আজ রাতে কুতুজভের শিবিরে সমর-পরিষদের বৈঠক বসবে, এসব কথা আপনি সেখানেই বলতে পারবেন, দলগরুকভ বলল।
মানচিত্রের কাছ থেকে সরে গিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, তাই করব।
এতক্ষণ পর্যন্ত বিলিবিন মৃদু হাসির সঙ্গে দুইজনের আলোচনা শুনছিল, এবার ঠাট্টার সুরে বলে উঠল, মশাইরা কি নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছেন? আগামীকাল জয়ই হোক আর পরাজয়ই হোক, রুশ বাহিনীর গৌরব কিন্তু নিরাপদ। একমাত্র আপনাদের কুতুজভ ছাড়া সেনাপতিপদে একজনও রুশ ভদ্রলোক নেই! সেনাপতিরা হলেন : হের জেনারেল উইমফেন লে কোঁৎ দ্য ল্যাগারো, লে প্রিন্স দ্য লিচতাতে, লে প্রিন্স দ্য হোয়েলোহে, আর সবশেসে প্রিশশি এবং আরো সব পোলিশ নামধারী কর্তারা।
দলগরুকভ বলল, তুমি চুপ কর হে নিন্দুক! তোমার কথা সত্যি নয়, এখন আছেন দুজন রুশ, মিলোরাদভিচ ও দখতুরভ, আরো একজন আসছেন কাউন্ট আরাকচিভ, অবশ্য যদি তার স্নায়ুর শক্তিতে কুলোয়।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, যাই হোক, আমার মনে হয় জেনারেল কুতুজভ বেরিয়ে এসেছেন। মশাইরা, আমি আপনাদের সৌভাগ্য ও সাফল্য কামনা করি। দলগরুকভ ও বিলিবিনের সঙ্গে করমর্দন করে সে বেরিয়ে গেল।
ফিরবার পথে কুতুজভ চুপচাপ প্রিন্স আন্দ্রুর পাশেই বসেছিল, কালকের যুদ্ধ সম্পর্কে সে কি ভাবছে এ প্রশ্নটা প্রিন্স আলু তাকে না করে পারল না।
কুতুজভ কঠোর দৃষ্টিতে তার অ্যাডজুটান্টের দিকে তাকাল, তারপর একটু থেমে বলল, আমি মনে করি যুদ্ধে আমাদের হার হবে, কাউন্ট তলস্তয়কেও আমি সেই কথা বলেছি, আর তাকে অনুরোধ করেছি কথাটা সম্রাটকে বলতে। কিন্তু তিনি কি জবাব দিলেন ভাবতে পার? প্রিয় সেনাপতি, ভাত ও কাটলেট নিয়ে আমি বড় ব্যস্ত, যুদ্ধের ব্যাপারটা আপনিই দেখুন! হ্যাঁ…সেই জবাবই আমি পেয়েছি!
*
অধ্যায়-১২
রাত নটার একটু পরেই ওয়েরদার তার পরকিল্পনাটা নিয়ে কুতুজভের শিবিরে গেল, সেখানেই সমর পরিষদের বৈঠক বসবে। সব দলীয় অধিনায়কদেরই প্রধান সেনাপতির কাছে ডাকা হয়েছিল, একমাত্র ব্যাগ্রেশন ছাড়া আর সকলেই নির্ধারিত সময়ে এসে হাজির হল। প্রস্তাবিত যুদ্ধের উপর এখন ওয়েরদারের পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব, সে যেনম উৎসুক, তেমনই চটপটে, আর সমর-পরিষদের সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও অসন্তুষ্ট ও তন্দ্রালু কুতুজভ তার একেবারে বিপরীত। ওয়েরদার বুঝতে পেরেছে, এ যুদ্ধের গতি এখন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সে যেন একটা ভারি গাড়ির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া ঘোড়ার মতো সবেগে পাহাড় থেকে নিচে নামছে। সে গাড়িটাকে টানছে, না গাড়িটাই তাকে ঠেলে দিচ্ছে তা সে জানে না, কিন্তু সে সবেগে ছুটে নামছে–এ গতি তাকে কোথায় নিয়ে যাবে সেকথা ভাববার সময়ও তার নেই। সে রাতে সে দুইবার শত্রুপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে, দুইবার রুশ ও অস্ট্রিয় দুই সম্রাটের সঙ্গে দেখা করে তার প্রতিবেদন রেখেছে, আর দুইবার গেছে প্রধান ঘাঁটিতে সব বিলি-ব্যবস্থা করতে, তাই এখন ক্লান্ত কুতুজভের বৈঠকে এসেছে।
