ব্যাগ্রেশনকে বাধা দিয়ে দলগরুকভ বলল, তাহলে সংবাদটা হিজ ম্যাজেস্ট্রিকেই দিতে পার।
পাহারার কাজে ছুটি পেয়ে ভোরের আগেই রস্তভ ঘণ্টা কয়েক ঘুমিয়ে নিয়েছিল, তাই এখন তার শরীর ও মন দুইই বেশ ঝরঝরে ও তাজা হয়ে আছে। তাছাড়া সকাল থেকে তার সব আশাই পূর্ণ হয়েছে : আজকের যুদ্ধে সে অংশ নিতে যাচ্ছে, তার চাইতেও বড় কথা, সবচাইতে সাহসী অধিনায়কের সঙ্গীরূপে সে যাচ্ছে, সংবাদবাহক হিসেবে তাকেই পাঠানো হচ্ছে কুতুজভের কাছে, এমনকি হয়তো সম্রাটের কাছেও। আলো ঝলমল সকাল, তার ঘোড়াটাও ভালো, মনটা আনন্দে ও খুশিতে ভরপুর। নির্দেশ হাতে নিয়ে ঘোড়ার মুখে লাগাম পরিয়ে সে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। প্রথমে পার হল ব্যাগ্রেশনের সেনাদলকে, তারা যুদ্ধে না নেমে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তারপর পার হল উভারতের অশ্বারোহী বাহিনী, সেখানে চলেছে যুদ্ধের আয়োজন ও চাঞ্চল্য। তারপরেই সামনে থেকে ভেসে এল কামান-বন্দুকের শব্দ, সে শব্দ ক্রমেই উচ্চ হতে উচ্চতর হতে লাগল।
প্রকৃত অবস্থাটা চোখে দেখবার জন্য পাহাড়ের চূড়ায় উঠে রস্তভ ঘোড়া থামাল, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও বুঝতে পারল না, ধোয়ার মধ্যে কিছু লোক চলাফেরা করছে, সামনে-পিছনে চলাফেরা করছে সেনাদল, কিন্তু তারা কারা, কোথায় যাচ্ছে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। এসব দেখেশুনে তার মনে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হল :
না, বরং তার উৎসাহ ও দৃঢ়তা আরো বেড়ে গেল।
এগিয়ে চল! এগিয়ে চল! সংবাদটা পৌঁছে দাও! মনে মনে বলতে বলতে সে ঘোড়া ছুটিয়ে ক্রমেই যুদ্ধের দিকে এগিয়ে চলতে লাগল।
ওখানকার অবস্থা কেমন আমি জানি না, কিন্তু নিশ্চয় সবই ভালো, রস্তভ ভাবল।
কিন্তু স্ক্রিয় সৈনিককে পেরিয়েই সে দেখতে পেল, রক্ষীবাহিনীর একটা অংশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। _ তার মন বলল, ভালোই হল! কাছে থেকে সব কিছু দেখতে পাব।
অগ্রবর্তী সেনাদলের বরাবর সে এগিয়ে চলল। মুষ্টিমেয় কিছু সৈন্য ঘোড়া ছুটিয়ে তার দিকে এগিয়ে এল। আমাদের পক্ষের এই উলহানরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরছে। রস্তভ তাদের পথ থেকে সরে দাঁড়াল, এমনিতেই তার চোখে পড়ে গেল যে তাদের একজনের শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। রস্তভ ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
এসব আমার ব্যাপারই নয়, সে ভাবল। কয়েকশো গজ চলবার পরেই তার চোখে পড়ল, বাঁদিক থেকে কালো ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে একটা মস্ত বড় অশ্বারোহী দল তার পথের দিকেই দ্রুত ছুটে আসছে। আক্রমণোদ্যত ফরাসি অশ্বারোহী বাহিনীর মোকাবিলা করতে ছুটে চলেছে আমাদের অশ্বারোহী রক্ষীবাহিনী।
