তার কথায় কান না দিয়ে পিয়ের বক্তৃতা করেই চলল। অধিকতর আগ্রহের সঙ্গে চেঁচিয়ে বলল, না। নেপোলিয়ন মহান, কারণ সে বিপ্লবের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছিল, তার দোষ-ত্রুটিগুলোকে বা দিতে পেরেছিল, বিপ্লবের যা কিছু ভালো-সকল নাগরিকের সাম্য, বাক্যের ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা-সে সব রক্ষা করেছিল, আর শুধু সেই কারণেই ক্ষমতা তার হাতে এসেছিল।
হ্যাঁ, ক্ষমতা হাতে পেয়ে সেই সুযোগে হত্যা না করে সে যদি সেই ক্ষমতাকে প্রকৃত রাজার হাতে তুলে দিত, তাহলে তাকে আমি মহাপুরুষ বলতাম, ভাইকোঁত মন্তব্য করল।
তা সে করতে পারে না। সে যাতে জনসাধারণকে বুরবনদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে সেই জন্যই তারা তার হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল, কারণ তারা বুঝেছিল যে সে একজন মহান পুরুষ। বিপ্লব একটি মহান বস্তু!
কী? বিপ্লব আর রাজহত্যা মহৎ বস্তু?…আচ্ছা, তারপর…কিন্তু আপনি অন্য টেবিলে আসুন না? আন্না পাভলভনা আর একবার কথাটা বলল।
উপেক্ষার হাসি হেসে ভাইকোঁত বলল, রুশোর Contract Social.
রাজহত্যার কথা আমি বলছি না, বলছি ধারণার কথা।
হ্যা; ডাকাত, খুন, রাজহত্যার ধারণা, একটি ব্যঙ্গকঠিন কণ্ঠে কথাগুলি উচ্চারিত হল।
নিঃসন্দেহে সেগুলি চরম ব্যবস্থা, কিন্তু আসল কথা তো তা নয়। আসল কথা হল, মানুষের অধিকার, সংস্কার হতে মুক্তি, নাগরিক সাম্য, আর এসব ধারণাকেই নেপোলিয়ন পূর্ণ শক্তিতে রক্ষা করেছে।
ভাইকোঁত শেষপর্যন্ত স্থির করল, এই যুবকের কথাগুলি যে কত অর্থহীন সেটা তাকে ভালো করে বুঝিয়ে দেবে; তাই একান্ত উপেক্ষার সঙ্গে সে বলল, স্বাধীনতা ও সাম্য-এসব বড় বড় কথা অনেকদিন বাতিল হয়ে গেছে। স্বাধীনতা ও সাম্য কে না ভালোবাসে? আমাদের ত্রাণকর্তা পর্যন্ত স্বাধীনতা ও সাম্য প্রচার করে গেছেন। বিপ্লবের পরে মানুষ কি বেশি সুখী হয়েছে? ঠিক উল্টো আমরা চেয়েছিলাম স্বাধীনতা, কিন্তু বোনাপার্ত তাকে ধ্বংস করেছে।
প্রিন্স আন্দ্রু স্মিত হাসির সঙ্গে পিয়ের থেকে ভাইকেতের দিকে এবং ভাইকোঁত থেকে গৃহকত্রীর দিকে তাকাতে লাগল। পিয়েরের উচ্ছ্বসিত কথাবার্তা শুনে প্রথমটা আন্না পাভলভনা ভয়ে আঁতকে উঠেছিল। কিন্তু যখন দেখল যে পিয়েরের অশালীন কথাবার্তা শুনে ভাইকোঁত মোটেই উত্তেজিত হয় নি এবং নিজেও ভালো করে বুঝতে পারল যে এ যুবকটিকে থামানো অসম্ভব, তখন সে সর্বশক্তি নিয়ে ভাইকেতের সঙ্গে যোগ দিয়ে। একসঙ্গে বক্তাটিকে কঠোরভাবে আক্রমণ করল।
বলল, কিন্তু প্রিয় সিয় পিয়ের, একজন মহাপুরুষ যে বিনা বিচারে একজন নিরপরাধ ডিউককে–কিংবা একজন সাধারণ মানুষকে হত্যা করল, তার কি ব্যাখ্যা আপনি দেবেন?
