*
অধ্যায়-১৫
আটটায় চতুর্থ সেনাদলের অধিনায়ক হিসেবে কুতুজভ সসৈন্যে এগিয়ে গেল প্রাৎজেনে। সম্মুখবর্তী রেজিমেন্টের সৈন্যদের অভিনন্দন জানিয়ে সে তাদের যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিল, তাদের বুঝিয়ে দিল যে সে নিজেই তাদের পরিচালনা করবে। প্রাজেন গ্রামে পৌঁছে সে থামল। প্রধান সেনাপতির দলবলের মধ্যে তার পিছনেই ছিল প্রিন্স আন্দ্রু। তার মনে চাপা উত্তেজনা ও বিরক্তি, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুহূর্ত আসন্ন হওয়ায় আজ সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে বেঁধে রেখেছে। তার একান্ত বিশ্বাস, আজকের দিনটিই তার কাছে তবে তুলো, অথবা আর্কোলার সেতু (১৭৯৬ সালে এটাই ছিল নেপোলিয়নের এক উজ্জ্বল সাফল্যের ঘটনাস্থল)। সে ঘটনা কোন পথে ঘটবে তা সে জানে না, কিন্তু তার নিশ্চিত ধারণা যে তাই ঘটবে।
নিচে কুয়াশার মধ্যে বাঁদিক থেকে অদৃশ্য সৈন্যদের বন্দুকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। প্রিন্স আন্দ্রুর ধারণা, যুদ্ধটা সেখানেই কেন্দ্রীভূত হবে। সে ভাবল, ওখানেই আমরা বিপদের সম্মুখীন হব, আর একটা ব্রিগেড বা ডিভিশন দিয়ে ওখানেই আমাকে পাঠানো হবে, আর ওখানেই পতাকা হাতে নিয়ে আমি এগিয়ে যাব, যা কিছু আমার সামনে পড়বে তাকেই ভেঙে চুরমার করে দেব।
অগ্রসরমান সৈনিকদের হাতের পতাকার দিকে সে শান্ত মনে তাকাতে পারছিল না, তার কেবলই মনে হচ্ছিল, হয়তো ওই পতাকাটি হাতে নিয়েই আমি সেনাদলকে পরিচালনা করব।
ঘন কুয়াশা এখন সকালবেলায় পাহাড়ের উপরে জমাট হিমানীকণা থেকে শিশিরে পরিণত হয়েছে, কিন্তু নিচের উপত্যকায় এখন কুয়াশাকে দেখাচ্ছে দুগ্ধশুভ্র সমুদ্রের মতো। উপত্যকার বাদিকে আমাদের সৈন্যরা নেমে গেছে, আর সেখান থেকেই আসছে গুলির শব্দ, কিন্তু সেখানকার কিছুই দেখা যাচ্ছে না। পাহাড়ের উপরে পরিষ্কার আকাশ, ডানদিকে সূর্যের প্রকাণ্ড বৃত্ত। সম্মুখে কুয়াশা-সমুদ্রের ওপারে দেখা যাচ্ছে গাছপালায় ঢাকা কয়েকটা পাহাড়, শত্রুসৈন্য সম্ভবত সেখানেই আস্তানা নিয়েছে, কারণ ওখানে কিছু একটা চোখে পড়ছে। ডানদিকে রক্ষীবাহিনী কুয়াশা-ঢাকা অঞ্চলে ঢুকে গেল, কানে এল তাদের ঘোড়র ক্ষুরের ও চাকার শব্দ, চোখে পড়ল তাদের বেয়নেটের ঝিলিক, বাঁদিক থেকেও অনুরূপ একটি অশ্বারোহী বাহিনী এসে কুয়াশার সমুদ্রে অদৃশ্য হয়ে গেল; সামনে ও পিছনে চলাফেরা করছে পদাতিক বাহিনী। প্রধান সেনাপতি দাঁড়িয়ে আছে গাঁয়ের শেষ প্রান্তে, সৈনিকরা তার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। সেই সকালে কুতুজভকে শ্রান্ত ও বিরক্ত মনে হচ্ছে। তার সামনে দিয়ে চলতে চলতে পদাতিক বাহিনী বিনা হুকুমেই হঠাৎ থেমে গেল, মন হল সামনে কোনো কিছুতে বাধা পেয়েছে।
একজন অশ্বারোহী অধিনায়ক সেখানে হাজির হলে কুতুজভ রেগে বলল, হুকুম দিন, সারিবদ্ধভাবে ওরা গ্রামটাকে ঘুরে এগিয়ে যাক। আপনি কি বুঝতে পারছেন না ইয়োর এক্সেলেন্সি প্রিয় মহাশয় যে শত্রুর বিরুদ্ধে অগ্রসর হবার সময় সংকীর্ণ গ্রামের পথে আপনি দলছুটভাবে এগিয়ে চলতে পারেন না?
