নিজের দুর্বলতাই যে তার এই দুঃখের কারণ এই অনুভূতিই তার হতাশাকে আরো বাড়িয়ে তুলল।
সম্রাটের কাছে সেও তো এগিয়ে যেতে পারত… পারত নয়, যাওয়াই উচিত ছিল। সম্রাটের প্রতি অনুরাগ প্রকাশের একটা অনবদ্য সুযোগ এসেছিল তার সামনে। সে সুযোগ সে নিতে পারেনি। …আমি কী করেছি? সে ভাবল। ঘোড়ার মুখটা ঘুরিয়ে সে ফিরে গেল সেই নালার ধারে যেখানে সে দেখেছিল সম্রাটকে। কিন্তু এখন সেখানে কেউ নেই। শুধু কিছু মালগাড়ি ও যাত্রীগাড়ি চলেছে। একজন কোচয়ানের কাছে সে জানতে পারল, কুতুজভের দলবল বেশি দূরে নেই, কাছের সেই গ্রামেই গাড়িগুলো যাচ্ছে। রস্তভ তাদের পিছু নিল।
সন্ধ্যা পাঁচটার আগে সব যুদ্ধক্ষেত্রেই পরাজয় হল। একশোরও বেশি কামান ইতিমধ্যেই ফরাসিদের হাতে পড়েছে।
একটি সেনাদল অস্ত্র ত্যাগ করেছে। অন্যগুলি অর্ধেক সৈন্য হারিয়ে বিশৃঙ্খলভাবে ইতস্তত সরে পড়ছে।
লাগারো ও দখতুরভের মিলিত সেনাদল আগেসদ গ্রামের নিকটবর্তী বাঁধ ও পুকুরের ধারে ভিড় করেছে।
পাঁচটার পর থেকে একমাত্র আগেসদ বাঁধের উপরই ফরাসিদের কামান থেকে জোর গোলাগুলি চলছে আমাদের পশ্চাদপসরণকারী সৈন্যদের লক্ষ্য করে। এদিক থেকে দখতুরভ আরো কয়েকদল সেনাসমাবেশ করে পশ্চাদ্ধাবনকারী ফরাসি অশ্বারোহীদের লক্ষ্য করে বন্দুক চালাচ্ছে।
দলখভ এখন অফিসার হয়েছে, তার হাতে পায়ে আঘাত লেগেছে। তার সঙ্গে আছে ঘোড়াসওয়ার রেজিমেন্ট কম্যান্ডার ও তার দলের জনাদশেক সৈন্য। গোটা রেজিমেন্টের এই কয়জনই অবশিষ্ট আছে। একটা কামানের গোলা লেগে তাদের পিছনে একজনের মৃত্যু হল, সামনেও একজন মারা পড়ল, রক্ত ছিটকে পড়ল দলখভের গায়ে। অসহায়ভাবে সামনে ছুটতে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে সকলে জট পাকিয়ে গেল, কয়েক পা এগিয়েই ভিড় থেমে গেল।
প্রত্যেকেই ভাবছে, একশো গজ এগোতে পারলেই নির্ঘাত বেঁচে যাব, আরো দুমিনিট এখানে থাকলেই অবধারিত মৃত্যু।
ভিড়ের ভিতর থেকে বাঁধের ধারে যাবার জন্য জোর করে পথ করে নিতে গিয়ে দলখভ দুটি সৈন্যকে ছিটকে ফেলে দিল এবং কারখানার পুকুরের উপরকার পিছল বরফের দিকে ছুটে গেল।
পায়ের নিচে বরফ সশব্দে গুড়ো হয়ে যেতে লাগল। সেই অবস্থায়ই সে হেঁকে বলল, এদিকে ঘুরে যাও! এদিকে!
