খুব ভালো, খুব ভালো! প্রিন্স আল্লুকে কথাটা বলে সে পাশে দাঁড়ানো ঘড়ি-হাতে অধিনায়কের দিকে ফিরে তাকাল, সে বলতে লাগল, যেহেতু বাঁদিককার সেনাদল নিচে নেমে গেছে, এবার তাদের যাত্রা শুরু করবার সময় হয়েছে।
হাই তুলতে তুলতেই কুতুজভ অস্ফুটে বলল, অনেক সময় আছে ইয়োর এক্সেলেন্সি। সে আবারও বলল, যথেষ্ট সময় আছে।
ঠিক সেই সময় কুতুজভের পিছন দিক থেকে রেজিমেন্টের অভিবাদনের শব্দ শোনা গেল, সে শব্দ অগ্রসরমান রুশ সেনাদলের একদিক থেকে আর একদিক ব্যেপে দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল। বোঝা গেল সৈন্যরা যাকে অভিবাদন জানাচ্ছে সে অতি দ্রুত এগিয়ে আসছে। কুতুজভের ঠিক সম্মুখবর্তী সৈন্যরা যখন সে আওয়াজে যোগ দিল তখন সে একপাশে সরে গিয়ে ভুরু কুঁচকে চারদিকে তাকাতে লাগল। প্রাজেন থেকে আসবার রাস্তা ধরে বিভিন্ন ইউনিফর্ম পরিহিত একদল অশ্বারোহী জোর কদমে ছুটে আসছে। তাদের দুইজন আসছে পাশাপাশি দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে। একজনের পরনে কালো ইউনিফর্ম, টুপিতে পালক গোঁজা, বাদামি রঙের ঘোড়া, অপর জনের শাদা ইউনিফর্ম, কালো রঙের ঘোড়া। দুই সম্রাট আসছে, পিছনে দলবল। অভিজ্ঞ সৈনিকের ভঙ্গিতে কুতুজভ হাঁক দিল, সাবধান। তারপর এগিয়ে গিয়ে সম্রাটকে অভিবাদন জানাল। তার গোটা চেহারাও ভাবভঙ্গি হঠাৎ পাল্টে গেল। বিনা তর্কে বশংবদ হবার ভঙ্গি তার চোখে-মুখে। তার এই বশংবদ শ্রদ্ধার ভাবে আলেক্সান্দার কিন্তু খুশি হল না।
অবশ্য সে অখুশির ভাবটা নির্মল আকাশের বুকে একটুকরো মেঘের মতো সম্রাটের যৌবনদীপ্ত মুখের উপর মুহূর্তের জন্য ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল। ওলমুজ যুদ্ধক্ষেত্রে বলকনস্কি যখন তাকে দেশের বাইরে প্রথম দেখেছিল, সে তুলনায় অসুখের পরে আজ তাকে অপেক্ষাকৃত কৃশ দেখাচ্ছে, কিন্তু তার দুটি সুন্দর চোখে এখনো রয়েছে মহিমা ও কোমলতার সেই যাদুকরী সংমিশ্রণ, পাতলা ঠোঁট দুখানিতে রয়েছে বিচিত্র ভাবপ্রকাশের সেই ক্ষমতা, আর সহৃদয় নির্দোষ যৌবনের সেই একই চেহারা।
দুই সম্রাটের সঙ্গীদলে রয়েছে রুশ ও অস্ট্রিয় বাহিনীর রক্ষীদল ও রেজিমেন্টের যত সব বাছাই-করা যুবক অফিসার। জানালা খুলে দিলে যেমন বাইরের খোলা হাওয়ায় ঘরের গুমোেট ভাব কেটে যায়, তেমনই এই সব প্রদীপ্ত যুবকদের আগমনে কুতুজভের নিরানন্দ সেনাদলের মধ্যে যেন যৌবন, উৎসাহ ও সাফল্যের আশ্বাসের খোলা হাওয়া বয়ে গেল।
সৌজন্যের সঙ্গে সম্রাট ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে সম্রাট আলেক্সান্দার তাড়াতাড়ি কুতুজভকে বলল, আপনি কেন যাত্রা করছেন না মাইকেল ইলারিওনভিচ?
