কী ভূগোলের পড়ারে বাবা! স্বগতোক্তি মনে হলেও অপরের শোনার পক্ষে যথেষ্ট জোরেই লাগারে বলল।
ওয়েরদারের উল্টো দিকে বসেছিল আর একটি ছোটখাট মানুষ-দখতুরভ, ভোলা মানচিত্রের উপর ঝুঁকে পড়ে সে যুদ্ধের পরিকল্পনা ও অপরিচিত জায়গাটাতে বোঝাবার চেষ্টা করছিল। যে কথাগুলি সে ভালোভাবে শুনতে পাচ্ছে না সেগুলির এবং গ্রামের খটমট নামগুলির পুনরাবৃত্তি করতে সে ওয়েরদারকে কয়েকবার অনুরোধ করল। ওয়েরদার অনুরোধ রাখল, আর দখতুরভ সেগুলি লিখে নিল।
এইভাবে একসময় ওয়েরদারের একঘেয়ে কণ্ঠস্বর যখন থামল তখন কুতুজভ চোখ মেলল, যাঁতার ঘুম পাড়ানি গুনগুনানি থামলে যেমন যাতাওয়ালার ঘুম ভেঙে যায় ঠিক সেইরকম। ততক্ষণে ল্যাপারো তার হাতের সন্যদানি ঘোরানো থামিয়ে ওয়েরদারের যুদ্ধ-পরিকল্পনা সম্পর্কে কি যেন বলতে শুরু করেছে। তা শুনে কুতুজভ বলে উঠল, আপনি তাহলে এখনো ওই বাজে ব্যাপারে নিয়েই আছেন! বলেই সে আবার চোখ বুজল, তার মাথাটা আরো ঢলে পড়ল।
ওয়েরদারের যুদ্ধ-পরিকল্পনাকে সাধ্যমতো তীব্রভাবে আক্রমণ করে লাগারো যুক্তি দেখাল : আক্রান্ত হবার পরিবর্তে বোনাপার্ত তো অনায়াসে নিজেই আক্রমণ করতে পারে, আর সেক্ষেত্রে পুরো পরিকল্পনাটাই তো অকেজো হয়ে যাবে। ওয়েরদারও দৃঢ়তা ও তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই সব আপত্তি খণ্ডন করতে লাগল, যেন আগে থেকেই এসব যুক্তির জন্য সে তৈরি হয়েই এসেছে।
বলল, সে যদি আমাদের আক্রমণ করতে পারত তাহলে তো আজই করত।
তাহলে আপনি মনে করেন সে শক্তিহীন? লাগারো বলল।
কোনো বৃদ্ধা স্ত্রী যখন ডাক্তারকে বলে চিকিৎসার ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিতে তখন তার মুখে যে হাসি দেখা দেয় সেইরকম হাসি হেসে ওয়েরদার বলল, তার তো আছে বড় জোর চল্লিশ হাজার সৈন্য।
সেক্ষেত্রে আমাদের আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করে থেকে সে তো নিজের সর্বনাশই ডেকে আনছে, সূক্ষ্ম ব্যঙ্গের হাসি হেসে কথাটা বলে সে সমর্থনের আশায় মিলোরাদভিচের দিকে তাকাল।
মিলোরাদভিচ হয়তো অন্য কিছু ভাবছিল, সে শুধু বলল, ধৰ্মত বলছি, কাল যুদ্ধক্ষেত্রেই তো আমরা সবকিছু দেখতে পাব।
ওয়েরদার পুনরায় তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, শত্রু সব আগুন নিভিয়ে দিয়েছে, তার শিবির থেকে একটা একটানা শব্দ শোনা যাচ্ছে। এর অর্থ কি? হয় সে পশ্চাদপসরণ করছে–একমাত্র সেটাকেই আমাদের বয়–আর না হয়তো সে স্থান পরিবর্তন করছে। (তার মুখে ব্যঙ্গের হাসি।) সে যদি তুয়েরাসাতেও ঘাঁটি বানায়, তাহলে তো আমাদেরই অনেক ঝামেলা মিটে যাবে, আর আমাদের ব্যবস্থা সব যেমন আছে তেমনি থাকবে।
প্রিন্স আন্দ্রু অনেকক্ষণ থেকেই সন্দেহ প্রকাশের একটা সুযোগর জন্য অপেক্ষা করেছিল, এবার সে বলল, সেটা কি রকম?
এবার কুতুজভ জেগে উঠল, জোরে জোরে কাশতে কাশতে সেনাপতিদের দিকে তাকাল।
বলল, ভদ্রজনরা, আগামীকালের-বরং বলা যায় আজকের, কারণ মধ্যরাত্রি পার হয়ে গেছে-ব্যবস্থা তো আর এখন পাল্টানো যাবে না। সবই তো আপনারা শুনলেন, আর আমরাও আমাদের কর্তব্য করব। কিন্তু একটা যুদ্ধের আগে সবচাইতে বেশি জরুরি… সে একটু থামল, একটি ভালো ঘুম।
সে উঠবার জন্য গা ঝাড়া দিল। সেনাপতিরা অভিবাদন জানিয়ে চলে গেল। মধ্যরাত পার হয়ে গেছে। প্রিন্স আন্দ্রু বেরিয়ে গেল।
সমর-পরিষদে প্রিন্স আন্দ্রু তার বক্তব্যকে যথাযথভাবে প্রাশ করতে পারেনি, কিন্তু সেখানকার একটা অস্পষ্ট ও অস্বস্তিকর প্রভাব পড়েছিল তার মনের উপর। কাদের কথা ঠিক-দলগরুকভ ও ওয়েরদারের, নাকি যুদ্ধবিরোধী কুতুজভ ও ল্যাগারের-তা সে জানে না। কিন্তু নিজের মতামত পরিষ্কারভাবে সম্রাটকে জানানো কি কুতুজভের পক্ষে সত্যি সম্ভব ছিল না? এও কি সম্ভব যে রাজ-দরবারের জন্য, ব্যক্তিগত বিচার-বিবেচনার জন্য হাজার হাজার মানুষের জীবনকে আমার জীবন, আমার জীবনকে বিপন্ন করতে হবে?
