*
অধ্যায়-১৪
সকাল পাঁচটা এখনো বেশ অন্ধকার। মধ্যবর্তী সেনাদল, রিজার্ভ সেনাদল এবং ব্যাগ্রেশনের দক্ষিণ পার্শ্বস্থ সেনাদল এখনো চলতে শুরু করেনি, কিন্তু বামপার্শ্বস্থ যে পদাতিক, অশ্বারোহী ও গোলন্দাজ সেনাদলের প্রথমে পাহাড় থেকে নেমে গিয়ে ফরাসি বাহিনীর দক্ষিণপা আক্রমণ করবার এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের বোহেমীয় পর্বতমালার দিকে ঠেলে নিয়ে যাবার কথা, তারা ইতিমধ্যেই জেগে উঠে নড়াচড়া শুরু করে দিয়েছে। যত কিছু বাড়তি জিনিস শিবির-আগুনে ফেলে দেওয়ার ফলে ধোয়ায় চোখ জ্বালা করছে। বাইরে ঠাণ্ডা ও অন্ধকার।
অফিসাররা তাড়াহুড়া করে চা খাচ্ছে, প্রাতরাশ খাচ্ছে, সৈন্যরা বিস্কুট চিবুচ্ছে, শরীর গরম করবার জন্য পা দিয়ে তাল ঠুকছে। চেয়ার, টেবিল, চাকা, বালতি, চালাঘরের অবশিষ্ট অংশ-এককথায় যা কিছু তাদের দরকার নেই অথবা বয়ে নিয়ে যেতে পারবে না সে সবই তারা আগুনের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। যেই একজন অস্ট্রিয় অফিসারকে দেখা গেল কমান্ডিং অফিসারের বাসস্থানের সামনে, অমনি রেজিমেন্টটা চঞ্চল হয়ে উঠল : সৈন্যরা আগুনের কাছ থেকে ছুটে গেল, পাইপগুলো ঢুকিয়ে দিল বুটের মধ্যে, থলেগুলো তুলে দিল গাড়িতে, বন্দুক ঘাড়ে নিয়ে সার বেঁধে দাঁড়াল।
অফিসাররা কোটের বোতাম আটকাল, কোমরের পেটিতে তরবারি ঝোলাল, তারপর চিৎকার করতে করতে সৈন্যদের সঙ্গে চলতে লাগল। গাড়ির চালক ও আর্দালিরা গাড়িতে ঘোড়া জুড়ল, মালবোঝাই করল, সবকিছু বেঁধেছেদে নিল । অ্যাডজুটান্ট ও অধিনায়করা ঘোড়ায় চেপে ক্রুশ-চিহ্ন আঁকল, চূড়ান্ত নির্দেশ ও হুকুম জারি করল। তারপর শুরু হল সেনাদলের যাত্রা, কোথায় চলেছে তা জানে না, ধোঁয়া ও ক্রমবর্ধমান কুয়াশার জন্য যে জায়গা ছেড়ে যাচ্ছে তাও দেখতে পাচ্ছে না, আবার যেখানে চলেছে তাও দেখতে পাচ্ছে না।
কুয়াশা এত ঘন হয়ে উঠেছে যে আলো ফোঁটা সত্ত্বেও দশ পা দূরের কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ঝোঁপগুলোকে দেখাচ্ছে মস্তবড় গাছের মতো, সমান জমিকে দেখাচ্ছে উঁচু-নিচু। যে কোনো জায়গায় যে কোনো দিকে দশ পা দূরেই অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেনাদলগুলি দীর্ঘ সময় ধরে একই রকম কুয়াশার মধ্যে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, বাগান-বেড়া এড়িয়ে, নতুন নতুন অজানা জমির উপর দিয়ে এগিয়ে চলল, কোথাও শত্রুর মুখোমুখি হল না। উপরন্তু সৈন্যরা বুঝতে পারল, সামনে-পিছনে সবদিকেই অন্যসব রুশ সৈন্যরাও একই দিকে এগিয়ে চলেছে। প্রতিটি সৈন্য একথা জেনে খুশি হল, যে অচেনা জায়গায় সে চলেছে সেখানে আমাদেরই আরো অনেক সৈন্য চলেছে।
তারা বলাবলি করছে, ঐ দেখ, কুন্ঠিরাও আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল।
কী আশ্চর্য দেখ, আমাদের কত সৈন্য এখানে জমায়েত হয়েছে! কাল রাতে আমি শিবির-আগুনের দিকে তাকিয়েছিলাম, তার যেন আর শেষ নেই। মনে হল, বুঝি খাস মস্কোতেই আছি!