শ্রদ্ধায় আনত হয়ে কুতুজভ জবাব দিল, আমি অপেক্ষা করছি ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি।
ঈষৎ ভ্রুকুটি করে সম্রাট এমনভাবে কান পাতল যেন ঠিক শুনতে পায়নি।
অপেক্ষা করছি ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি, কুতুজভ পুনরায় বলল। (প্রিন্স আন্দ্রু লক্ষ্য করল, অপেক্ষা করছি কথাটা বলার সময় কুতুজভের উপরের ঠোঁটটা অস্বাভাবিকভাবে কেঁপে উঠল।) সবগুলি সেনাদল এখনো ঠিকমতো সাজানো হয় নি ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি।
সম্রাট শুনল, কিন্তু জবাবটা তার পছন্দ হল না, ঘাড় ঝাঁকুনি দিয়ে নিকটস্থ নভসিলৎসেভের দিকে তাকাল।
আপনি তো জানেন মাইকেল ইলারিওনভিচ, যে ম্রাজ্ঞীর মাঠে সৈন্যরা সমবেত না হওয়া পর্যন্ত কুচকাওয়াজ শুরু হয় না এখন আমরা সেখানে নেই, পুনরায় সম্রাট ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে জার কথাগুলি বলল, যেন তার ইচ্ছা তাকে সমর্থন না করলেও সম্রাট তার কথাগুলি অন্তত শুনুক। কিন্তু সম্রাট ফ্রান্সিস চারদিকটা দেখতেই ব্যস্ত, তার কথায় কান দিল না।
সম্রাট যাতে শুনতে পায় সেজন্য কুতুজভ এবার জোর গলায় বলল, ঠিক সেই কারণেই আমি যাত্রা শুরু করি নি স্যার, কারণ এখানে আমরা কুচকাওয়াজও করছি না, আর সম্রাজ্ঞীর মাঠেও দাঁড়িয়ে নেই।
সম্রাটের দলবল দ্রুত দৃষ্টি-বিনিময় করে নিজেদের অসন্তোষ ও তিরস্কার প্রকাশ করতে লাগল। তাদের সে-দৃষ্টির অর্থ, বুড়ো মানুষ হলেও এভাবে কথা বলা তার উচিত হয় নি।
একাগ্র পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে কুতুজভের চোখের দিকে তাকিয়ে জার অপেক্ষা করতে লাগল, সে আরো কিছু বলে কি না তাই শুনবার জন্য। কিন্তু কুতুজভও সশ্রদ্ধভাবে মাথা নুইয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। প্রায় এক মিনিট দুজনই নীরব।
তারপর মাথা তুলে কুতুজভ বলল, অবশ্য আপনি যদি হুকুম করেন ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি।
ঘোড়াটাকে ছুঁয়ে অধিনায়ক মিলোরাদভিচকে ডেকে সে যাত্রা শুরুর নির্দেশ দিল।
সেনাদল চলতে শুরু করল, নভগরদ ও আপশেরন রেজিমেন্টের দুই দল সৈন্য সম্রাটের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল।
লাল মুখ মিলোরাদভিচ দ্রুতগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে যেতে যেতে সম্রাটের সামনে এসে ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে তাকে অভিবাদন জানাল।
সম্রাট বলল, ঈশ্বর আপনার সহায় হোন সেনাপতি।
সানন্দে সে ফরাসিতে জবাব দিল, সত্যি স্যার, যা কিছু করা সম্ভব সবই আমরা করব। তার মুখে কাঁচা ফরাসি ভাষা শুনে জারের দলের দ্ৰজনরা ব্যঙ্গের হাসি হাসল।
মিলোরাভিচ হঠাৎ তার ঘোড়ার মুখটা ঘুরিয়ে দিয়ে সম্রাটের ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে হাঁক দিল, বাছারা, শুধু এ গ্রামটা নয়, আরো অনেক গ্রাম তোমাদের দখল করতে হবে।
সাধ্যমতো চেষ্টা করব, সৈন্যরা হাঁক দিল।
