অনেকটা সরে গেছে, আর তাই অশ্বারোহী বাহিনীকে হুকুম করা হল, তারা যেন ডান দিকে ঘুরে যায়। কয়েক হাজার অশ্বারোহী পদাতিক সামনে দিয়ে চলতে শুরু করল, আর তাই পদাতিক বাহিনীকে থেমে পড়তে হল।
একঘন্টা আটক থাকার পর শেষপর্যন্ত তারা পাহাড় বেয়ে নামতে শুরু করল। পাহাড়ের উপরে কুয়াশা সরতে শুরু করলেও নিচে আরো ঘন হয়ে নেমেছে। সেই কুয়াশার মধ্যে সামনে একটা গুলির শব্দ শোনা গেল, তারপর আর একটা, প্রথমে অনিয়মিতভাবে কিছুক্ষণ পর পর… ট্রাটা… টাট–তারপর আরো নিয়মিতভাবে দ্রুতভাবে দ্রুততর গতিতে, গোল্ডবাক নদীর তীরে শুরু হল তুমুল যুদ্ধ।
তারা ভাবেনি নদীর তীরে শত্রুর সঙ্গে দেখা হবে, কুয়াশার মধ্যে হঠাৎ শত্রুর একেবারে মুখে এসে পড়েছে, অধিনায়করাও কোনো উৎসাহের বাণী শোনাচ্ছে না, সকলের মনেই একটা ধারণা জন্মেছে যে তারা অনেক দেরি করে ফেলেছে, তার উপরে ঘন কুয়াশায় তারা কোথাও কিছু দেখতেও পাচ্ছে না–এসব কারণে রুশ সৈন্যরা ধীরে সুস্থে কিছু গুলি ছুড়ল, কিছুটা এগিয়ে গেল, আবার থামল। অফিসার অথবা অ্যাডজুটান্টদের কাছ থেকেও সময়মতো কোনো নির্দেশ এল না, কারণ এই অপরিচিত পরিবেশে তারাও কুয়াশার মধ্যে ইতস্তত ঘুরছে, কার রেজিমেন্ট কোথায় আছে কিছুই বুঝতে পারছে না। এইভাবে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সেনাদল যুদ্ধে নেমে পড়ল, কারণ তারা নিচের উপত্যকায় নেমে এসেছে। কুতুজভস চতুর্থ সেনাদল প্রাজেন পাহাড়ের উপরেই দাঁড়িয়ে রইল।
নিচে যেখানে যুদ্ধ শুরু হয়েছে সেখানটা এখনো ঘন কুয়াশায় ঢাকা, উপরের দিকটা পরিষ্কার হয়ে এলেও সামনে কী ঘটছে তার কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শত্রু সৈন্যরা সকলেই মাইল ছয়েক দূরে আছে, (যেটা আমাদের ধারণা), না কি এই কুয়াশার সমুদ্রে তারা নিকটেই কোথাও আছে, বেলা আটটার আগে তা কেউ জানতে পারল না।
সকাল নয়টা। নিচে একটা কুয়াশা তখনো অখণ্ড সমুদ্রের মতো পড়ে আছে, কিন্তু আরো উঁচুতে শ্লাপ্পানিজ গ্রামে তখন আবহাওয়া বেশ পরিষ্কার হয়ে গেছে। মার্শালদের সঙ্গে নিয়ে নেপোলিয়ন সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথার উপরে পরিষ্কার নীল আকাশ, কুয়াশার শাদা সমুদ্রের বুকে সূর্যের প্রকাণ্ড বৃত্তটা কাঁপছে একটা মস্ত বড়, ফাঁপা, রক্তিম নৌকোর মতো। সকোলনিজ ও শ্লাপ্পানিজ গ্রাম দুটির পিছনকার যেসব নদী ও খাড়ির পাশে ঘাঁটি স্থাপন করে আমরা যুদ্ধ শুরু করতে চেয়েছিলাম, গোটা ফরাসি বাহিনী, এমন কি নেপোলিয়ন নিজেও দলবল নিয়ে সেখানে ছিল না, তারা সকলেই রয়েছে এই পাশে আমাদের সেনাদলের এত কাছে যে খালি চোখেই নেপোলিয়ন একজন ঘোড়সওয়ার ও একজন পদাতিককে আলাদা করে চিনতে পারছে। ইতালি অভিযানের সময় নেপোলিয়ন যে নদী জোব্বাটা পরত সেটা পরেই একটা ছোট ধূসর আরবি ঘোড়ার সওয়ার হয়ে সে মার্শালদের কিছুটা সামনে রয়েছে। নিঃশব্দে সে পাহাড়শ্রেণীর দিকে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে সেগুলো যেন কুয়াশার সমুদ্র থেকে জেগে উঠেছে, সেখানে