ঘন কুয়াশার মধ্যে প্রায় একঘণ্টা চলবার পরে অধিকাংশ সৈন্যকে থামতে হল, ফলে অস্বস্তির সঙ্গে সকলের মনে হল, কোথাও একটা বিভ্রান্তি ও গোলমাল ঘটেছে। এ ধারণা কেমন করে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল তা বলা শক্ত, কিন্তু অজান্তেই অতি দ্রুত ধারণাটা ছড়িয়ে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গেই সকলে ধরে নিল যে বোকা জার্মানদের (রুশ সৈন্যদের চোখে অস্ট্রিয় ও অন্যসব অ-রুশ সৈন্যই জার্মান) জন্যই এই গোলযোগ ঘটেছে, সকলেরই দৃঢ় ধারণা যে ঐ মাংসখেকোরাই একটা সাংঘাতিক বিপদের সূত্রপাত করেছে।
আমরা থেমে গেলাম কেন? রাস্তা বন্ধ না কি? অথবা আমরা কি ফরাসিদের মুখোমুখি হয়েছি।
তা নয়, তাদের কানও সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। তারা হলে গুলি চালাত।
তাড়াহুড়া করে তো আমাদের রওনা করিয়ে দেওয়া হল, আর এখানে মাঠের মাঝখানে বেকার আমাদের থামিয়ে দেওয়া হল। ঐ পাজী জার্মানরাই যত নষ্টের গোড়া! বোকা শয়তানের দল!
হ্যাঁ, আমি হলে ওদের সামনে ঠেলে দিতাম, কিন্তু কোনো ভয় নেই, তারা পিছনে ভিড় করে আছে। আর এখানে আমরা ক্ষিধেয় মরছি।
একজন অফিসার বলল, আমি বলি, পথ কি শিগগির খুলবে? সকলে বলছে, অশ্বারোহী বাহিনী পথ আটকে দিয়েছে।
আ, পাজী জার্মানরা! নিজেদের দেশকেও ওরা চেনে না!
ঘোড়া ছুটিয়ে এসে একজন অ্যাডজুটান্ট চেঁচিয়ে বলল, আপনারা কোন ডিভিশনের?
অষ্টাদশ।
তাহলে আপনারা এখানে কেন? আরো অনেক আগেই তো আপনাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল, এখন আর সন্ধ্যার আগে সেখানে পৌঁছতে পারবেন না।
কী সব বাজে হুকুম! কি যে করছে তা নিজেরাই জানে না! বলে অফিসার ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
তারপর একজন অধিনায়ক সক্রোধে অ-রুশ ভাষায় কি যেন বলতে বলতে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
তার কথার নকল করে একজন সৈন্য বলে উঠল, তাফা-লাফা! কি যে বিড়বিড় করে বলে গেল কিছুই বোঝা গেল না। শয়তানদের গুলি করা উচিত।
হুকুম হয়েছিল নয়টার আগে সেখানে পৌঁছতে হবে, কিন্তু এখনো আমরা আধাপথও পার হইনি। চমৎকার হুকুম! চারদিক থেকে নানা কণ্ঠে কথাগুলি ধ্বনিত হতে লাগল।
গোলমালের আসল কারণ হল, অস্ট্রিয় অশ্বারোহী বাহিনী যখন আমাদের বাঁদিক থেকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখতে পেল যে আমাদের কেন্দ্রবর্তী সেনাদল ডান-দিককার সেনাদল থেকে
