কিন্তু উনি তো গ্র্যান্ড ডিউক, আমি চাই প্রধান সেনাপতিকে অথবা সম্রাটকে, বলেই রস্তভ ঘোড়া ছোটাতে উদ্যত হল।
অপরদিক থেকে ছুটে এসে বের্গ চেঁচিয়ে ডাকল, কাউন্ট! কাউন্ট! আমার ডান হাতে আঘাত লেগেছে (রুমাল দিয়ে বাঁধা রক্তাক্ত ডান হাতটা দেখাল), তবু আমি যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলাম। বাঁ হাতে তরবারি ধরেছি কাউন্ট। আমাদের পরিবারের সকলেইসব ভন বের্গরাই-নাইট ছিলেন!
সে আরো কিছু বলতে লাগল, কিন্তু সে-কথা শুনবার জন্য রস্তভ অপেক্ষা করল না, ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
সহসা খুব কাছে নিজের সামনে ও আমাদের সৈন্যদের পিছনে সে বন্দুকের শব্দ শুনতে পেল, সে ভাবতেই পারেনি যে সেখানে শত্রুসৈন্য থাকতে পারে।
ভাবল, এটা কী হল? আমাদের বাহিনীর পিছনে শত্রুসৈন্য? অসম্ভব! আর হঠাৎই নিজের জন্য এবং গোটা যুদ্ধের ফলাফলের জন্য তার মন আতংকে শিউরে উঠল। কিন্তু যাই হোক না কেন, এখন আর ঘরে যাবার উপায় নেই। এখানেই প্রধান সেনাপতির খোঁজ করতে হবে, আর যদি সর্বনাশই ঘটে তাহলে সকলের সঙ্গে আমাকেও মরতে হবে।
প্রাৎজেন গ্রামটা এখন, নানা ধরনের সৈন্যে পরিপূর্ণ, সেই গ্রামটা ছাড়িয়ে সে যত এগিয়ে যেতে লাগল ততই সেই বিপদের আশংকা ঘনীভূত হতে লাগল।
তার পথের উপর দিয়ে বিশৃঙ্খলভাবে ছুটে আসা রুশ ও অস্ট্রিয় সৈন্যদের দেখে রস্তভ প্রশ্ন করতে লাগল, এসবের অর্থ কী? এটা কী হচ্ছে? তারা কাকে গুলি করছে সে গুলি ছুড়ছে?
রুশ, জার্মান ও চেক ভাষায় পলায়মান জনতা বলতে লাগল, শয়তানই জানে! তারা সব্বাইকে মারছে! সব শেষ! অবশ্য কী যে হচ্ছে বা হয়েছে তার কিছুই তারা কেউ জানে না।
একজন হেঁকে বলল, জার্মানদের মার!
বিশ্বাসঘাতকের দল-ওদের শয়তানে ধরুক!
রুশদের ফাঁসিতে ঝোলাও! একজন জার্মান অস্ফুট স্বরে বলল।
পথ বেয়ে কয়েকজন আহত সৈনিক চলে গেল, চারদিকে গোলমালের মধ্যে শোনা যেতে লাগল তিরস্কার, চেঁচামেচি, আর্তনাদ, তারপর গোলাগুলি থেমে গেল। রস্তভ পরে জানতে পেরেছিল, রুশ ও অস্ট্রিয় সৈন্যরা পরস্পরকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়েছিল।
সে ভাবল, হা ঈশ্বর! এসবের অর্থ কী? আর এখানে, যেখানে সম্রাট যে কোনো মুহূর্তে তাদের সামনে হাজির হতে পারেন… কিন্তু না। এ কাজ বড়জোর জনাকয়েক বদমাস করতে পারে। অচিরেই এ অবস্থা কেটে যাবে, ওরকম হতে পারে না, হতে পারে না! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এদের পার হয়ে যেতে হবে!
