*
অধ্যায়-১০
১৬ নভেম্বর ভোরে প্রিন্স ব্যাগ্রেশনের অধীনস্থ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত দেনিসভের অশ্বারোহী সেনাদল (এই সেনাদলে আছে নিকলাস রস্তভ) রাতটা কাটিয়ে পূর্বব্যবস্থামতো যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে চলল। প্রায় এক ভার্ল্ড পথ অন্য সেনাদলের পিছন পিছন চলবার পরে বড় রাস্তায় দেনিসভের সেনাদলকে থামিয়ে দেওয়া হল। রস্তভ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল, কাকরা, ও পরে প্রথম ও দ্বিতীয় হুজারবাহিনী, পদাতিক বাহিনী ও গোলন্দাজ বাহিনী একে একে তাদের ফেলে এগিয়ে গেল, তারপর সেনাপতি ব্যাগ্রেশন ও সেনাপতি দলগরুকভও তাদের অ্যাডজুটান্টদের সঙ্গে নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেল। যুদ্ধ শুরু হবার আগেকার আতংক, সে আতংককে জয় করবার মানসিক দ্বন্দ্ব, যুদ্ধে একজন প্রকৃত হুজার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন–সবই বৃথা হয়ে গেল। তাদের সেনাদলকে রিজার্ভ হিসেবে রাখা হল, আর রশুভকে পুরো দিনটা কাটাতে হল শোচনীয় একঘেয়েমির মধ্যে। সকাল নয়টায় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে এল, শোনা গেল হুররা ধ্বনি, কিছু কিছু আহত সৈন্যকে বয়ে আনা হল, এবং শেষপর্যন্ত কসাকদের পাহারায় একটা পুরো ফরাসি অশ্বারোহী সেনাদলকে নিয়ে আসা হল। বোঝা গেল, যুদ্ধ শেষ হয়েছে, এবং বড় মাপের যুদ্ধ না হলেও যুদ্ধে তাদেরই জয় হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসে সৈনিক ও অফিসাররা বলতে শুরু করল উজ্জ্বল সাফল্যের কথা, উইশাউ শহর দখলের কথা, এবং একটা পুরো ফরাসি অশ্বারোহী সেনাদলকে বন্দি করার কথা। রাতের তীব্র বরফপাতের পরে সারাদিনটা বেশ উজ্জ্বল ও রৌদ্রস্নাত, হেমন্তের দিন যেন খুশিতে ঝলমল, তারই সঙ্গে সুর মিলিয়ে জয়লাভের কাহিনী ফিরছে সকলের মুখে মুখে, রশুভের পাশ দিয়ে আসতে-যেতে সাধারণ সৈনিক থেকে আরম্ভ করে অফিসার, সেনাপতি ও অ্যাডজুটান্ট সকলেই বলছে যুদ্ধজয়ের কথা। আর সে যুদ্ধের আগেকার সব আতঙ্ক সহ্য করেও এই শুভদিনটিকে কাটিয়েছে নিষ্ককর্মার মতো, আর তার ফলে তার মন মেজাজ আরো খারাপ হয়ে উঠেছে।
একটা ফ্লাস্ক ও কিছু খাবার নিয়ে রাস্তার পাশে বসেছিল দেনিসভ। সে চেঁচিয়ে ডাকল, এদিকে এস হে রস্তভ। এস আমাদের সব দুঃখ গলায় ঢেলে দি!
অফিসাররা দেনিসভকে ঘিরে পান-ভোজনে মেতে উঠল।
দুটি কসাক জনৈক বন্দি ফরাসি অশ্বারোহীকে হটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তাকে দেখিয়ে একজন অফিসার বলে উঠল, ঐ দেখ! ওরা আর একজনকে ধরে আনছে!
বন্দির কাছ থেকে কেড়ে-নেওয়া একটা সুন্দর বড় ঘোড়ার লাগাম ছিল একজন কসাকের হাতে।
দেনিসভ কসাকদের বলল, ও ঘোড়াটা আমাদের কাছে বেচে দাও।
হুজুরদের পছন্দ হলে নিয়ে নিন!
কসাকরা দুটি স্বর্ণমুদ্রার বদলে ঘোড়াটা দিয়ে দিল আর সেটা কিনে নিল রস্তভ, কারণ এখন তার হাতে অনেক টাকা।
তার হাতে ঘোড়াটা তুলে দেওয়া হলে ফরাসি অশ্বারোহীটি বলল, আমার ঘোড়াটিকে কষ্ট দেবেন না যেন!
রস্তভ হেসে তাকে আশ্বাস দিয়ে দামটা দিয়ে দিল।
বন্দির হাত ধরে কসাকটি বলল, চল হে, চল।
হঠাৎ হুজারদের মধ্যে সোরগোল উঠল, সম্রাট! সম্রাট!