ভাইকোঁত বলল, আমি কিন্তু জানতে চাই, ১৮তম মেয়ারের কি ব্যাখ্যা মঁসিয় দেবেন : সেটা কি প্রবঞ্চনা নয়? সে তো একটা জোচ্চুরি; মোটেই একজন মহাপুরুষের মতো আচরণ নয়!
আর আফ্রিকায় যে বন্দিদের সে খুন করেছে? সে তো ভয়াবহ! দুই কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে ছোট প্রিন্সেস বলল। আপনি যাই বলুন, সে অতি হীন লোক, প্রিন্স হিপোলিৎ মন্তব্য করল।
কার কথার জবাব দেবে বুঝতে না পেরে পিয়ের সকলের দিকে তাকিয়েই হাসল। তার সে হাসি অন্য লোকের মতো আধখানা হাসি নয়। সে হাসলেই তার গম্ভীর মুখে সঙ্গে সঙ্গে ফুটে ওঠে এমন একটি শিশুর মতো বরং বলা যায় বোকা-বোকা-ভাব যে মনে হয় সে যেন ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে।
যুবকটির সঙ্গে ভাইকেতের এই প্রথম সাক্ষাৎ; সেও স্পষ্ট বুঝতে পারে যে এই তরুণ জ্যাকোবিনটি মুখে যত বড় বড় কথা বলে আসলে ততটা ভয়ের নয়। সকলেই চুপচাপ হয়ে গেল।
প্রিন্স আলু বলল, উনি একসঙ্গে আপনাদের সকলের কথার জবাব দেবেন, এটা আপনারা আশা করছেন। কেমন করে? তাছাড়া, একজন কূটনীতিকের কাজকর্ম প্রসঙ্গে ব্যক্তি হিসেবে, সেনাপতি ও সম্রাট হিসেবে তার কাজের বিচার তো আলাদা আলাদা ভাবেই করতে হবে। আমার তো তাই মনে হয়।
নতুন করে একজনের সমর্থন পেয়ে খুশি হয়ে পিয়ের বলে উঠল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই।
প্রিন্স আন্দ্রু বলতে লাগল, এ কথা তো স্বীকার করতেই হবে যে আর্কোলার সেতুর উপরে এবং জাফার হাসপাতালে সে যখন প্লেগ-রোগীদের সেবায় হাত দিয়েছিল, তখন মানুষ হিসেবে নেপোলিয়ন অবশ্যই মহান; কিন্তু…আবার এমন সব কাজ আছে যাকে সমর্থন করা শক্ত।
পিয়েরের অপটু মন্তব্যের ধারটাকে একটু নরম করে দেওয়াই ছিল প্রিন্স আন্দ্রুর আসল উদ্দেশ্য। উঠে দাঁড়িয়ে সে স্ত্রীকে ইঙ্গিতে জানাল, যাবার সময় হয়ে গেছে।
হঠাৎ প্রিন্স হিপোলিৎ ইঙ্গিতে সকলের মনোযোগ আহ্বান করে সকলকে বসতে বলল; তারপর বলতে শুরু করল :
আজই একটি চমৎকার মস্কোর গল্প আমি শুনেছি, আর সেটা আপনাদের শোনাতে চাই। ক্ষমা করবেন ভাইকোঁত, গল্পটা আমি রুশ ভাষায় বলব, অন্যথায় তার মজাই নষ্ট হয়ে যাবে….। কোনো ফরাসি ভদ্রলোক বছরখানেক রাশিয়াতে বাস করবার পরে যে রকম রুশ ভাষা বলে ঠিক তেমনি ভাষায় প্রিন্স হিপোলিৎ গল্প বলতে শুরু করল। এমন আগ্রহে আর এত বেশি জোরের সঙ্গে সে সকলকে গল্পটা শুনতে বলল যে সকলেই গল্প শুনতে বসে রইল।
মস্কোতে এই মহিলা বাস করেন; তিনি খুব কৃপণ। তাঁর গাড়ির পিছনে দুজন সহিস থাকা চাই, বেশ বড় গোছের। সেটাই তার পছন্দ। তাঁর একটি পরিচারিকা ছিল, সেও বড়সড়। মহিলাটি বলল…
