দুজন এড-ডি-কংসহ স্বয়ং নেপোলিয়ন এসেছে। ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির হয়ে নেপোলিয়ন চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে, অগেসদ বাঁধের উপর গোলাবর্ষণকারী কামানের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে, আর নিজে ঘুরে ঘুরে তাদের দেখছে যারা নিহত ও আহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে আছে।
একটি মৃত রুশ বোমানিক্ষেপকারী উপুড় হয়ে পড়ে আছে, মাথা ও কালো ঘাড়টা মাটির মধ্যে ঢুকে গেছে, শক্ত হাতটা টান টান হয়ে ছড়িয়ে আছে। তার দিকে তাকিয়ে নেপোলিয়ন বলল, চমৎকার সৈনিক এরা!
গোলাবর্ষণকারী কামানশ্রেণীর কাছ থেকে ছুটে এসে একজন অ্যাডজুটান্ট বলল, এই কামানগুলোর বারুদ ফুরিয়ে গেছে ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি।
নেপোলিয়ন বলল, রিজার্ভ থেকে কিছুটা আনিয়ে নাও। কয়েক পা এগিয়ে প্রিন্স আন্দ্রুর সামনে থেমে গেল। সে চিৎ হয়ে পড়ে আছে, তার পাশেই পড়ে রয়েছে পতাকাদণ্ডটা। (জয়ের স্মারক হিসেবে পতাকাটা ফরাসিরা নিয়ে গেছে।)
বলকনস্কির দিকে তাকিয়ে থেকে নেপোলিয়ন বলল, বড় চমৎকার মৃত্যু!
প্রিন্স আন্দ্ৰ বুঝল তাকে লক্ষ্য করেই কথাটা বলা হয়েছে, আর বলেছে নেপোলিয়ন। বক্তাকে যে স্যার বলে সম্বোধন করা হয়েছে সেটা সে শুনেছে। কিন্তু কথাগুলি তার কানে এসেছে মাছির গুঞ্জনের মতো। সে কোনো আগ্রহ দেখাল না, খেয়ালও করল না, সঙ্গে সঙ্গেই ভুলে গেল। মাথার ভিতরটা জ্বলছে, মনে হচ্ছে, রক্তক্ষরণের ফলে তার মৃত্যু এগিয়ে আসছে, মাথার উপর দেখতে পেল সেই সুদূর, সুউচ্চ, চিরন্তন আকাশ।
সে বুঝতে পারল এই লোকটিই নেপোলিয়ন–তার আদর্শ–কিন্তু সেই মুহূর্তে চলমান মেঘসহ ওই সুউচ্চ অসীম আকাশ ও নিজের মধ্যে যে লীলা চলেছে তার তুলনায় নেপোলিয়নকে বড়ই ক্ষুদ্র আর তুচ্ছ বলে মনে হল। কে তার উপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে, কে তার সম্পর্কে কী বলছে, এই মুহূর্তে সে-সবই তার কাছে অর্থহীন, এই যে-সব লোকজন তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তাতেই সে খুশি, সে শুধু চাইছে যে বেঁচে উঠতে তারা তাকে সাহায্য করুক, জীবন তার কাছে আজ নতুন করে অর্থবহ হয়ে উঠেছে, সুন্দর হয়ে দেখা দিয়েছে। সর্বশক্তি একত্র করে সে একটু নড়তে চেষ্টা করল, কিছু বলতে চাইল। আস্তে আস্তে পাটা ছড়িয়ে এমন দুর্বল । রুগ্ন কণ্ঠে সে আর্তনাদ করে উঠল যে তার নিজেরই করুণা হল।
নেপোলিয়ন বলে উঠল, আহা! এ যে বেঁচে আছে! এই যুবককে তুলে নিয়ে কোনো ড্রেসিং-স্টেশনে পৌঁছে দাও।
এই কথা বলে নেপোলিয়ন মার্শাল ল্যানেসের সঙ্গে দেখা করতে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল, মার্শালও টুপিটা হাতে নিয়ে হাসি মুখে এগিয়ে এসে জয়লাভের জন্য সম্রাটকে অভিনন্দন জানাল।