অধিনায়ক জবাব দিল, গ্রামে ঢোকার মুখেই আমি ওদের শ্ৰেণীবদ্ধ করতে চেয়েছিলাম ইয়োর এক্সেলেন্সি।
কুতুজভ তিক্ত হাসি হেসে উঠল।
শত্রুপক্ষের চোখের সামনে ভালো দৃষ্টান্তই রেখেছেন! খুব ভালো!
শত্রুপক্ষ এখনো অনেক দূরে রয়েছে ইয়োর এক্সেলেন্সি। সেনাসমাবেশের চিত্র অনুসারে…
সেনাসমাবেশ! কুতুজভ চিৎকার করে উঠল। কে আপনাকে একথা বলেছে…দয়া করে হুকুমমতো কাজ করুন।
ঠিক আছে স্যার।
প্রিন্স আন্দ্রুর কানে কানে নেসভিৎস্কি বলল, বুড়ো দেখছি কুকুরের মতো ক্ষেপে গেছে।
টুপিতে সবুজ পালক গোঁজা শাদা ইউনিফর্ম-পরিহিত জনৈক অস্ট্রিয় অফিসার জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে সম্রাটের নামে কুতুজভকে জিজ্ঞাসা করল, চতুর্থ সেনাদল যুদ্ধে নেমেছে কি না।
কোনো জবাব না দিয়ে মুখ ঘোরাতেই তার চোখ পড়ল পাশে দাঁড়ানো প্রিন্স আন্দ্রুর উপর। তাকে দেখে কুতুজভের মুখের ভাব কিছুটা নরম হল, তবু অস্ট্রিয় অ্যাডজুটান্টের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সে বলকনস্কিকে বলল, দেখে এস তো তৃতীয় সেনাদলটি গ্রাম ছেড়েছে কি না। তাদের থামতে বল, তারা যেন আমার নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে।
প্রিন্স আন্দ্রু যাবার জন্য পা বাড়াতেই সে তাকে থামিয়ে দিল।
দক্ষ বন্দুকবাজদের কাজে লাগানো হয়েছে কি না তাও জেনে এস। ওরা কি করছে? অস্ট্রিয় অফিসারকে কিছু না বলে কুতুজভ নিজের মনেই বলতে লাগল।
হুকুম তামিল করতেই প্রিন্স আন্দ্রু ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। অগ্রসরমান সেনাদলকে ধরে ফেলে তাদের থামিয়ে সে প্রথমেই বুঝে নিল যে আমাদের সেনাদলের সামনের সারিতে কোনো দক্ষ বন্দুকবাজ নেই। প্রধান সেনাপতির হুকুম শুনে রেজিমেন্ট-অধিনায়ক খুবই অবাক হয়ে গেল। তার নিশ্চিত ধারণা, তার সামনে অন্য দল রয়েছে, আর শত্রুপক্ষ রয়েছে অন্তত ছয় মাইল দূরে। ঘন কুয়াশায় ঢাকা অনুর্বর উতরাই ছাড়া সামনে আর কিছুই চোখে পড়ছে না। প্রধান সেনাপতির নামে ভুল সংশোধনের হুকুম দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে গেল। কুতুজভ তখনো সেই একই জায়গায় বয়সের ভারে ক্লান্ত ভারি দেহ নিয়ে ঘোড়ার পিঠে পেচে বসে চোখ বুজে হাই তুলছে। সৈন্যরা এখন আর এগিয়ে যাচ্ছে না, বন্দুকের কুঁদো মাটিতে চুঁইয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
