এই আকস্মিক চিৎকারে সম্রাটের ঘোড়াটা চমকে উঠল।
ঈষৎ হেসে জনৈক অনুগামীর দিকে তাকিয়ে সম্রাট নির্ভীক আপশেরন সৈনিকদের দেখিয়ে কি যেন বলল।
*
অধ্যায়-১৬
অ্যাডজুটান্টদের সঙ্গে নিয়ে কুতুজভ হাল্কা বন্দুকধারীদের পিছনে পায়ে-হাঁটা চালে ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে চলল।
আধ মাইল পথ যাবার আগেই একটা নির্জন, পরিত্যক্ত বাড়ির সামনে সে থামল, বাড়িটা সম্ভবত একসময় সরাইখানা ছিল, সেখান থেকে দুটো রাস্তা দুই দিকে চলে গেছে। দুটো রাস্তাই পাহাড় থেকে নিচে নেমে গেছে, আর দুটো রাস্তা ধরেই সৈন্যরা এগিয়ে চলেছে।
কুয়াশা কেটে যাচ্ছে, উল্টো দিকের পাহাড়ের উপর মাইল দেড়েক দূরবর্তী শত্রুসৈন্যদের অস্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। নিচে বাঁদিক থেকে গুলির আওয়াজ আরো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। কুতুজভ থেমে জনৈক অস্ট্রিয় অধিনায়কের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। তাদের পিছনে কিছুটা দূরে থেকে প্রিন্স আন্দ্রু তাদের লক্ষ্য করছিল, একজন অ্যাডজুটান্টের দিকে ঘুরে সে ছোট দূরবীণটা চাইল।
দূরের সৈন্যদের দিকে না তাকিয়ে সামনের পাহাড়ের উতরাইয়ের দিকে তাকিয়ে অ্যাডজুটান্টটি বলে উঠল, দেখুন, দেখুন, ঐ তো ফরাসিরা!
দুই অধিনায়ক ও অ্যাডজুটান্ট দূরবীণটা ধরে কাড়াতাড়ি শুরু করে দিল। তাদের সকলের মুখেই হঠাৎ আতংকের ভাব ফুটে উঠল। এতক্ষণ মনে করা হচ্ছিল যে ফরাসিরা মাইল দেড়েক দূরে রয়েছে, কিন্তু হঠাৎ একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে তারা আমাদের ঠিক সামনে এসে পড়েছে।
ওরা কি শত্রুসৈন্য?…না!…হ্যাঁ, তাই বটে!…নির্ঘাৎ…কিন্তু তা কি করে হবে? নানা জনে নানা কথা বলতে লাগল।
খালি চোখে নিচে ডান দিকে তাকিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু দেখল, কুতুজভ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে তার পাঁচশো পায়ের মধ্যেই একটি ঘনসন্নিবিষ্ট ফরাসি সেনাদল আপশেরন বাহিনীর সঙ্গে মোকাবিলা করতে এগিয়ে আসছে।
এই তো এসেছে! এসেছে চূড়ান্ত মুহূর্তটি! এবার আমার পালা! এই কথা ভেবে প্রিন্স আন্দ্রু ঘোড়া ছুটিয়ে কুতুজভের সামনে হাজির হল।
চেঁচিয়ে বলল, আপশেরনদের থামাতেই হবে ইয়োর এক্সেলেন্সি। কিন্তু ঠিক সেইমুহূর্তে একটা ধোয়ার মেঘ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, খুব কাছেই শোনা গেল গোলার শব্দ, আর প্রিন্স আন্দ্রুর দুপা দূর থেকেই একটি আতংকিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল : ভাইসব! সব গেল! আর সেই স্বর শুনে যেন সেনাপতির নির্দেশ পেয়েছে এমনিভাবে সকলেই ছুটতে শুরু করল।
বিপর্যস্ত ক্রমবর্ধমান জনতা ছুটতে ছুটতে সেইদিকে ফিরে চলল যেখানে মাত্র পাঁচ মিনিট আগে তারা সম্রাটের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল। সে জনতার গতিরোধ করা শক্ত তো বটেই, এমনকি তার চাপে নিজেও পিছিয়ে না গিয়ে উপায় ছিল না। বলকনস্কি বিমূঢ়ভাবে চারদিকে তাকাতে লাগল, তার সামনে কী যে ঘটছে তা বুঝতেও পারছে না। নেসভিৎস্কি রাগে মুখ লাল করে কুতুজভকে চেঁচিয়ে বলছে, সে যদি এই মুহূর্তে ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে না যায় তাহলে তাকে নির্ঘাত বন্দি হতে হবে। কুতুজভ এক জায়গায়ই দাঁড়িয়ে রইল, কোনো জবাব না দিয়ে একটা রুমাল বের করল। তার গাল থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। প্রিন্স আন্দ্রু ছুটে তার কাছে এগিয়ে গেল।
নিচের চোয়ালটা কাঁপাতে কাঁপাতে সে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি আহত?
