চারদিকে তাকিয়ে কুতুজভ হতাশভাবে আর্তনাদ করে উঠল, ওঃ! ওঃ! ওঃ!…বয়সের ভারে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে ডাকল, বলকনস্কি! বলকনস্কি! তারপর বিশৃখল সেনাদল ও শত্রুদের দেখিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, ও সব কি?
তার কথা শেষ হবার আগেই লজ্জা ও ক্রোধের কান্নায় রুদ্ধবাক অবস্থায় প্রিন্স আন্দ্রু ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে পতাকাটির দিকে ছুটে গেল।
ছোট শিশুর মতো তারস্বরে চিৎকার করে বলল, বাছারা, এগিয়ে যাও!
পতাকার দণ্ডটি চেপে ধরে ভাবল, এই তো পেয়েছি। তাকে লক্ষ্য করে ছুটে আসা বুলেটের শব্দ শুনে সে খুশিই হল। কয়েকটি সৈন্য পড়ে গেল।
প্রিন্স আন্দ্রু হাঁক দিল, হুররা! কোনোরকমে ভারী পতাকাটিতে তুলে ধরে সম্মুখে ছুটে চলল, তার মনে দৃঢ় প্রত্যয়, পুরো বাহিনী তাকে অনুসরণ করবে।
সত্যি সত্যি মাত্র কয়েকটি পা সে একাকী এগিয়ে গেল। প্রথমে একটি সৈন্য, তারপর আরেকটি এগিয়ে এল, আর দেখতে দেখতে পুরো বাহিনী হুররা বলে হুঙ্কার তুলে ছুটে এসে তাকে ধরে ফেলল। প্রিন্স আন্দ্রুর হাতে ভারী পতাকাটি হেলে পড়ছে দেখে একজন সার্জেন্ট ছুটে এসে সেটা ধরতেই সঙ্গে তার তার মৃত্যু হল। প্রিন্স আন্দ্রু পুনরায় পতাকাদণ্ডটি ধরে সেটাকে টানতে টানতে সেনাদলের সঙ্গে ছুটতে লাগল। সামনেই গোলন্দাজ সৈন্যদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, তাদের কয়েকজন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, আর অপর কয়েকজন কামান ফেলে তার দিকে ছুটে আসছে। সে আরো দেখল, ফরাসি পদাতিক সৈন্যরা তাদের ঘোড়াগুলোকে দখল করে কামানোর মুখ ঘুরিয়ে ধরেছে। প্রিন্স আন্দ্রু ও সেনাদল তখন কামানশ্রেণীর বিশ গজের মধ্যে পৌঁছে গেছে। মাথার উপরে অবিশ্রাম গুলির শব্দ কানে আসছে, ডাইনে-বাঁয়ে একের পর এক সৈন্যরা আর্তনাদ করে ঢলে পড়ছে। কিন্তু তাদের দিকে সে তাকাল না : তার দৃষ্টি শুধু সামনে যা ঘটছে তার দিকে-কামানশ্রেণীর দিকে। এবার সে পরিষ্কার দেখতে পেল দুমড়ানো টুপি মাথায় একটি লাল-চুল গোলন্দাজ একটা ন্যাকড়ার একদিক ধরে আছে, আর একজন ফরাসি সৈন্য সেটার অন্যদিকে ধরে টানছে। দুজনের মুখেই একটা হতবুদ্ধিকর অথচ বিমূঢ় ভাব ফুটে উঠেছে, তারা যে কী করছে তা নিজেরাই জানে না।
সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, ওরা কী করছে? লাল চুল গোলন্দাজটির হাতে যখন অস্ত্র নেই তখন সে পালিয়ে যাচ্ছে না কেন? ফরাসিটাই বা তার বুকে বেয়নেট বসিয়ে দিচ্ছে না কেন? বেয়নেটের কথা মনে হতেই ফরাসি সৈন্যটি সেটা ওর বুকে বসিয়ে দেবে, তার আগে ওর নড়ার লক্ষণ দেখছি না…।
