একটি সৈনিক হাঁক দিয়ে বলল, ইয়োর অনার, এ পথ দিয়ে যান, ও পথে গেলে সঙ্গে সঙ্গে মারা পড়বেন! তারা আপনাকে খুন করে ফেলবে!
আর একজন বলল, আঃ, কী সব বকছ? উনি কোথায় যাবেন? এই পথেই তো কাছে হবে।
রস্তভ একটু ভাবল, তারপর যেপথে গেলে সে মারা যাবে বলে ওরা বলেছিল সেই পথেই এগিয়ে গেল।
এখন তো সবই সমান। সম্রাট যদি আহত হয়ে থাকেন, তাহলেও কি আমি নিজেকে বাঁচাতে সচেষ্ট হব? ভাবতে ভাবতে সেদিকেই সে এগিয়ে চলল যেখানে প্রাজেন থেকে পালাতে গিয়ে সবচাইতে বেশিসংখ্যক লোক মারা গেছে। ফরাসিরা এখনো সে অঞ্চলটা দখল করেনি, অক্ষত ও সামান্য আহত রুশরাও অনেক আগেই সে জায়গা ছেড়ে চলে গেছে। সারা মাঠ জুড়ে প্রতি দুএকর জমিতে দশজন করে নিহত ও আহত সৈনিক পড়ে আছে। তাদের চিৎকার ও আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। এইসব যন্ত্রণাকাতর লোকগুলিকে যাতে না দেখতে হয় সেজন্য রস্তভ জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল, তার ভয় করতে লাগল–ভয়টা নিজের জীবনের জন্য নয়, এই হতভাগ্যদের দেখেও মন স্থির রাখতে যে সাহসের দরকার তার অভাব ঘটবার ভয়।
নিহত ও আহত সৈনিকে ভর্তি মাঠে গুলি করার মতো কেউ না থাকায় ফরাসিরা গুলি বন্ধ করে দিয়েছিল, একজন অ্যাডজুটান্টকে ঘোড়ায় চেপে মাঠ দিয়ে যেতে দেখে তারা রস্তভকে লক্ষ্য করে কয়েকটা গুলি ছুড়ল। গুলির ভয়ংকর শনশন শব্দ আর চারপাশের মৃতদেহের অনুভূতি একত্রে মিলে রস্তভের মনে দেখা দিল নিজের জন্য ত্রাস ও করুণার অনুভূতি। মায়ের শেষ চিঠিটায় কথা মনে পড়ল। সে ভাবল, এইভাবে কামান তাক করা অবস্থায় আমাকে দেখলে মার কী মনে হত?
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে এসে রুশ সৈন্যরা হসজেরাডেক গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। ফরাসি কামান সেখানে পৌঁছচ্ছে না, বন্দুকের শব্দও ভেসে আসছে অনেক দূর থেকে। এখানে সকলেই পরিষ্কার বুঝেছে ও বলছে যে যুদ্ধে হার হয়েছে। রস্তভ অনেককেই জিজ্ঞেস করল, কিন্তু সম্রাট বা কুতুজভের খবর কেউ বলতে পারল না। কেউ বলল, সম্রাটের আহত হবার খবরটা ঠিক, আবার কেউ বলল ওটা মিথ্যা গুজব। একজন অফিসার জানাল, গ্রামের পিছনে বাঁদিকে প্রধান ঘাঁটির একজন কাউকে সে দেখেছে। অগত্যা রস্তভ সেই দিকেই ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে দিল। প্রায় দু মাইল পথ চলার পরে শেষে রুশ সেনাদলকেও পার হয়ে চারদিক ঘুরিয়ে নালা কাটা একটা সবজিবাগানের কাছে নালার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো দুজন অশ্বারোহীকে সে দেখতে পেল। একজনের টুপিতে শাদা পালক গোঁজা, রস্তভের