আস্তে, আস্তে, আর একটু আস্তে তুলে ধরতে পার না? এমনভাবে সম্রাট কথাটা বলল যে মুমূর্ষ সৈনিকটির চাইতে তারই বেশি কষ্ট হচ্ছে। তারপরই সম্রাট ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
রস্তভ দেখল, সম্রাটের চোখ জলে ভরে উঠেছে। যেতে যেতেই সে জারতরিস্কিকে বলছে : এই যুদ্ধ কী ভয়ংকর : কত ভয়ংকর!
অগ্রবর্তী সৈনিকদের প্রতি ম্রাটের কৃতজ্ঞতা ঘোষণা করা হল, নানারকম পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল, সৈনিকদের দেওয়া হল ভদকার দ্বিগুণ রেশন। সশব্দে জ্বলল শিবির-আগুন, সৈনিকদের গান ধ্বনিত হল আগের রাতের চাইতে অধিকতর আনন্দের সুরে। মেজর পদে উন্নত হওয়ায় দেনিসভ একটা অনুষ্ঠান করল, আর সেখানেই প্রচুর মদ খেয়ে রস্তভ ম্রাটের স্বাস্থ্য কামনা করতে উঠে বলল, আমি বলব না আমাদের সার্বভৌম সম্রাট যা বলা হয়ে থাকে সরকারি ভোজসভায়, আমি স্বাস্থ্য পান করব আমাদের সার্বভৌম, সৎ, মোহময়, মহান পুরুষের! আসুন আমরা পান করি তার স্বাস্থ্য এবং ফরাসিদের নিশ্চিত পরাজয় কামনা করি!
সে আরো বলল, যদি ফরাসিদের অগ্রসর হতে না দিয়ে শোন গ্রেবার্নের মতো আমরা আগেই তাদের সঙ্গে যুদ্ধে নামতাম তাহলে এখন তিনি যখন রণক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে হাজির হয়েছেন তখন আমরা কী না করতাম? তাঁর জন্য আমরা খুশি হয়ে মৃত্যু বরণ করতাম। তাই নয় কি ভদ্রজনরা? হয়তো আমি কথাটা ঠিক মতো বলতে পারছি না, বড় বেশি মদ গিলেছি–কিন্তু এটাই আমার মনের কথা, আর আপনাদেরও! প্রথম আলেক্সান্দারের স্বাস্থ্য কামনায়! হুররা!
অফিসাররাও সোৎসাহে চিৎকার করে উঠল, হুররা!
বাইশ বছর বয়সের রস্তভের মতোই সমান উৎসাহে ও আন্তরিকতায় চেঁচিয়ে উঠল অশ্বারোহী বাহিনীর বৃদ্ধ ক্যাপ্টেন কিসতেন।
অফিসাররা যখন নিজ নিজ গ্লাস খালি করে আছড়ে ভেঙে ফেলল, কিসতেন তখন অন্য গ্লাস ভর্তি করে নিয়ে শার্ট ও ব্রিচেস পরেই সৈনিকদের শিবির-আগুনের কাছে এগিয়ে গেল, এবং দীর্ঘ পাকা গোঁফ ও বুকখোলা শার্টের নিচে শাদা বুক ফুলিয়ে উদ্যত হাত দোলাতে দোলাতে মহনীয় ভঙ্গিতে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ওজে ছোকরারা! আমাদের সার্বভৌম সম্রাট ও শত্রুর উপর জয়লাভের উদ্দেশে এই গ্লাস! হুররা!
হুজাররা চারদিকে ভিড় করে উচ্চ চিল্কারে তাকে সমর্থন করল।
সেদিন অনেক রাতে সকলে চলে গেলে দেনিসভ তার প্রিয় রস্তভের ঘাড়ে আস্তে আস্তে চাপড় দিতে লাগল।
বলল, যেহেতু সমরাভিযানের সময় প্রেমে পড়বার মতো কাউকে পাওয়া যায় না, তাই সে জারের প্রেমেই পড়েছে।
রস্তভ চেঁচিয়ে বলল, দেনিসভ, এ নিয়ে ঠাট্টা করো না। এ অনুভূতি বড় মহৎ, বড় সুন্দর, এমন একটা…।
আমি তা বিশ্বাস করি বন্ধু, বিশ্বাস করি, আমিও তো এর অংশীদার, সমর্থক…
না, তুমি কিছু বোঝ না!
