয় দিয়ে দেনিসভ বলল, আমি ভাসিলি দেনিসভ, আপনার ছেলের বন্ধু।
দেনিসভকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেয়ে কাউন্ট বলল, এ বাড়িতে তুমি সুস্বাগত! আমি জানি, আমি জানি। নিকলাস আমাদের লিখেছিল ।… নাতাশা, ভেরা, দেখ! এই দেনিসভ!
খুশিতে ডগমগ মুখগুলি দেনিসভের দিকে ঘুরে গেল।
একলাফে দেনিসভের কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেয়ে নাতাশা আনন্দে অধীর হয়ে বলল, প্রিয় দেনিসভ! তার এই দুরন্তপনায় সকলেই বিব্রত বোধ করল। দেনিসভ লজ্জা পেলেও হেসে নাতাশার হাতটা ধরে তাতে চুমো খেল।
দেনিসভকে তার জন্য নির্দিষ্ট ঘরটা দেখিয়ে দেওয়া হল, আর রস্ত পরিবারের সকলেই বসবার ঘরে গিয়ে নিকলাসকে ঘিরে বসল।
বুড়ি কাউন্টেস ছেলের হাতটা ধরেই আছে, প্রতি মুহূর্তে তাতে চুমো খাচ্ছে। ভাই-বোনরা তার কাছাকাছি বসবার জন্য ঠেলাঠেলি করছে, কে তার জন্য চা, রুমাল ও পাইপ এনে দেবে তাই নিয়ে ঝগড়া করছে।
সকলের এই ভলান্ত যাত্রী দুজন বেলা দাগ ছড়িয়ে আছে। দুজোড়াকামাবার গরম পানিও
পরদিন সকালে পথশ্রান্ত যাত্রী দুজন বেলা দশটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটাল। পাশের ঘরে তলোয়ার, থলে, তলোয়ারের খাপ, খোলা পোর্টম্যান্টো, নোংরা জুতা সব ছড়িয়ে আছে। দুজোড়া নতুন পালিশ-করা জুতো এইমাত্র দেয়ালের পাশে এনে রাখা হয়েছে। চাকররা হাজির হল জগ ও বেসিন, দাড়ি কামাবার গরম পানিও ব্রাশ-করা পোশাক নিয়ে। ঘরময় তামাকেও গন্ধ।