রস্তভ পরিষ্কারভাবে তাদের চোখ-মুখ দেখতে পাচ্ছে, শুনতে পাচ্ছে তাদের হুকুম : আক্রমণ কর। পাছে তাদের অগ্রগতির মুখে পড়ে ঘোড়াসমেত সে নিজেও চুরমার হয়ে যায়, বা তাদের ধাক্কায় ফরাসিদের মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়, তাই সে যথাসম্ভব দ্রুতগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেও তাদের সম্পূর্ণ এড়িয়ে যেতে পারল না।
অশ্বারোহী রক্ষীবাহিনীর শেষ সৈনিকটির সঙ্গে রস্তভের সংঘর্ষ প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠল। প্রকাণ্ড দেহ এই রক্ষীসৈনিকটির মুখভর্তি বসন্তের দাগ। ভ্রুকুটিকুটিল চোখে সক্রোধে সে রস্তভের দিকে তাকাল। রস্তভের মনে হল, এই বিরাটকায় মানুষগুলি ও তাদের ঘোড়াগুলির তুলনায় সে বড়ই ক্ষুদ্রকায় ও দুর্বল, লোকটি হয়তো তাকে ও বেদুইনকে ধরাশায়ী করেই ছুটে যেত যদি না সময়মতো রস্তভ রক্ষীটির ঘোড়ার চোখের সামনে তার চাকুটাকে সশব্দে আস্ফালন করত। ষোল হাত উঁচু কালো ভারি ঘোড়াটা কান খাড়া করে থমকে দাঁড়াল, আর রক্ষীটি সজোরে পাদানি দিয়ে তার পেটে খোঁচা মেরে দ্রুততর গতিতে ছুটে বেরিয়ে গেল। তারপর আর কিছুই সে দেখতে পেল না, কারণ সঙ্গে সঙ্গেই কামান গর্জে উঠল আর ধোঁয়ায় সবকিছু ঢেকে গেল।
সেই মুহূর্তে রভের মনে দ্বিধা দেখা দিল, সে রক্ষীবাহিনীকে অনুসরণ করবে, না কি তাকে যেখানে পাঠানো হয়েছে সেখানেই যাবে। পরবর্তীকালে সে শুনেই ভয় পেয়েছিল যে সেই বিরাটদেহ রক্ষীসৈনিকদের বিরাট দলটির মধ্যে সেদিনকার যুদ্ধ থেকে ফিরে এসেছিল মাত্র আঠারো জন।
ওদের আমি ঈর্ষা করব কেন? আমার সুযোগ তো চলে যায়নি, হয়তো এক্ষুনি ম্রাটের সঙ্গেই আমার দেখা হয়ে যাবে! এই কথা ভেবে রস্তভ ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
পদাতিক রক্ষীবাহিনীর একটি রেজিমেন্টের পিছন দিক দিয়ে চলতে চলতে সে শুনতে পেল কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে।
রস্তুভ!
বরিসের কণ্ঠস্বর চিনতে না পেরে সে জবাব দিল, কি?
আমি বলছি, আমরা একেবারে প্রথম সারিতে রয়েছি। আমাদের রেজিমেন্ট আক্রান্ত হয়েছে। বরিস বলল, তার মুখে সেই খুশির হাসি যা দেখা দেয় সেইসব যুবকদের মুখে, জীবনে যারা প্রথম গোলাগুলির সামনে দাঁড়ায়।
রস্তভ থামল।
বলল, তাই নাকি? আচ্ছা, কেমন হল বল তো?
তাদের হটিয়ে দিয়েছি! উৎসাহে বরিস মুখর হয়ে উঠল। কল্পনা করতে পার? বরিস নিজেদের কার্যকলাপের বিবরণ দিতে শুরু করল। তার কথা শেষ হবার আগেই রস্তভ ঘোড়ার পেটে খোঁচা দিল।
কোথায় যাচ্ছ? বরিস জিজ্ঞেস করল।
হিজ ম্যাজেস্ট্রির কাছে একটি চিঠি নিয়ে যাচ্ছি।
রস্তভ সম্ভবত হিজ হাইনেস বলতে চেয়েছে এ-কথা ভেবে গ্র্যান্ড ডিউককে দেখিয়ে বরিস বলল, ঐ তো তিনি!