সত্যি সত্যি আর একটি ফরাসি সৈনিক বন্দুক উচিয়ে লোক দুটির দিকে ধেয়ে এল, লাল-চুল গোলন্দাজটির কপালে যা লেখা আছে এখনই তা ঘটে যাবে। কিন্তু সে ঘটনা প্রত্যক্ষ করা প্রিন্স আর হল না। তার মনে হল, পার্শ্ববর্তী একটি লোক সজোরে তার মাথায় মুগুর দিয়ে আঘাত করল। আঘাত সামান্যই লাগল, কিন্তু যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে যা দেখার জন্য অপেক্ষা করছিল সেটা আর দেখা হল না।
এ কী হল? আমি কি পড়ে যাচ্ছি? পা দুটো খাড়া রাখতে পারছি না, ভাবতে ভাবতেই সে চিৎ হয়ে পড়ে গেল। চোখ খুলল, দেখতে চাইল, ফরাসি সৈনিক ও গোলন্দাজের লড়াইটা কীভাবে শেষ হল, লালচুল গোলন্দাজটি মারা গেল কি না, কামানটা বেদখল হল না রক্ষা পেল। কিন্তু কিছু সে দেখতে পেল না। মাথার উপরে শুধুই আকাশ-উঁচু আকাশ, অস্পষ্ট হলেও অসীম উঁচু আকাশ, তার বুখে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘের দল। কী শান্ত, স্তব্ধ, গম্ভীর, আমরা যখন ছুটছিলাম মোটেই তখনকার মতো নয়, প্রিন্স আন্দ্রু ভাবতে লাগল-লড়াই করতে করতে আর চিৎকার করতে করতে আমরা যখন ছুটছিলাম, ভীত ক্রুদ্ধ মুখে গোলন্দাজ ও ফরাসিটি যখন একটুকরো নেকড়ার জন্য ঝগড়া করছিল, মোটেই তখনকার মতো নয় : অসীম উঁচু আকাশের বুকে মেঘেদের এই ভেসে চলা তার থেকে কত আলাদা! এই উঁচু আকাশটা আগে কেন আমার চোখে পড়েনি। শেষপর্যন্ত ওই আকাশকে দেখতে পেয়ে আমি কত খুশি!! ওই অসীম আকাশ ছাড়া সবই বৃথা, সবই মিথ্যা। ও ছাড়া আর কিছুই নেই, কিছু নেই। এমনকি ওই আকাশও নেই, স্তব্ধতা ও শান্তি ছাড়া আর কিছু নেই। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ!…
*
অধ্যায়-১৭
ব্যাগ্রেশন পরিচালিত আমাদের দক্ষিণ ব্যূহে বেলা নয়টায়ও যুদ্ধ শুরু হয়নি। দলগরুকভ যুদ্ধ শুরু করার যে দাবি জানিয়েছিল তার সঙ্গে একমত না হওয়ায় এবং নিজের দায়িত্ব এড়ানোর জন্য প্রিন্স ব্যাগ্রেশন প্রধান সেনাপতির কাছে লোক পাঠিয়ে তার মতামত জানার প্রস্তাব করল। ব্যাগ্রেশন জানত, সেনাবাহিনীর দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী দূরত্ব ছয় মাইলেরও বেশি, যদি পথে নিহত না হয় (হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি), আর প্রধান সেনাপতির সঙ্গে যদি তার সাক্ষাৎ হয় (যেটা খুবই শক্ত) তাহলেও সন্ধ্যার আগে সে ফিরে আসতে পারবে না।
ব্যাগ্রেশন বড় বড় ভাবলেশহীন ঘুম ঘুম চোখে দলের লোকদের দিকে তাকাল, প্রথমেই তার চোখ পড়ল উত্তেজনায় ও আশায় রুদ্ধশ্বাস রস্তভের বালকসুলভ মুখের উপর। তাকেই সে পাঠাল।
টুপিতে হাত তুলে রস্তভ বলল, আর প্রধান সেনাপতির সঙ্গে দেখা হবার আগেই যদি সম্রাটের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যায় ইয়োর এক্সেলেন্সি?