সকলেই হৈ-চৈ ছুটাছুটি শুরু করে দিল, রস্তভ দেখল, শাদা পালক গোঁজা টুপি মাথায় কয়েকজন অশ্বারোহী পিছন দিক থেকে এগিয়ে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে প্রত্যেকেই যার যার জায়গা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
কখন সে যে ছুটে গিয়ে ঘোড়ায় চেপে বসেছে রস্তভ তা জানে না, মনে করতেও পারে না। যুদ্ধে যোগ দিতে না পারার দুঃখ ও অপ্রসন্ন মেজাজ, এমন কি নিজেকে নিয়ে সব ভাবনাচিন্তা মুহূর্তের মধ্যে দূর হয়ে গেল। সম্রাটের কাছাকাছি আসতে পারার আনন্দেই মন ভরে উঠল। মনে হল, এই কাছে আসতে পারাতেই তার সারাদিনের দুঃখ মিটে গেল। মিলনেরা বহুবাঞ্ছিত মুহূর্তটি সমাগত হলে প্রেমিকের মনে যে সুখের সঞ্চার হয় সেই সুখ জেগেছে তার মনে। চারদিকে তাকাবার সাহস পর্যন্ত নেই : তার মনে শুধু একটি আনন্দের উচ্ছ্বাস–তিনি আসছেন! রস্তভের কাছে, আরো কাছে এগিয়ে আসছে সেই সূর্য, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে তার নরম মহনীয় অথচ সরল আলোকরশ্মি! চারদিকের মৃত্যু-স্তব্ধতার মধ্যে শোনা গেল সম্রাটের কণ্ঠস্বর।
পাভলোগ্রাদ অশ্বারোহীদল কি? সম্রাট জিজ্ঞেস করল।
রিজার্ভ সেনাদল স্যার! উত্তর এল পূর্ব কণ্ঠস্বরের তুলনায় একটি সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরে।
সম্রাট এসে থামল রস্তভের পাশে। তিন দিন আগেকার কুচকাওয়াজ দেখা মুখের চাইতেও আজ আলেক্সান্দারের মুখ অনেক বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে। সে মূর্তি যেন একটি ফুটফুটে চোদ্দ বছরের বালকের, অথচ সে মুখ মহামান্য সম্রাটের। অশ্বারোহী দলটিকে পর্যবেক্ষণের সময় ঘটনাক্রমেই সম্রাটের চোখ পড়ল রস্তভের চোখে, দুই সেকেন্ডের জন্য সেখানেই স্থির হয়ে রইল। রশুভের মনের মধ্যে তখন কি হচ্ছে সম্রাট তা বুঝল কি না কে জানে (রস্তভের মনে হল সম্রাট সব বুঝতে পেরেছে), তার দুটি নীল চোখ দুই সেকেন্ড সময় রস্তভের মুখের দিকেই তাকিয়ে রইল। সে দৃষ্টিতে ঝরে পড়ল একটি শান্ত, মৃদু আলো। তারপর হঠাৎই ভুরু তুলে পা দিয়ে ঘোড়র পেটে খোঁচা মেরে সে জোর কদমে ছুটে চলে গেল।
পাঁচ মিনিট পরেই পাভলোগ্রাদ সেনাদলকে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দেওয়া হল। ছোট জার্মান শহর উইশাউতে রস্তভ আর একবার সম্রাটকে দেখল। সম্রাট আসার ঠিক আগেই বাজার অঞ্চলে বেশ কিছুটা গোলাগুলি চলেছিল, কিছু নিহত ও আহত সৈনিক তখনো সেখানে পড়েছিল, সরিয়ে নেবার মতো সময় পাওয়া যায়নি। অফিসার ও সভাসদ পরিবৃত হয়ে একটা লেজকাটা বাদামি ঘোটকির পিঠে চড়ে চলেছে সম্রাট। একদিকে ঝুঁকে সোনা-বাঁধানো কাঁচটাকে আস্তে চোখের সামনে ধরে সে দেখল, একটি সৈনিক উপুড় হয়ে পড়ে আছে, তার ভোলা মাথাটা রক্তে মাখামাখি। আহত সৈনিকটি এত নোংরা, তাকে দেখলে এমনভাবে গা ঘিনঘিন করে করে যে সম্রাটকে তার এত কাছাকাছি দেখে রস্তভ মনে কষ্ট পেল। রস্তভ দেখল, সম্রাটের কাঁধ দুটি এমনভাবে কাঁপছে যেন তার শীত করছে, বাঁ পায়ের পাদানি দিয়ে সে ঘোড়ার পেটটা আস্তে আস্তে ঠুকতে লাগল, আর সুশিক্ষিত ঘোড়াটাও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একটা স্ট্রেচার আনা হল। একজন অ্যাডজুটান্ট ঘোড়া থেকে নেমে দুই হাতে সৈনিকটিকে তুলে স্ট্রেচারে শুইয়ে দিল। সৈনিকটি আর্তনাদ করে উঠল।
