১৯ দুপুর পর্যন্ত সবরকম কর্মব্যস্ততা সীমাবদ্ধ ছিল সম্রাটের প্রধান ঘাঁটিতে। কিন্তু সেইদিন বিকেল থেকেই তা ছড়িয়ে পড়ল কুতুজভের প্রধান ঘাঁটিতে ও সেনাদলের অধিনায়কদের মধ্যে। সন্ধ্যা নাগাদ সব অ্যাডজুটান্টরা ছড়িয়ে পড়ল সেনাবাহিনীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এবং ১৯ থেকে ২০ রাত্রিতে মিত্রবাহিনীর আশি হাজার সৈন্য রাতের ঘুম থেকে জেগে উঠল কলগুঞ্জনের মধ্যে, ছমাইল দীর্ঘ একটা সুসংহত বাহিনী এগিয়ে চলল স্রোতধারার মতো।
সকালে সম্রাটের প্রধান ঘাঁটিতে যে সুসংহত কর্মধারার সূচনা হয়েছিল এবং গোটা অভিযানের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল তাকে তুলনা করা চলে একটা প্রকাণ্ড দুর্গ-ঘড়ির প্রধান চাকার গতির সঙ্গে। একটা চাকা ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল, তার থেকে চলতে লাগল আর একটা চাকা, তারপর তৃতীয় চাকা, গতি হতে লাগল দ্রুত থেকে দ্রুততর, দণ্ডযন্ত্র ও দাঁতওয়ালা চাকাগুলো চলতে শুরু করল, ঘণ্টা বাজতে লাগল, সংখ্যাগুলো দেখা দিল, আর এই সব কিছুর ফলে কাঁটা দুটো নিয়মিত গতিতে এগিয়ে চলল।
একটা ঘড়ির কলকজা বেলায় যেমন, একটা সামরিক যন্ত্রের কলকজার বেলায়ও তেমনই একবার কাজ শুরু হলেও চূড়ান্ত ফল পর্যন্ত সেটা এগিয়ে চলে। একটা ঘড়ির বেলায় যেমন অসংখ্য চাকা ও কপিকলের জটিল নড়াচড়ার ফলে কাঁটাগুলি ধীর ও নিয়মিত গতিতে চলে সময় নির্দেশ করে, ঠিক তেমনই ১৬০,০০০ রুশ ও ফরাসি বাহিনীর জটিল কর্মধারা-তাদের আবেগ, বাসনা, অনুশোচনা, লাঞ্ছনা, যন্ত্রণা এবং অহংকার, আতঙ্ক ও উৎসাহ–সবকিছুর একটিমাত্র ফল হল অস্তারলিজের যুদ্ধের অর্থাৎ তথাকথিত তিন সম্রাটের যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষিত-অর্থাৎ মানব-ইতিহাসের ডায়ালের উপর একটি কাটার ধীরগতিতে সঞ্চরণ।
সন্ধ্যা ছটায় কুতুজভ গেল ম্রাটের প্রধান ঘাঁটিতে, অতি অল্প সময় জারের সঙ্গে কাটিয়ে সে গেলে রাজসভার গ্র্যান্ড মার্শাল কাউন্ট তলস্তয়ের সঙ্গে দেখা করতে।
এই সুযোগে বলকনস্কি গেল দলগরুকভের সঙ্গে দেখা করে আসন্ন যুদ্ধের কিছু বিবরণ সংগ্রহ করতে। সে বুঝতে পেরেছে, কোনো ব্যাপারে কুতুজভ বিচলিত ও অসন্তুষ্ট হয়েছে এবং প্রধান ঘাঁটিতে সকলেই তার উপর অসন্তুষ্ট হয়েছে।
দলগরুকভ বিলিবিনের সঙ্গে বসে চা খাচ্ছিল। বলল, আরে, আপনার খবর কি? এ চায়ের ব্যবস্থাটা আগামীকালের উদ্দেশে। আপনাদের বুড়ো মানুষটির খবর কি? মেজাজ খারাপ?
