আচ্ছা? বুড়োটি বলল।
যাও তিত, গাওগে গীত! রসিক লোকটি বলল।
আরে, সব উচ্ছন্নে যা! বুড়ো বলল, আর্দালি ও চাকরদের হাস্যরোলে তার কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে গেল।
যাই হোক না কেন, সকলের উপর জয়লাভকেই আমি ভালোবাসি, মূল্য দেই। এই কুয়াশার মধ্যে আমার মাথার উপরে যে অলৌকিক শক্তি ও গৌরব ভেসে বেড়াচ্ছে তাকেই আমি মূল্য দেই।
*
অধ্যায়–১৩
সেই রাতে ব্যাগ্রেশনের সেনাদলের সামনে একটা খণ্ডযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব পড়েছিল একটি পল্টনসহ রস্তভের উপর। তার হুজারদের দুজন করে সারি দিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে, আর নিজের তন্দ্রার ভাবটা কাটানোর জন্য সে স্বয়ং অশ্বারোহণে চলেছে তাদের পাশে পাশে। কুয়াশার মধ্যেও আমাদের শিবির আগুনের অস্পষ্ট আলোয় চোখে পড়ছে পিছনকার বিস্তৃত প্রান্তর, সামনে কুশায়াচ্ছন্ন অন্ধকার। অনেক চেষ্টা করেও সেই কুয়াশার ভিতর দিয়ে রস্তভ দূরের কিছুই দেখতে পাচ্ছে না : কখনো মনে হচ্ছে শাদা কিছু চকচক করছে, কখনো দেখা যাচ্ছে কালো কালো কিছু, কখনো আলোর ফুটকি দেখে মনে হচ্ছে ওখানে শত্রুরা রয়েছে, আবার পরক্ষণেই মনে হচ্ছে সেটা তার চোখের ভুল। চোখ বুজে আসতেই কল্পনায় ভেসে উঠল–এই সম্রাট, এই দেনিসভ, এই মস্কোর কত স্মৃতি-তাড়াতাড়ি চোখ খুলতেই দেখতে পেল শুধু নিজের ঘোড়ার মাথা ও কান, হুজারদের কালো কালো মূর্তি, আর অনেক দূরে সেই একই কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার। রস্তভ ভাবতে লাগল :কেন হয় না?… এরকম তো সহজেই ঘটতে পারে যে সম্রাট আমার সঙ্গে দেখা করে বলবেন : যাও তো, দেখে এসো ওখানে কী আছে। এরকম ঘটনাক্রমে সম্রাটের সঙ্গে কোনো অফিসারের পরিচয় হল আর তিনি তাকে নিজের কাছে টেনে নিলেন-সম্রাট সম্পর্কে এরকম গল্প তো অনেক আছে। তিনি যদি আমাকেও তার পাশে একটু স্থান দেন তো দোষ কী? আঃ, আমি তাকে ভালোভাবে পাহারা দেব, তাকে সত্য কথা জানাব, তার প্রতারকদের মুখোশ খুলে দেব। হঠাৎ দূরের একটা হট্টগোলে তার তন্দ্রা ভেঙে গেল। চমকে উঠে সে চোখ খুলল।
চোখ খুলতেই তার কানে এল হাজার কণ্ঠের একটানা চিৎকার। দূরে একটা আগুন জ্বলে উঠেই নিভে গেল, তারপর আবার আগুন, পাহাড়ের উপরে ফরাসি বাহিনীর রেখা বরাবর আগুন জ্বলে উঠল, তাদের হৈ হুল্লা ক্রমেই বাড়তে লাগল। ফরাসিদের কথাবার্তারস্তভের কানে এল, কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারল না। নানা কণ্ঠস্বর মিলেমিশে একাকার, সে শুধু শুনতে পেল : আহা! আর। রস্তভ পাশের হুজারকে জিজ্ঞেস করল, ওটা কী? তুমি কিছু বুঝতে পারছ? ওটা নিশ্চয় শত্রুপক্ষের শিবির!
হুজার জবাব দিল না।
জবাবের জন্য অপেক্ষা করে রস্তভ পুনরায় জিজ্ঞেস করল, সে কী, তুমি শুনতে পাচ্ছ না?