পরাজয় ও পলায়নের চিন্তা রস্তভের মাথায় ঢোকেনি। প্রাজেন পাহাড়ের উপর ফরাসি কামান ও ফরাসি সৈন্যদের সে দেখতে পেয়েছে, তার উপর নির্দেশ আছে, ওখানেই প্রধান সেনাপতিকে খুঁজতে হবে, কিন্তু সে কথা সে বিশ্বাস করতে পারল না, বিশ্বাস করতে চাইল না।
*
অধ্যায়-১৮
রস্তভের উপর নির্দেশ ছিল প্রাজেন গ্রামের কাছাকাছি কুতুজভ ও ম্রাটের খোঁজ করতে হবে। কিন্তু না, তাদের দুই জনের কাউকে, না কোনো একটি অধিনায়ক অফিসারকে, কেউ নেই সেখানে, সেখানে শুধু নানা ধরনের বিশৃঙ্খল জনতার ভিড়। ক্লান্ত ঘোড়াটাকে নিয়ে সে খুব তাড়াতাড়ি এই ভিড়কে পার হয়ে যেতে চাইল, কিন্তু যত এগোতে লাগল সেনাদলকে ততই বিশৃঙ্খল অবস্থায় দেখতে পেল। প্রাজেন পাহাড়ের উপর থেকে ফরাসি কামান থেকে গোলাবর্ষণের ফলে সকলের মধ্যে একটা হৈ চৈ হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে।
যাকে পাচ্ছে রস্তভ তাকেই জিজ্ঞেস করছে, সম্রাট কোথায়? কুতুজভ কোথায়? কিন্তু কেউ কোনো জবাব দিচ্ছে না।
অবশেষে একটি সৈন্যের কলার চেপে ধরে তাকে জবাব দিতে বাধ্য করল।
কী জানি কেন হেসে উঠে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সৈন্যটি বলল, এ, দাদা, তারা সব অনেক আগেই পালিয়েছে!
স্পষ্টই বোঝা গেল সৈনিকটি মদ গিলেছে। তাকে ছেড়ে একজন পদস্থলোকের সহিসের ঘোড়া থামিয়ে রস্তভ তাকেই জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। সে জানাল, ঘণ্টাখানেক আগে এই রাস্তা দিয়েই একখানা দ্রুতগামী গাড়িতে জানকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, জার সাংঘাতিক আহত।
রস্তভ বলে উঠল, এ হতেই পারে না! নিশ্চয় সে অন্য কেউ।
উপহাসের হাসি হেসে লোকটি জবাব দিল, আমি নিজে তাকে দেখেছি। পিটার্সবুর্গে সম্রাটকে এতবার দেখেছি যে তাকে চেনা আমার উচিত। ঠিক যেমন আপনাকে দেখছি, তেমনই তাকে দেখেছি।…অত্যন্ত ম্লান মুখে তিনি গাড়িতে বসেছিলেন। চারটে কালো ঘোড়াকে কী ছুটিয়েই না দিল! খটাখট শব্দে আমাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল! ততক্ষণে আমি রাজকীয় গাড়ির ঘোড়া ও ইলিয়া আইভানিচকে চিনতে পেরেছিলাম। আমার তো মনে হয় না ইলিয়া জার ভিন্ন অন্য কারো গাড়ি চালায়।
রস্তভ ঘোড়াটা ছেড়ে দিয়ে গমনোদ্যত হতেই তাকে পাশ কাটিয়ে চলতে গিয়ে জনৈক আহত অফিসার তাকে জিজ্ঞেস করল :
আপনি কাকে চান? প্রধান সেনাপতিকে? একটা কামানের গোলায় তার মৃত্যু হয়েছে–আমাদের রেজিমেন্টের সামনে তার বুকে গোলা লেগেছিল।
আর একজন অফিসার তার কথাটা সংশোধন করে বলল, মারা যাননি–আহত হয়েছেন!
রস্তভ জিজ্ঞেস করল, কে? কুতুজভ?
কুতুজভ নয়, কিন্তু কী যেন তার নামটা ঠিক আছে… বেশি লোক তো বেঁচে নেই। এই পথে চলে যান, ওই গ্রামে, অধিনায়করা সব ওখানেই আছেন, এই কথা বলে হসজেরাডেক গ্রামটা দেখিয়ে গিয়ে অফিসারটি চলে গেল।
রস্তভ হেঁটে চলার গতিতে ঘোড়ার পিঠে এগিয়ে চলল, কেন যাচ্ছে, কার কাছে যাচ্ছে, সে-সব না বুঝেই চলতে লাগল। সম্রাট আহত, যুদ্ধে হার হয়েছে। এখন এতে সন্দেহ করাও অসম্ভব। তাড়াতাড়িই বা কী আছে? জার বা কুতুজভ যদি বেঁচে থাকে, যদি অক্ষতই থাকে, তাহলেই বা এখন সে তাদের কী বলবে?
