এখানে প্রিন্স হিপোলিৎ থামল; বেশ কষ্ট করে গল্পটাকে মনে মনে গুছিয়ে নিল।
মহিলাটি বলল…ও হ্যাঁ, বলল, দেখ মেয়ে, যখনই আমি কোথাও যাব তখনই ভালো করে তকমা এঁটে গাড়ির পিছনে চড়ে বসবে।
শ্রোতারা হাসবার আগেই এখানে প্রিন্স হিপোলিৎ নিজেই হো-হো করে হেসে উঠল; তার ফলটা বক্তার পক্ষে মোটেই ভালো হল না। অবশ্য বয়স্কা মহিলা ও আন্না পাভলভনাসহ কয়েকজন হেসে উঠল।
মহিলাটি চলেছে। হঠাৎ জোর বাতাস উঠল। মেয়েটির টুপি উড়ে গেল, আর তার লম্বা চুল এলিয়ে পড়ল।…এখানে সে আর হাসি চাপতে পারল না। হাসির ফাঁকে ফাঁকেই কথা বলতে লাগল : আর সারা জগৎ জেনে ফেলল…।
এইভাবে গল্পটা শেষ হল। কেন যে সে গল্পটা বলল, আর কেনই বা রুশ ভাষাতে বলল, তা ঠিক বোঝা গেল না; তবু সে যে এইভাবে বুদ্ধি করে পিয়েরের অপ্রীতিকর ও অশোভন বক্তৃতাটাকে একটা সুন্দর পরিণতিতে টেনে আনতে পেরেছে সেজন্য আন্না পাভলভনা ও অন্য সকলে প্রিন্স হিপোলিৎতের প্রশংসাই করল। গল্পটার শেষে আলোচনা অন্য পথে মোড় নিল : আগেকার ও পরবর্তী বল-নাচ, থিয়েটার, কবে ও কোথায় কে কার সঙ্গে দেখা করবে–প্রভৃতি বিষয় নিয়ে অতি সাধারণ ছোটখাট কথাবার্তা শুরু হল।
*
অধ্যায়-৬
মনোরম সান্ধ্য আসরের জন্য আন্না পাভলভনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে অতিথিরা বিদায় নিতে শুরু করল।
পিয়ের কেমন যেন বেমানান। মজবুত গড়ন, উচ্চতা সাধারণ, চওড়া শরীর। বড় বড় লাল হাত। কিন্তু কেমন যেন; কথায় বলে, সে না জানে বৈঠকখানায় ঢুকতে, না জানে সেখান থেকে বের হতে; অর্থাৎ বিদায় নেবার আগে দুটো ভালো কথা কেমন করে বলতে হয় তাও জানে না। তার উপর, বে-খেয়াল। বিদায় নিতে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের টুপির বদলে সে সেনাপতির তিন-কোণা টুপিটা তুলে নিল, এবং সেনাপতি চেয়ে না নেওয়া পর্যন্ত সেটা নিজের হাতেই রেখে দিল। অবশ্য তার এই খেয়ালের অভাব, ঘরে ঢুকবার বা কথা বলবার আদব-কায়দার অভাব–এ সবই ঢাকা পড়ে যায় তার সদয়, সরল ও বিনীত আচরণে। আন্না পাভলভনা তার দিকে এগিয়ে খৃস্টানসুলভ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বল : আশা করি আবার আপনার দেখা পাব; আরো আশা করি আপনার মতামতগুলো আপনি বদলাবেন প্রিয় মঁসিয় পিয়ের।
পিয়ের কোনো জবাব দিল না, শুধু মাথাটা নোয়াল; কিন্তু তার হাসিটি সকলেরই নজরে পড়ল; সে হাসিতে বুঝি এই কথাটিই শুধু প্রকাশ পেল, মতে কি আসে যায়, কিন্তু দেখুন তো আমি লোকটি কত সৎ স্বভাব। আর সকলেই, এমন কি আন্না পাভলভনাও সেটা অনুভব করল।