রস্তভ উঠে শিবির-আগুনের পাশ দিয়ে হাঁটতে লাগল, তার চোখের একই স্বপ্ন-সম্রাটের জীবন রক্ষার জন্য নয় (সেকথা সে ভাবতেও পারে না), শুধু তার চোখের সামনে মরতে পারলেই কত না সুখ সে পেত! সত্যি, জারের প্রতি, রুশ বাহিনীর গৌরবের প্রতি, ভবিষ্যৎ বিজয়ের আশার প্রতি সে প্রেমে পড়েছে। আর অস্তারলিজ যুদ্ধের আগেকার সেই স্মরণীয় দিনগুলিতে এ অভিজ্ঞতা শুধু তার একার হয় নি, রুশ বাহিনীর দশ ভাগের নয় ভাগ লোক তখন জারের এবং রুশ বাহিনীর গৌরবের প্রেমে পড়েছিল।
০৩.২ সম্রাট অসুস্থ
অধ্যায়-১১
পরদিন সম্রাট উইশাউতে থামল, তার ডাক্তার ভিলিয়েরকে বারবার ডাকা হল। প্রধান ঘাঁটিতে এবং আশপাশের সৈন্যদের মধ্যে খবর রটে গেল যে সম্রাট অসুস্থ। আশপাশের লোকরা জানাল, সম্রাট কিছু খায়নি, আর রাতে ভালো ঘুমও হয় নি। নিহত ও আহতদের দৃশ্য তার স্পর্শকাতর মনের উপর এত বেশি চাপ সৃষ্টি করেছে যে তার ফলেই সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
১৭ তারিখ ভোরবেলা সন্ধির পতাকা নিয়ে একজন ফরাসি অফিসার এল রুশ ম্রাটের সঙ্গে দেখা করতে। অফিসারটির নাম সাভারি। সম্রাট তখন সবে ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই সাভারিকে অপেক্ষা করতে হল। দুপুরে তাকে সম্রাটের কাছে নিয়ে যাওয়া হল, আর এক ঘণ্টা পরেই প্রিন্স দলগরুকভকে সঙ্গে নিয়ে সে ফরাসি বাহিনীর অগ্রবর্তী ঘাটির দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
গুজব রটে গেল, নেপোলিয়নের সঙ্গে আলেক্সান্দারের একটি সাক্ষাৎকারের প্রস্তাব করতেই সাভারিকে পাঠানো হয়েছিল। গোটা বাহিনীকে আনন্দিত ও গর্বিত করে সাক্ষাৎকারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হল, সকলের ধারণাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এই আলোচনার প্রস্তাব যদি সত্যসত্যই শান্তি প্রতিষ্ঠার বাসনা থেকেই উদ্ভূত হয়ে থাকে সেই আশায় স্থির করা হয়েছে, স্বয়ং সম্রাটের পরিবর্তে উইশাউ যুদ্ধের বিজয়ী নায়ক দলগরুকভকে পাঠানো হোক নেপোলিয়নের সঙ্গে আলোচনায় বসতে।
সন্ধ্যার দিকে দলগরুকভ ফিরে এল, সোজা গেল জারের কাছে, এবং দীর্ঘসময় তার সঙ্গে একলা কাটাল।
১৮ ও ১৯ নভেম্বর সেনাবাহিনী দুইদিনের পথ অতিক্রম করল, এবং ছোটখাট গুলি-বিনিময়ের পর শত্রুপক্ষ ঘাঁটি ছেড়ে পিছিয়ে গেল। ১৯ তারিখ দুপুর থেকে সেনাবাহিনীর উচ্চতম মহলে তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ কর্মব্যস্ততা শুরু হল এবং সেটা চলল ২০ তারিখ সকাল পর্যন্ত, তখনই শুরু হল অস্তারলিজের স্মরণীয় যুদ্ধ।