রক্তাক্ত গালের উপর রুমালটা চেপে ধরে পলায়মান সৈন্যদের দেখিয়ে কুতুজভ বলল, আঘাতটা এখানে নয়, ওখানে! ওদের থামাও! সঙ্গে সঙ্গে ওদের থামানো যে অসম্ভব সেটা বুঝতে পেরে নিজেই ডান দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
পলায়মান জনতার আর একটা ঢেউ তাকে ঘিরে ধরে পিছনের দিকে ঠেলে নিয়ে গেল।
সৈন্যরা এত ঘন হয়ে ছুটছে যে একবার তাদের মধ্যে পড়ে গেলে বেরিয়ে আসা খুবই শক্ত। একজন হক দিল, এগিয়ে চল! আমাদের বাধা দিচ্ছ কেন? আর একজন ঘুরে দাঁড়িয়ে আকাশ লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ল, আর একজন কুতুজভের ঘোড়াটাকেই আঘাত করতে লাগল। অনেক কষ্টে সেই বন্যাস্রোতের মতো জনতার ভিতর থেকে বাঁদিক দিয়ে বেরিয়ে অর্ধেকের বেশি সঙ্গীদের হারিয়ে কুতুজভ একটা গোলার শব্দ লক্ষ্য করে ছুটে গেল। প্রিন্স আন্দ্রুও জোর করে সেই পলাতক বাহিনীর ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে কুতুজভের কাছাকাছি থাকবার চেষ্টা করতে লাগল এবং দেখতে পেল, পাহাড়েরর ঢালুর উপর থেকে রুশ কামানশ্রেণী তখনো গোলাবর্ষণ করে চলেছে, আর ফরাসিরা সেইদিকে ছুটে যাচ্ছে। আরো উপরে দাঁড়িয়ে আছে কিছু রুশ পদাতিক, কামানশ্রেণীকে রক্ষা করতে তারা সামনেও এগিয়ে যাচ্ছে না, আবার পলায়মান জনতার সঙ্গে পিছুও হটছে না। একজন অশ্বারোহী অধিনায়ক পদাতিক বাহিনীর ভিতর থেকে বেরিয়ে কুতুজভের কাছে এগিয়ে এল। কুতুজভের দলবলের মধ্যে মাত্র চারজন তার সঙ্গে আছে। তারা সকলেই বিষণ্ণ মুখে নীরবে পরস্পরকে দেখছে।
পলায়মান সৈনিকদের দেখিয়ে কুতুজভ কোনোরকমে রেজিমেন্ট অধিনায়ককে বলল, ঐ হতভাগাদের থামান। কিন্তু ঠিক সেইসময় বুঝিবা ঐ কথাগুলির শাস্তি হিসেবেই শত্রুর বুলেট এক ঝাঁক ছোট পাখির মতো রেজিমেন্ট ও কুতুজভের দলের উপর দিকে হিস হিস শব্দে ছুটতে লাগল।
ফরাসিরা কামানশ্রেণীকে আক্রমণ করেছে, কুতুজভকে দেখতে পেয়ে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছে। এই গোলাগুলির সামনে রেজিমেন্ট-অধিনায়কটি পা চেপে ধরে বসে পড়ল জনাকয়েক সৈন্য পড়ে গেল, এবং একজন দ্বিতীয় লেফটেন্যান্টের হাত থেকে পতাকাটা পড়ে গেল। পতাকাটা পড়বার সময় নিকটস্থ সৈন্যদের বন্দুকের মাথায় জড়িয়ে গেল। বিনা হুকুমেই সৈন্যরা গুলি ছুঁড়তে শুরু করে দিল।