কুতুজভ অস্তারলিজের কাছাকাছি কোনো সম্ভান্ত লোকের একটি ছোটখাট দুর্গ দখল করে বাস করছে। যে বড় বসবার ঘরটা এখন প্রধান সেনাপতির অফিস হয়েছে সেখানে হাজির হয়েছে স্বয়ং কুতুজভ, ওয়েরদার এবং সমর-পরিষদের সদস্যগণ। চা খেতে খেতে তারা প্রিন্স ব্যাগ্রেশনের আসার জন্য অপেক্ষা করছে। অবশেষে ব্যাগ্রেশনের আর্দালি এসে খবর দিল প্রিন্স বৈঠকে আসতে পারবে না। প্রিন্স আন্দ্রু ঘরে ঢুকে খবরটা প্রধান সেনাপতিকে দিল এবং কুতুজভের পূর্ব অনুমত্ৰিকমে বৈঠকে যোগ দিতে থকে গেল।
তাড়াতাড়ি আসন থেকে উঠে টেবিলের উপর মেলে রাখা ব্রুনের একটা ভৌগোলিক মানচিত্রের কাছে গিয়ে ওয়েরদার বলল, প্রিন্স ব্যাগ্রেশন যখন আসছে না তখন আমরা শুরু করে দিতে পারি।
কুতুজভ ঘুমন্ত অবস্থায় একটা নিচু চেয়ারে বসে ছিল, তার ইউনিফর্মের বোম খোলা থাকায় মোটা গলাটা কলারের উপর দিয়ে ঠেলে বেরিয়ে পড়েছে। ওয়েরদারের কথায় অনেক চেষ্টা করে একটা চোখ খুলে সে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনার যেমন ইচ্ছা! ইতিমধ্যেই দেরি হয়ে গেছে। বলেই সে আবার মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল।
সমর-পরিষদের সদস্যরা প্রথমে ভেবেছিল কুতুজভ ঘুমের ভান করে পড়ে আছে, কিন্তু প্রস্তাব পড়বার সময় তার নাক দিয়ে যে ধ্বনি নির্গত হতে লাগল তাতে বোঝা গেল যে সেই মুহূর্তে প্রধান সেনাপতি নিদ্রার দুর্বার মানবিক প্রয়োজন মেটাবার কাজেই একান্তভাবে ব্যস্ত আছে। যাতে একমুহূর্ত সময়ও নষ্ট না হয় এমনি ভঙ্গি করে ওয়েরদার কুতুজভের দিকে তাকাল, এবং সে যে ঘুমিয়ে পড়েছে সেবিষয়ে নিশ্চিত হয়ে একটা কাগজ তুলে নিয়ে একঘেয়ে গলায় উচ্চগ্রামে আসন্ন যুদ্ধের বিলি-বন্দোবস্তের কথা পড়তে শুরু করল : ১৮০৫ সালের ৩০ নভেম্বর তারিখে কোবেলনিজ ও সোকোলনিজের পশ্চাদ্বর্তী শত্রুপক্ষের ঘাঁটির উপর আক্রমণের পরিকল্পনা।
পরিকল্পনাটি যেমন জটিল তেমনই শক্ত। মনে হল সেনাপতিরা একান্ত অনিচ্ছায়ই মনোযোগ দিয়ে সেটা শুনছে। দীর্ঘদেহ জেনারেল বাক্সহোদেন দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে একটা জ্বলন্ত মোমবাতির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, মনে হচ্ছে সে কিছুই শুনছে না, নবার ইচ্ছাও নেই। ওয়েরদারের ঠিক উল্টো দিকে চকচকে চোখ মেলে তাকিয়ে আর গোঁফজোড়াকে উপরের দিকে বেঁকিয়ে সামরিক ভঙ্গিতে ঘাড় উঁচু করে বসে আছে লাসচে মিলোরাদভিচ। সারাক্ষণ সে ওয়েরদারের দিকে চোখ রেখে চুপচাপ বসে রইল। ওয়েরদারের ঠিক পাশেই বসেছিল কাউন্ট লাগারে, তার খাঁটি দক্ষিণ ফরাসি মুখে একটা সূক্ষ্ম হাসি লেগেই আছে, সারাক্ষণ সে ছবিওয়ালা একটা নস্যদানিকে আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে সেইদিকেই তাকিয়ে রইল। একটা দীর্ঘ বাক্যের মাঝখানে নস্যদানি ঘোরানো থামিয়ে মাথাটা তুলে ওয়েরদারকে বাধা দিয়ে কিছু বলতে চাইল। অস্ট্রিয় সেনাপতি কিন্তু পড়েই চলল, রেগে দ্রুকুটি করল, কনুই দুটোতে ঝাঁকুনি দিল, যেন বলতে চাইল : তোমার মতামত আমাকে পরে বল, এখন ভালো ছেলের মতো মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে আমার কথায় কান দাও।
