রক্তক্ষরণজনিত দুর্বলতা, যন্ত্রণা ও মৃত্যুর নৈকট্য তার মনে যে কঠোর, গম্ভীর চিন্তাকে জাগিয়ে তুলেছে তার তুলনায় এখন সবকিছুই তুচ্ছ ও অর্থহীন মনে হচ্ছে। নেপোলিয়নের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু শুধু ভাবতে লাগল মহত্ত্বেরও অর্থহীনতা, যে জীবন বুদ্ধির অতীত তার গুরুত্বহীনতা, এবং যে মৃত্যুর অর্থ জীবিত মানুষের বুদ্ধি ও ব্যাখ্যার অতীত তার অধিকতর গুরুত্বহীনতার কথা।
জবাবের জন্য অপেক্ষা না করে সম্রাট ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল, যেতে যেতেই জনৈক অফিসারকে বলল, এইসব ভদ্রলোকদের উপযুক্ত সেবাযত্ন ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দাও, ডাক্তার ল্যারে ওদের পরীক্ষা করুক। আ রিভোয়া প্রিন্স রেপনিন! বলে সে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
আত্মতুষ্টি আর খুশিতে তার মুখটা জ্বলজ্বল করতে লাগল।
যে সৈনিকরা প্রিন্স আন্দুকে বয়ে এনেছিল তারা তার বোনের নিজের হাতে পরিয়ে দেয়া সোনার ছোট দেবমূর্তিটা দেখতে পেয়ে গলা থেকে খুলে নিয়েছিল, কিন্তু সম্রাট বন্দিদের প্রতি যে অনুগ্রহ দেখিয়ে গেল তাতে তারা তাড়াতাড়ি সেটা ফিরিয়ে দিল।
কে যে কেমন করে ছোট দেবমূর্তিটা তার গলায় পরিয়ে দিল সেটা প্রিন্স আন্দ্রু দেখতে পায়নি, কিন্তু এখন বুঝতে পারল যে সোনার চেনসহ মূর্তিটাকে হঠাৎই ইউনিফর্মের উপর দিয়ে তার বুকের উপর রেখে দেয়া হয়েছে।
বোনের দেয়া দেবমূর্তিটির দিকে তাকিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, মারির কাছে সবকিছুই যেমন পরিষ্কার ও সরল মনে হয়, আসলে তাহলে কতই না ভালো হত! বেঁচে থাকতে কার কাছে সাহায্যের প্রার্থনা জানাতে হবে, আর কবরের ওপারে গিয়েই বা কী আশা করতে হবে, তা জানতে পারলে কতই না ভালো হত। এখন যদি বলতে পারতাম, হে প্রভু, আমাকে দয়া করো! তাহলে আমি কত না সুখী, কত না শান্ত হতে পারতাম! …কিন্তু কাকে সে কথা বলব? হয় এমন কোনো সংজ্ঞার অতীত জ্ঞানের অতীত শক্তিকে যাকে সম্বোধন করতে আমি জানি না, ভাষায় প্রকাশ করতেও পারি না–সেই মহান অদ্বৈত অথবা শূন্য-অথবা সেই ঈশ্বরকে মারি যাকে এই রক্ষা কবচের সঙ্গে সেলাই করে দিয়েছে! কিছুই তো নিশ্চিত নয় : আমি যা কিছু বুঝি তার গুরুত্বহীনতা এবং অজ্ঞেয় অথচ একান্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছুর মহত্ত্ব ছাড়া আর সবকিছুই অনিশ্চিত।
স্ট্রেচারগুলো এগিয়ে চলল। প্রতিটি ঝাঁকুনির সঙ্গে সঙ্গে সে আবার অসহ্য যন্ত্রণা বোধ করতে লাগল, জ্বরভাবটা বেড়ে গেল, বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ল। বাবা, স্ত্রী, বোন ও ভাবী পুত্রের ছবি, যুদ্ধের আগের রাত্রির কোমল অনুভূতি, ছোট নেপোলিয়নের সাধারণ মূর্তি, আর সবার উপরে ওই সুউচ্চ আকাশ-বিকারের ঘোরে এসবই তার মনে ভিড় করতে লাগল।