মেজাজ খারাপ বলব না, কিন্তু আমার মনে হয় তার কথা শোনা উচিত ছিল বলেই তার ধারণা।
কিন্তু সমর-পরিষদে তো সকলে তার কথা শুনেছিল, আর তিনি যখন যুক্তিপূর্ণ কথা বলবেন তখন আবার তার কথা শোনা হবে, কিন্তু এই মুহূর্তে যখন নেপোলিয়ন একটা সার্বিক যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো কিছুকেই ভয় করে না তকন কালহরণ করা ও একটা কিছুর জন্য অপেক্ষা করে থাকা একেবারেই অসম্ভব।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, আচ্ছা, আপনি তাকে দেখেছেন? বোনাপার্ত দেখতে কেমন? তাকে দেখে আপনার কি মনে হয়েছে?
দলগরুকভ উত্তরে আর একবার বলল, হ্যাঁ, আমি তাকে দেখেছি, আমার দৃঢ় ধারণা একটা সার্বিক যুদ্ধকে সে যত ভয় করছে তেমন আর কোনো কিছুকেই নয়। সে যদি যুদ্ধকে ভয়ই না করবে তাহলে সেই সাক্ষাৎকারের প্রার্থনা জানিয়েছিল কেন? আলোচনাই বা কেন? আর তার চাইতেও বড় কথা, পশ্চাদপসরণ যখন তার যুদ্ধ পরিচালনা রীতির সম্পূর্ণ বিপরীত তখন সে পশ্চাদপসরণই বা করল কেন? আমাকে বিশ্বাস করুন, সে ভয় পেয়েছে, একটা বড় মাপের যুদ্ধকে সে ভয় পেয়েছে। তার দিন ফুরিয়েছে। আমার কথা শুনে রাখুন।
প্রিন্স আন্দ্রু আবার বলল, কিন্তু আমাকে বলুন লোকটি দেখতে কেমন?
পরনে ধূসর ওভারকোট, আমার মুখে ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি ডাক শুনতে খুবই উদগ্রীব, কিন্তু তার বড়ই দুঃখ যে আমার কাছ থেকে সে-খেতাবটি পায়নি! এই ধরনের লোক আর কি, এর বেশি কিছু নয়। বিলবিনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে দলগরুকভ বলল।
সে বলতেই লাগল, বৃদ্ধ কুতুজভের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা সত্ত্বেও আমি বলব, বোনাপার্তকে মুঠোর মধ্যে পেয়েও আমরা যদি অকারণে কালক্ষেপ করে তাকে পালাবার সুযোগ করে দেই অথবা আমাদের ফাঁকি দেবার সুযোগ দেই, তাহলে আমাদের জবাব হয় না। না, সুভরভ ও তার রাজনীতিকে আমরা ভুলতে পারি না–শত্রুর আক্রমণের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই আক্রমণ কর। আমাকে বিশ্বাস করুন, যুদ্ধের ব্যাপারে বুড়ো ক্যাংটেটরদের (অকারণ কালক্ষেপকারী) অভিজ্ঞতা অপেক্ষা যুবকদের কর্মোৎসাহই শ্রেয়তর পথপ্রদর্শক।
কিন্তু আমরা তাকে কোন পথে আক্রমণ করব? আজই আমি ঘাঁটিগুলি দেখে এসেছি, কিন্তু তার প্রধান সেনাদল যে কোথায় আছে সেটা বলা একেবারেই অসম্ভব, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
সে নিজে আক্রমণের যে পরিকল্পনাটা করেছে সেটাই দলগরুকভকে বোঝাতে চাইল।
ওঃ, সে তো একই ব্যাপার, তাড়াতাড়ি এই কথা বলে দলগরুকভ টেবিলের উপর একটা মানচিত্র বিছিয়ে দিল। যা কিছু ঘটা সম্ভব সবই খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে। সে যদি ব্রুনের সামনে থাকে…
খুব দ্রুতলয়ে কিছুটা অস্পষ্টভাবে দলগরুকভ ওয়েরদারের আক্রমণের ছকটা বুঝিয়ে বলল।
জবাব দিতে গিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু নিজের ছকটা পেশ করে ওয়েরদারের ছকের দোষত্রুটি ও নিজের ছকের গুণের কথা বলতেই প্রিন্স দলগরুকভের মনোযোগ কেটে গেল, টেবিলের মানচিত্রের দিক না তাকিয়ে অন্যমনস্কভাবে তাকাল প্রিন্স আন্দ্রুর মুখের দিকে।