প্রিন্স আন্দ্রুর আর কিছুই মনে নেই : স্ট্রেচারে তোলার ভয়ংকর যন্ত্রণায়, বয়ে নিয়ে যাওয়ার ঝাঁকুনিতে এবং ড্রেসিং-স্টেশনে ক্ষতস্থান কাটাছেঁড়ার ফলে সে জ্ঞান হারাল। দিনের শেষে অন্য বন্দি রুশ অফিসারদের সঙ্গে তাকেও যখন একটা হাসপাতালে পাঠিয়ে দিল তখন তার জ্ঞান ফিরে এল। নিয়ে যাওয়ার পথে সে কিছুটা শক্তি ফিরে পেল, চারদিকে তাকাতে পারল, এমনকি কথা বলতেও পারল।
জ্ঞান ফিরে পেয়ে প্রথমেই সে শুনতে পেল একজন ফরাসি কনভয় অফিসারের কথা, সে দ্রুতলয়ে বলছে, এখানেই আমাদের থামতে হবে : এখনই সম্রাট এখান দিয়ে যাবেন, এই বন্দি ভদ্রলোকদের দেখলে তিনি খুশি হবেন। আর একজন অফিসার বলল, আজ এত বেশি লোক বন্দি হয়েছে, বলতে গেলে গোটা রুশ বাহিনী, সম্রাট সম্ভবত বন্দিদের ব্যাপারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
সাদা ইউনিফর্মধারী একজন রুশ অফিসারকে দেখিয়ে প্রথম অফিসার বলল, ঠিক আছে! শুনেছি, এই লোকটি সম্রাট আলেক্সান্দারের রক্ষীবাহিনীর অধিনায়ক।
বলকনস্কি প্রিন্স রেপনিনকে চিনতে পারল, পিটার্সবুর্গের উঁচু মহলে তার সঙ্গে অনেকবার দেখা হয়েছে। তার পাশেই অশ্বারোহী রক্ষীবাহিনীর আর একজন আহত অফিসার দাঁড়িয়েছিল, তার বয়স মাত্র উনিশ।
বোনাপার্ত জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে থামল।
বন্দিদের দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করল, প্রধান কে?
তারা কর্নেল প্রিন্স রেপনিনের নাম করল।
নেপোলিয়ন জিজ্ঞেস করল, আপনি সম্রাট আলেক্সান্দারের অশ্বারোহী রক্ষী রেজিমেন্টের অধিনায়ক?
আমি একটি ছোট দল পরিচালনা করি।
আপনার রেজিমেন্ট সসম্মানে নিজ কর্তব্য পালন করেছে।
একজন মহান অধিনায়কের প্রশংসাই একটি সৈনিকের কাছে সবচাইতে বড় পুরস্কার।
সানন্দে আপনাকে সে পুরস্কার দিলাম। আপনার পাশে এই যুবকটি কে?
প্রিন্স রেপনিন লেফটেন্যান্ট সুখতেলেনের নাম করল।
তার দিকে তাকিয়ে নেপোলিয়ন হাসল।
আমাদের কাজের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ার পক্ষে সে বড় বেশি তরুণ।
জড়ানো কণ্ঠে সুখতেলের বলল, তারুণ্য তো সাহসের পথে বাধা নয়।
নেপোলিয়ন বলে উঠল, চমৎকার জবাব! যুবক, তুমি অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারবে!
প্রিন্স আন্দ্রুকে সম্রাটের সামনে হাজির করা হল। তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে দেখার কথা নেপোলিয়নের মনে পড়ে গেল, তাকেও যুবক বলে সম্বোধন করে বলল, তারপর, সাহসী যুবক, তুমি কেমন আছ?
যে সৈনিকরা তাকে এখানে বয়ে এনেছে পাঁচ মিনিট আগেও প্রিন্স আন্দ্রু তাদের সঙ্গে কিছু কথা বলেছে, কিন্তু এখন নেপোলিয়নের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে সে চুপ করে রইল। …যে মহান, নিরপেক্ষ, সদয় আকাশকে সে আজ দেখেছে, তার অর্থ বুঝেছে, তার সঙ্গে তুলনায় এই মুহূর্তে নেপোলিয়নের সব কর্মকাণ্ডকে তার কাছে এতই অকিঞ্চিৎকর মনে হল, তার আদর্শ নায়কের তুচ্ছ অহংকার ও জয়ের আনন্দ তার কাছে এতই ছোট মনে হল, যে নেপোলিয়নের প্রশ্নের কোনো জবাবই সে দিতে পারল না।