সে দাঁড়িয়ে আছে বরফের উপর। বরফ একটু একটু করে দুলছে, শব্দ করছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, কামান অথবা ভিড়ের চাপে এ বরফ তো ভেঙে পড়বেই, এমনকি তার নিজের ভারও বেশিক্ষণ বইতে পারবে না। সৈনিকরা তার দিকে তাকিয়ে তীরের দিকে এগিয়ে গেল, কিন্তু বরফের উপর পা ফেলতে ইতস্তত করতে লাগল। অশ্বারোহী অধিনায়কটি বাঁধের মুখে পৌঁছে হাত তুলে দলখভের উদ্দেশে কিছু বলার জন্য মুখ খুলল। হঠাৎ একটা কামানের গোলা এত নিচু হয়ে হিস-হিস শব্দে ছুটে গেল যে সকলেই মাথা নিচু করল। গোলাটা এসে একটা ভিজে কিছুর উপর পড়ল, আর অধিনায়কটি ঘোড়র উপর থেকে ছিটকে পড়ল রক্তের ডোবার মধ্যে। কেউ তার দিকে ফিরে চাইল না বা তাকে তুলে নেবার কথাও ভাবল না।
বরফের উপরে উঠে যাও, বরফের উপরে! চলল! ঘুরে চলল! শুনতে পাচ্ছ না? এগিয়ে চলো! অধিনায়কটি গোলায় আহত হবার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য কণ্ঠস্বর চিৎকার করে উঠল, কেন যে তারা চিৎকার করছে, কিসের জন্য, তাও তারা জানে না।
যে-সব গোলন্দাজ বাধের দিকে যাচ্ছিল তাদের একেবারে শেষের সৈনিকটি বরফের দিকে ঘুরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সৈন্যরা দলে দলে বাঁধ থেকে ছুটতে লাগল জমাট পুকুরের দিকে। একেবারে প্রথম সৈনিকটির পায়ের চাপেই বরফের চাই ভেঙে পড়ল, তার একটা পা জলে পড়ে গেল। পা তোলার চেষ্টা করতে গিয়ে সে কোমর পর্যন্ত জলে ডুবে গেল। কাছাকাছি সৈন্যরা পিছিয়ে গেল, কামান-চালক তার ঘোড়াটাকে থামাল, কিন্তু পিছন থেকে তখনো সমানে চিৎকার চলছে : বরফের উপর উঠে যাও, থামলে কেন? এগিয়ে যাও! এগিয়ে যাও! ভিড়ের মধ্যে উঠল আর্ত চিৎকার। খোঁচা খেয়ে ঘোড়াগুলো চলতে শুরু করল। যে বরফ পায়ের চাপে কোনোরকমে টিকেছিল, এবার সেটা অনেকটা জায়গা জুড়ে সশব্দে ভেঙে পড়ল, আর সামনে পিছনে চল্লিশ জনের মতো সৈন্য সেই ধাক্কাধাক্কিতে জড়াজড়ি করে ডুবে গেল।
কামানের গোলা তখনো হিস হিস শব্দে ছুটে এসে পড়ছে বরফের উপর, জলের মধ্যে, আর সবচাইতে ঘন ঘন পড়ছে বাধের উপর, পুকুরের মধ্যে ও তার তীরে ভিড় করা মানুষের উপর।
*
অধ্যায়-১৯
প্রিন্স আন্দ্রু বলকনস্কি পতাকাদণ্ড হাতে নিয়ে প্রাজেন পাহাড়ের মাথায় যেখানে পড়ে গিয়েছিল সেখানেই পড়ে আছে। তার শরীর থেকে প্রচুর রক্তপাত হয়েছে। অচেতন অবস্থায় সে করুণ সুরে শিশুর মতো আর্তনাদ করছে।
সন্ধ্যার দিকে তার আর্তনাদ থেমে গেল, একেবারেই চুপচাপ হয়ে গেল। এইভাবে কতক্ষণ অচেতন ছিল তাও সে জানে না। হঠাৎ তার মনে হল সে এখনো বেঁচে আছে, মাথার ভিতরে কাটা ঘায়ের একটা জ্বালা করা যন্ত্রণা হচ্ছে।
যে উঁচু আকাশটাকে আগে কখনো চিনতাম না, শুধু আজই দেখলাম সেটা কোথায়? এই প্রশ্নই তার প্রথম মনে হল। এ রকম যন্ত্রণাও কখনো পাইনি। হ্যাঁ, আজকের আগে আমি কিছুই জানতাম না, কিচ্ছু না। কিন্তু আমি কোথায় আছি?
সে কান পাতল, ঘোড়র পায়ের শব্দ ও ফরাসি ভাষার কথাবার্তা কানে এল। চোখ খুলল। মাথার উপর আবার সেই উঁচু আকাশ, সেই মেঘ আরো উঁচুতে ভাসতে ভাসতে চলেছে, আর তার ফাঁকে ফাঁকে ঝিলমিল করছে অনন্ত নীলিমা। ক্ষুরের শব্দ আর গলার স্বর শুনে বুঝতে পারল কারা যেন ঘোড়ায় চড়ে এসে তার পাশেই থেমেছে, সে কিন্তু মাথা ফেরাল না, তাদের দিকে তাকালও না।