অনেক দূরে রুশ সৈন্যরা চলাফেরা করছে, নিচের উপত্যকায় গুলির আওয়াজ সে কান পেতে শুনছে। তার শীর্ণ মুখের একটা মাংসপেশীও কাঁপছে না। ঝকঝকে চোখ দুটি একটা জায়গার উপরেই স্থির নিবদ্ধ। তার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হতে চলেছে। রুশ বাহিনীর একটা অংশ ইতিমধ্যেই উপত্যকায় নেহে পুকুর ও হ্রদগুলোর দিকে এগিয়ে চলেছে, আর বাকি অংশও প্রাজেন পাহাড়শ্রেণী ছেড়ে যাচ্ছে। নেপোলিয়নেরও মনের বাসনা ওই পাহাড়শ্রেণীকেই আক্রমণ করবে, কারণ ঘাঁটি হিসেবে ওটাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। কুয়াশার উপর দিয়ে সে দেখতে পেল, প্রাজেন গ্রামের নিকটবর্তী দুটো পাহাড়ের ভিতরকার খড়িটা ধরে রুশ বাহিনী দলে দলে এগিয়ে চলেছে, তাদের বেয়নেটগুলো ঝিকমিক করছে, একের পর এক তারা উপত্যকার দিকেই অবিরাম এগিয়ে চলেছে, সারারাত অগ্রবর্তী ঘাঁটিগুলিতে চাকার ও পায়ের যেসব আওয়াজ শুনেছে, এবং রুশ সেনাদলের যে বিশৃঙখল গতিবিধি তার চোখে পড়েছে-এইসব থেকে সে পরিষ্কার বুঝতে পেলেছে যে মিত্রশক্তির বিশ্বাস যে সে রয়েছে তাদের সামনের দিকে অনেক দূরে, যে সেনাদলগুলি প্রাজেনের কাছাকাছি চলাফেরা করছে তারাই রুশ বাহিনীর কেন্দ্র, এবং সফল আক্রমণের পক্ষে সে কেন্দ্র ইতিমধ্যেই যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েছে। তথাপি নেপোলিয়ন যুদ্ধ শুরু করল না।
আজ তার কাছে একটা মস্ত বড় দিন-তার রাজ্যাভিষেকের বার্ষিকী দিবস। ভোরের আগে সে ঘণ্টাকয়েক ঘুমিয়েছে, তারপরে উৎসাহে, উদ্যমে ভরপুর হয়ে খোশ মেজাজে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ছুটে এসেছে এখানে, তার মনে এখন সেই সুখের হাওয়া যাতে মনে হয় যে সবকিছুই সম্ভব, সবকিছুই সাফল্যে ভরা। কুয়াশার উপর দিয়ে পাহাড়শ্রেণীর দিকে তাকিয়ে সে চুপচাপ বসে রইল, তার নিরুত্তাপ মুখে আত্মবিশ্বাস ও আত্মতৃপ্তির সেই বিশেষ দৃষ্টি ফুটে উঠেছে যা দেখা যায় মধুর ভালোবাসায় বিভোর কোনো বালকের মুখে। মার্শালরা তার পিছনে দাঁড়িয়ে রইল, তার মনোযোগে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে সাহস পেল না। সে তাকাচ্ছে একবার প্রাজেন পাহাড়শ্রেণীর দিকে, আবার কুয়াশার ভিতর থেকে ভেসে আসা সূর্যের দিকে।
সূর্য যখন কুয়াশার ভিতর থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এল, এবং চারদিকে মাঠ ও কুয়াশা উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করে উঠল, তখন যেন এইজন্যই সে যুদ্ধ শুরু করার ব্যাপারে অপেক্ষা করেছিল–সে সুগঠিত হাত থেকে দস্তানা খুলে মার্শালদের উদ্দেশ্য কী যেন ইশারা করে যুদ্ধ শুরু করার নির্দেশ দিল। অ্যাডজুটান্টদের সঙ্গে নিয়ে মার্শালরা ঘোড়া ছুটিয়ে নানা দিকে ছুটে গেল এবং কয়েক মিনিট পরেই ফরাসি বাহিনীর প্রধান সেনাদল দ্রুতগতিতে প্রাজেন পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলল, ওদিকে রুশ সেনাদল তখন ক্রমাগত নিচের উপত্যকায় নেমে যাওয়ায় প্রাজেন পাহাড় জনশূন্য হয়ে পড়ছে।