সে ভাবতে লাগল, হ্যাঁ, এটা তো খুবই সম্ভব যে আগামীকালই আমার মৃত্যু ঘটবে। মৃত্যুর এই কথা মনে হতেই পরপর অনেক স্মৃতি, বহুদূরের ও অত্যন্ত ব্যক্তিগত অনেক স্মৃতি তার কল্পনায় ভিড় করল : তার মনে পড়ল বাবা ও স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায়ের দৃশ্য, মনে পড়ল স্ত্রীকে ভালোবাসার প্রথম দিনগুলির কথা। স্ত্রীর গর্ভবতী হবার কথা মনে হতেই স্ত্রীর জন্য ও নিজের জন্য তার দুঃখ হল, আবেগাপ্লুত মনে সে ঘর থেকে বেরিয়ে সামনেই পায়চারি করতে লাগল।
কুয়াশা পড়েছে, আর সেই কুয়াশার ভিতর দিয়ে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে রহস্যজনকভাবে। সে ভাবতে লাগল, হ্যাঁ, আগামীকাল, আগামীকাল! কালই আমার সবকিছু শেষ হয়ে যেতে পারে! এইসব স্মৃতি মিলিয়ে যাবে, আমার কাছে তাদের কোনো অর্থই থাকবে না। আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে, এই প্রথম আমার যা-কিছু দেখাবার আছে তা কালই দেখাতে হবে। সে যেন কল্পনায় দেখতে পেল-এই যুদ্ধ, তার ক্ষয়ক্ষতি, যুদ্ধটাকে একটিমাত্র স্থানে কেন্দ্রায়িত করা, আর অধিনায়কদের ইতস্তত মনোভাব। তারপর এল সেই সুখের মুহূর্ত, এল তুলো যার জন্য সে এতকাল অপেক্ষা করেছিল। দৃঢ়তার সঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় নিজের অভিমত সে জানাল কুতুজভকে, ওয়েরদারকে, সম্রাটকে। তার মতের সত্যতায় সকলেই অভিভূত হল, কিন্তু কেউ সেটাকে রূপায়িত করতে এগিয়ে এল না, তাই একটা রেজিমেন্টকে, এক ডিভিশন সেনাদলকে সে একটা চূড়ান্ত স্থানে পরিচালিত করে একাই জয়লাভ করল। অপর একটি কণ্ঠস্বর বলে উঠল, কিন্তু মৃত্যু ও যন্ত্রণা? সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু জয়ের স্বপ্নেই বিভোর হয়ে রইল। পরবর্তী যুদ্ধের পরিকল্পনা সে একাই রচনা করল। সে নামেই কুতুজভের অ্যাডজুটান্ট, আসলে সে একাই সবকিছু করে। পরের যুদ্ধটাও সে একাই জিতল। কুতুজভকে সরিয়ে সেখানে তাকে বসানো হল। অপর কণ্ঠস্বর বলল, আচ্ছা, তারপর? যদি তার আগেই তুমি দশবার আহত বা নিহত না হও, বা তোমার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা না করা হয়, বেশ তো…তারপর?… প্রিন্স আন্দ্রু নিজেই জবাব দিল, তারপর, তারপর কী হবে আমি জানি না, জানতে চাই না, চাইতে পারি না, কিন্তু আমি যদি এটাই চাই–গৌরব চাই, লোকের কাছে পরিচিত হতে চাই, তাদের ভালোবাসা পেতে চাই, তাহলে সেটা তো আমার অপরাধ নয়, শুধু সেইজন্যই তো আমি বেঁচে আছি। হ্যাঁ, শুধু সেইজন্য! সে-কথা কাউকে কোনোদিন বলব না, কিন্তু হে ঈশ্বর! আমি যদি খ্যাতি ও মানুষের ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই না চাই তাহলে আমি কী করব? মৃত্যু, আঘাত, পরিবারের ক্ষতি-কোনো কিছুতেই আমি ভয় করি না। যারা আমার একান্ত আপন বাবা, বোন, স্ত্রী-তারা আমার কাছে যতই মূল্যবান ও প্রিয় হোক, তবু ভয়ঙ্কর ও অস্বাভাবিক মনে হলেও একটি মুহূর্তের গৌরবের জন্য, মানুষের উপর জয়লাভের জন্য, পরিচিত ও অপরিচিত মানুষদের ভালোবাসা উঠোনে কিছু লোকের কথাবার্তা তার কানে এল, জিনিসপত্র বাঁধাছদা করতে করতে আর্দালিরা কথা বলছে, সম্ভবত কোয়ানটি কুতুজভের বুড়ো রাধুনিটির পিছনে লেগেছে। প্রিন্স আন্দ্রু তাকে চেনে, নাম তিত। সে বলছে, তিত, আমি বলছি তিত!