চোখের সামনে ভেসে উঠল শান্ত পারিবারিক জীবন ও বন্ড হিলসের শান্তিপূর্ণ সুখের ছবি। এই সুখেই সে বিভোর হয়েছিল, এমন সময় ছোট্ট নেপোলিয়ন সহসা এসে হাজির হল অপরের দুঃখদুর্দশায় তার সহানুভূতিহীন ও অদূরদর্শী আনন্দ নিয়ে, তারই ফলে তার মনে জাগল সন্দেহ ও যন্ত্রণা, এখন একমাত্র স্বৰ্গই দিতে পারে প্রতিশ্রুত শান্তি। সকলের দিকে এইসব স্বপ্ন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল অচৈতন্য ও বিস্মৃতির এক বিশৃঙ্খল অন্ধকারে। নেপোলিয়নের ডাক্তার ল্যারের মতে, এ অবস্থার পরিণামে আরোগ্য নয়, মৃত্যুর সম্ভাবনাই অধিক।
ল্যারে বলল, সে স্নায়বিক দুর্বলতা ও পিত্তবিকারে ভুগছে, আর কখনো সুস্থ হবে না।
এদিকে মারাত্মকভাবে আহত অন্য সকলের সঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রুকে রেখে দেয়া হল স্থানীয় অধিবাসীদের আশ্রয়ে।
০৪.১ ১৮০৬ সালের গোড়ার দিকে
চতুর্থ পর্ব – অধ্যায়-১
১৮০৬ সালের গোড়ার দিকে নিকলাস রস্তভ ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরে এল। দেনিসভ তার বাড়ি ভরোনেঝেই যাচ্ছিল, রস্তভ অনেক বলে কয়ে তার সঙ্গে মস্কো পর্যন্ত যেতে এবং সেখানে তার সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটাতে রাজি করাল। মস্কোর আগে শেষ ডাক ঘাঁটির আগেকার ঘাঁটিতে জনৈক সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হওয়ায় দেনিসভ তার সঙ্গে বসে তিন বোতল মদ গিলেছিল, তাই বরফঢাকা পথের ঝাঁকুনি সত্ত্বেও মস্কোর পথে একটি বারের জন্যও তার ঘুম ভাঙল না, রস্তভের পাশে স্লেজের তলাতে শুয়েই কাটিয়ে দিল, মস্কোর যত কাছাকাছি এগোতে লাগল রস্তভ ততই অধৈর্য হয়ে উঠল।
শহরের ফটকে তাদের ছুটির অনুমতিপত্র পাশ হবার পরে মস্কোতে ঢুকতেই রস্তভ ভাবতে লাগল, আর কতদূর? আঃ, যতসব অসহ্য রাস্তাঘাট, দোকানপাট, রুটিওয়ালাদের সাইনবোর্ড, রাস্তার বাতি আর স্লোজগাড়ি!
পুরো শরীরটা নিয়ে সামনে ঝুঁকে সে বলে উঠল, দেনিসভ! আমরা এসে পড়েছি! ও দেখছি ঘুমিয়ে পড়েছে।
দেনিসভ জবাব দিল না।
ওই তো চৌমাথার মোড়, ওখানেই তো কোচয়ান জাখারের আস্তানা, ওই তো জাখার স্বয়ং, আর সেই ঘোড়াটাই আছে! ওই তো সেই ছোট দোকানটা যেখান থেকে আমরা আদার বিস্কুট কিনতাম! তাড়াতাড়ি। চলতে পারছ না? এই তো!
কোন বাড়িটা? কোচয়ান জিজ্ঞেস করল।
কেন, ওই যে ডানদিকে শেষ বাড়িটা, দেখতে পাচ্ছ না? ওটাই আমাদের বাড়ি, রস্তভ বলল।
অবশ্যই ওটা আমাদের বাড়ি। দেনিসভ, দেনিসভ, আমরা পৌঁছে গেছি!
দেনিসভ মাথা তুলে কাশল, কথা বলল না।
কোচবাক্সের উপর বসে থাকা খানসামাকে ডেকে রস্তভ বলল, দিমিত্রি, ওই আলোগুলো তো আমাদের বাড়ির, তাই না?