মনে হল, লোকটিকে সে চেনে, অপরজন সওয়ার হয়েছে একটা সুন্দর বাদামি রঙের ঘোড়ার পিঠে (রস্তভের মনে হল ঘোড়াটাকে সে আগে দেখেছে), দ্বিতীয় লোকটি নালা পর্যন্ত এগিয়ে এসে আস্তে লাফিয়ে নালাটার কাছে এল এবং মুখ ঘুরিয়ে সাদা পালকপরা লোকটিকেও তাই করতে বলল। দ্বিতীয় অশ্বারোহী মাথা ও হাত নেড়ে আপত্তি জানাল, আর তা থেকেই রস্তভ সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারল তার পূজনীয় সম্রাটকে।
রস্তভ ভাবল, কিন্তু এই জনশূন্য মাঠের মধ্যে একাকী, এ লোক তিনি নন, হতে পারেন না। সেই মুহূর্তে আলেক্সান্দার মাথাটা ফেরাল, আর রস্তভ দেখতে পেল সেই প্রিয় মূর্তি যার স্মৃতি গভীরভাবে আঁকা আছে তার মনে। সম্রাটের মুখ বিবর্ণ, গাল ভেঙে গেছে, চোখ বসে গেছে, কিন্তু মুখের মাধুরী যেন তাতে আরো বেড়েছে। সম্রাটের আহত হওয়ার গুজবটা যে মিথ্যা সেটা জেনে রশুভের খুব ভালো লাগল। তাকে দেখে তাই সে খুশি। সে বুঝল, সোজা গিয়ে দলগরুকভের চিঠিটা সে সম্রাটের হাতে দিতে পারে, দেয়াই উচিত।
কিন্তু কোনো প্রেমিক যুবকের সামনে যখন বহু-আকাক্ষিত মুহূর্তটি আসে এবং প্রেমিকার সঙ্গে নির্জনে দেখা হয়, তখন সে যেমন কাঁপতে থাকে, তার স্নায়ু অবশ হয়ে পড়ে, রাতের পর রাত যে কথাগুলি বলার স্বপ্ন দেখেছে তা উচ্চারণও করতে পারে না, বরং সাহায্যের আশায় অথবা পালিয়ে যাওয়ার এক সুযোগের জন্য চারদিকে তাকাতে থাকে, সেইরকম রস্তভও এতকাল ধরে যে সুযোগটি পৃথিবীর অন্য যে-কোনো জিনিসের চাইতে বেশি করে কামনা করেছে, সেই সুযোগ যখন তার সামনে এসে হাজির হয়েছে তখন বুঝতেই পারছে না কেমন করে সম্রাটের কাছে এগিয়ে যাবে, আর এ কাজ করা তার পক্ষে কেন অসুবিধাজনক, অশোভন ও অসম্ভব তারই হাজার যুক্তি তার মনের মধ্যে তোলপাড় করতে লাগল।
নানা কথা ভাবতে ভাবতে রস্তভ যখন বিষণ্ণ মনে সেখানে থেকে সরে যেতে লাগল তখন ক্যাপ্টেন ভনটোল হঠাৎই ঘোড়ায় চেপে সেখানে এসে হাজির হল এবং সম্রাটকে দেখে এগিয়ে এসে তাকে ধরে নামিয়ে পায়ে হেঁটে নালাটা পার হতে সাহায্য করল। কিছুটা অসুস্থ বোধ করায় সম্রাট বিশ্রাম নেয়ার জন্য একটা আপেলগাছের তলায় বসল, ভেনটোলও তার পাশেই রইল। ঈর্ষায় ও অনুতাপে বিদ্ধ হয়ে রস্তভ দূর থেকে দেখতে পেল, ভেনটোল অনেকক্ষণ ধরে ঘনিষ্ঠভাবে সম্রাটের সঙ্গে কথা বলছে, আর সম্রাট কাঁদতে কাঁদতে এক হাতে নিজের চোখ ঢেকে অন্য হাতে ভন টোলের হাতটা চেপে ধরেছে।
তার জায়গায় তো আমিও হতে পারতাম! এই কথা ভেবে ম্রাটের প্রতি করুণায় উদাত চোখের জল কোনোরকমে চেপে একান্ত হতাশায় রশুভ ঘোড়া চালিয়ে এগিয়ে গেল কোথায় যাচ্ছে বা কেন যাচ্ছে তা সে জানে না।