প্রিন্স আন্দ্রু তখন হল-ঘরে চলে গেছে; জোব্বাটা পরতে পরিচারক তাকে সাহায্য করছে; তার দিকে মুখ ফিরিয়ে সে নিরাসক্তভাবে প্রিন্স হিপোলিৎতের সঙ্গে তার স্ত্রীর কথাবার্তা শুনতে লাগল। তারা দুজনেও হলঘরে চলে এসেছে। সুন্দরী, গর্ভিণী প্রিন্সেসের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে প্রিন্স হিপোলিৎ চশমার ভিতর দিয়ে একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আন্না পাভলভনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ছোট প্রিন্সেস বলল, আপনি ভিতরে যান আনেৎ, আপনার ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে। তারপর বলল, তাহলে ঐ কথাই রইল।
আনাতোল ও ছোট প্রিন্সেসের ননদের সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে আন্না পাভলভনা ইতিমধ্যেই লিজার সঙ্গে কথা বলেছে।
নিচু গলায় আন্না পাভলভনা বলল, আপনার উপর আমার অনেক ভরসা। তাকে চিঠি লিখুন এবং এ ব্যাপারে তার বাবার মতামত আমাকে জানাবেন। বিদায়!–সে হল-ঘর থেকে চলে গেল।
প্রিন্স হিপোলিং ছোট প্রিন্সেসের কাছে এগিয়ে গিয়ে মুখটাকে তার খুব কাছে নিয়ে ফিস ফিস করে কি যেন বলল।
উভয়ের পরিচারকই একটা শাল ও একটা জোব্বা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল, কতক্ষণে তাদের কথা শেষ হবে। ফরাসি ভাষার কথাগুলি তাদের কাছে অর্থহীন হলেও তারা এমনভাবে শুনতে লাগল যেন বুঝতে পারছে, অথচ সেটা তাদের জানতে দিতে চাইছে না। প্রিন্সেস যথারীতি কথা বলছে ঈষৎ হেসে আর কথা শুনে হাসছে হো হো করে।
প্রিন্স হিপোলিৎ বলল, রাষ্ট্রদূতের ওখানে না গিয়ে কী ভালোই যে করেছি, কী যে একঘেয়ে ব্যাপার। সন্ধ্যাটা বড়ই আনন্দে কাটল, তাই না? বড় ভালো!
ছোট ঠোঁটটি তুলে ধরে প্রিন্সেস বলল, সকলে বলছে বল-নাচটা খুব ভালো হবে। সমাজের সব সুন্দরীরা সেখানে হাজির হবে।
সকলে নয়। কারণ আপনি তো সেখানে থাকছেন না; সকলে নয়, সানন্দ হাসি হেসে প্রিন্স হিপোলিৎ বলল; তারপর পরিচালকের কাছ থেকে শালটা নিয়ে তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে শালটা প্রিন্সেসের গায়ে জড়িয়ে দিল। ইচ্ছা করেই কি না কে জানে, শালটা জড়িয়ে দেবার পরেও সে অনেকক্ষণ হাত দিয়ে ছোট প্রিন্সেসকে ঘিরে ধরে রাখল, যেন আলিঙ্গন করল।
প্রিন্সেস হাসতে হাসতে বেশ ভদ্রভাবে সেখানে থেকে সরে গেল, তার দৃষ্টি তখন স্বামীর উপর। প্রিন্স আর চোখ দুটি তখন বুজে এসেছে, তাকে ক্লান্ত ও ঘুমকাতর মনে হল।
স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি তৈরি তো? প্রিন্স হিপোলিৎ তাড়াতাড়ি জোব্বাটা পরে নিল; আধুনিক ফ্যাশান অনুযায়ী সেটা তার গোড়ালি অবধি ঝুলে পড়ল; ফলে সেটাতে হোঁচট খেতে খেতে সে প্রিন্সেসের পিছন পিছন ফটক পর্যন্ত গেল। একটি পরিচারক তখন প্রিন্সেসকে গাড়িতে তুলে দিচ্ছে।
প্রিন্সেস, বিদায়, তার পা এবং জিভ দুইই যেন হোঁচট খেল।