হুজার অনিচ্ছার সঙ্গে জবাব দিল, কে বলতে পারে ইয়োর অনার?
রস্তভ পুনরায় বলল, যেদিকে দেখা যাচ্ছে তাতে শত্রুই হবে।
হুজার তো তো করে বলল, হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। যা অন্ধকার… এই, স্থির হ! নিজের চঞ্চল ঘোড়াটাকে সে বলল।
রস্তভের ঘোড়াটাও চঞ্চল হয়ে উঠেছে, জমাট বরফের উপর পা ঠুকছে, শব্দ শুনে কান খাড়া করে আছে, আর চোখ রেখেছে আলোর দিকে। চিৎকার ক্রমেই বাড়তে বাড়তে এমন একটা প্রচণ্ড গর্জন উঠল যা একমাত্র কয়েক হাজার সৈন্যের পক্ষেই করা সম্ভব। আলোগুলোও ক্রমেই ছড়িয়ে পড়তে লাগল। রস্তভ এখন আর ঘুমিয়ে পড়তে চায় না। শত্রুবাহিনীর উল্লসিত জয়সূচক চিৎকার তাকে নতুন প্রেরণা জুগিয়েছে। সম্রাট দীর্ঘজীবী হোন! সম্রাট! এবার সে স্পষ্ট শুনতে পেল।
ওরা খুব বেশি দূরে নয়, হয়তো নদীটার ঠিক ওপারেই, রস্তভ বলল পাশ্ববর্তী হুজারকে।
হুজার জবাব না দিয়ে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল, রাগতভাবে কাশল। জোর কদমে ছুটে আসা ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শোনা গেল, কুয়াশা ঢাকা অন্ধকারের ভিতর থেকে হঠাৎ আত্মপ্রকাশ করল জনৈক হুজার সার্জেন্টের মূর্তি, তাকে দেখাচ্ছে একটা হাতির মতো অতিকায়।
রস্তভের পাশে এসে সার্জেন্ট বলল, ইয়োর অনার, সেনাপতিরা!
রস্তভ তখনো আগুন ও হৈ হল্লার দিকেই তাকিয়ে ছিল। রস্তভ সার্জেন্টের সঙ্গে কয়েকজন অশ্বারোহীর সঙ্গে দেখা করতে এগিয়ে গেল। শত্রু শিবিরে আলো ও হল্লার এই বিচিত্র ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে এসেছে প্রিন্স ব্যাগ্রেশন ও প্রিন্স দলগরুক অ্যাডজুটান্টদের সঙ্গে নিয়ে। রস্তভ ব্যাগ্রেশনের দিকে এগিয়ে যুদ্ধের অবস্থা জানাল, এবং পরে সেনাপতিদের বক্তব্য শুনবার জন্য অ্যাডজুটান্টদের সঙ্গে মিলিত হল।
প্রিন্স দলগরুকভ ব্যাগ্রেশনকে বলল, বিশ্বাস করুন, এটা একটা চালাকি ছাড়া আর কিছুই না! সে নিজে পিছিয়ে গেছে, আর পশ্চাদ্বর্তী রক্ষীবাহিনীকে হুকুম দিয়েছে আমাদের ঠকাতে আগুন জ্বেলে হৈ-হল্লা করতে।
ব্যাগ্রেশন বলল, তা নয়। আজ সন্ধ্যায় তাদের আমি ওই গোল পাহাড়টার উপর দেখেছিলাম, পশ্চাদপসরণ করলে তারা ওখান থেকেও সরে যেত। …অফিসার!
সন্ধ্যায় তারা ওখানে ছিল, কিন্তু এখনকার কথা আমি জানি না ইয়োর এক্সেলেন্সি। আমার হুজারদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে দেখে আসব কী?রস্তভ জবাব দিল।
ব্যাগ্রেশন থামল, জবাব দেবার আগে কুয়াশার মধ্যে রভের মুখটা দেখতে চেষ্টা করল।
একটু চুপ করে থেমে বলল, আচ্ছা, তাই যাও, দেখে এসো।
