যে প্রান্তরে এবার ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধ হবে ঠিক সেখানেই আগের বছর অস্ট্রিয় বাহিনীকে পরিচালিত করা হয়েছিল, কাছাকাছি এলাকাগুলিও পরিচিত এবং মানচিত্রে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখানো হয়েছে। ওদিকে বোনাপার্ত এখন অপেক্ষাকৃত দুর্বল, আর নতুন কোনো উদ্যোগও সে নিচ্ছে না।
আক্রমণ-প্রস্তাবের অন্যতম প্রধান সমর্থক দলগরুকভ সবেমাত্র পরিষদের বৈঠক থেকে ফিরেছে, শ্রান্ত, ক্লান্ত হলেও জয়ের আনন্দে তার গর্বের অন্ত নেই। প্রিন্স আন্দ্রু তার সঙ্গে বরিসের পরিচয় করিয়ে দিল, কিন্তু প্রিন্স দলগরুকভ তাকে কিছুই বলল না, শুধু বিনীত অথচ দৃঢ়ভাব প্রিন্স আর হাতটা চেপে ধরে নিজের মনের কথাটা চেপে না রাখতে পেরে ফরাসিতে বলল :
আহা, কী যুদ্ধই না আমরা জয় করেছি! ঈশ্বর করুন, এর ফলে সত্যিকারের যে যুদ্ধ হবে তাতেও যেন আমরা বিজয়ী হতে পারি! আজকের মতো আমাদের অনুকূল পরিস্থিতি কোনোদিন হবে না। অস্ট্রিয়দের সূক্ষ্ম ও সঠিক জ্ঞানের সঙ্গে রুশদের সাহসের সমন্বয়ের বেশি আর কি চাওয়া যায়?
তাহলে আক্রমণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত? বলকনস্কি জিজ্ঞেস করল।
আপনি জানেন কি না জানি না, কিন্তু আমার তো মনে হয় বোনাপার্তের সাহসে ভাটা পড়েছে, সম্রাটের কাছে লেখা তার একটা চিঠিও আজ পাওয়া গেছে, অর্থপূর্ণ হাসি হেসে দলগরুকভ বলল।
তাই নাকি? তিনি কি লিখেছেন? বলকনস্কি জানতে চাইল।
কি আর লিখবেন? ব্রা-দি-রি-দি-রা আর কি…কোনোরকমে সময় কাটানো। কিন্তু সবচাইতে মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের চিঠিতে পাঠ কি লেখা হবে সেটাই আমরা বুঝতে পারছি না! যদি কন্সল না লেখা হয়, সম্রাট তো মোটেই না, আমার মনে হয় সেনাপতি বোনাপার্ত, হওয়াই উচিত।
কিন্তু তাকে সম্রাট বলে স্বীকার না করে সেনাপতি বোনাপার্ত বলা–এ দুইয়ের মধ্যে তো তফাৎ আছে।
দলগরুকভ হেসে উঠে তাড়াতাড়ি বলল, ঠিক কথা! আপনি তো বিলিবিনকে চেনেন–ভারী চতুর মানুষ। সে প্রস্তাব করেছে পাঠ লেখা হোক রাজ্যহারক ও মানবতার শত্রু।
দলগরুকভ নিজের খুশিতেই হেসে উঠল।
শুধুই এই? বলকনস্কি বলল।
যাই হোক, বিলিবিনই একটা উপযুক্ত পাঠ খুঁজে বের করেছে। সে যেমন জ্ঞানী তেমনই চতুর।
সেটা কী?
ফরাসি সরকারের প্রধান সমীপেষু… Au chif du governement francais. গভীর আত্মতুষ্টির সঙ্গে দলগরুকভ বলল। ভালো, তাই না?
বলকনস্কি বলল, হ্যাঁ, কিন্তু তিনি তো এটা খুবই অপছন্দ করবেন?
হ্যাঁ, কিন্তু তিনি তো এটা খুবই অপছন্দ করবেন? বলকনস্কি বলল।
তা তো বটেই, খুবই অপছন্দ হবে! আমার দাদা তাকে চেনে, সে তো বর্তমান সম্রাটের সঙ্গে খানাও খেয়েছে, দাদাই আমাকে বলেছে, তার মতো ধূর্ত ও সূক্ষ্মবুদ্ধি কূটনীতিক সে আর দেখেনি–জানেন তো, লোকটি ফরাসি নিপুণতা ও ইতালিয় অভিনয়-দক্ষতার এক অপূর্ব সমন্বয়! তার ও কাউন্ট মার্কভের গল্পটা জানেন তো? কাউন্ট মার্কভই একমাত্র তোক যে তার সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে পারত! রুমালের গল্পটা জানেন তো? ভারি মজার!
একবার বরিসের দিকে একবার প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে ফিরে ফিরে বাঁচাল দলগরুকভ বলতে লাগল, আমাদের রাষ্ট্রদূত মার্কভকে পরীক্ষা করবার জন্য বোনাপার্ত ইচ্ছা করে তার সামনে নিজের রুমালটা ফেলে দিয়ে মার্কভের দিকে তাকাল, হয়তো সে আশা করেছিল যে মার্কভ তার রুমালটা তুলে দেবে, কিন্তু মার্কভ সঙ্গে সঙ্গে নিজের রুমালটাকে তার রুমালের পাশে ফেলে দিয়ে নিজেরটা তুলে নিল, কিন্তু বোনাপার্তের রুমালটা স্পর্শও করল না।
বলকনস্কি বলল, খুব মজার গল্প! কিন্তু প্রিন্স, আমি আপনার কাছে এসেছি এই যুবকের হয়ে একটা আবেদন নিয়ে। দেখুন… প্রিন্স আন্দ্রু কথা শেষ করার আগেই সম্রাটের কাছ থেকে একজন এড-ডি-কং এল দলগরুকভকে ডাকতে।
আঃ, কত যে ঝামেলা, তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে প্রিন্স আন্দ্রু ও বরিসের হাতে চাপ দিয়ে দলগরুকভ বলল। জানেন তো আপনার জন্য ও এই যুবকটির জন্য আমার সাধ্যমতো কিছু করতে পারলে আমি খুব খুশি হব। কিন্তু দেখতেই তো পাচ্ছেন… অন্য সময় হবে!
উচ্চ ক্ষমতাশালী লোকদের এত কাছাকাছি আসার চিন্তায় বরিস তখন উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। প্রিন্স দলগরুকভের পিছন পিছন তারা দুইজনও বারান্দায় বেরিয়ে এল। ম্রাটের ঘরের যে দরজা দিয়ে প্রিন্স দলগরুকভ ঢুকল, সেই দরজা দিয়েই বেরিয়ে এল বেসরকারি পোশাকপরা একটি ছোটখাট মানুষ, তার চতুর মুখ ও বেরিয়ে-আসা চোয়ালে ফুটে উঠেছে একটা সজীব ও চটপটে ভাব। দলগরুকভকে দেখে লোকটি ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো মাথাটা নাড়ল, তারপর ঠাণ্ডা, নিরাসক্ত দৃষ্টিতে প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকিয়ে সোজা এগিয়ে এল, স্পষ্টতই সে আশা করেছিল যে প্রিন্স আন্দু তাকে অভিবাদন করবে, আর না হয়তো তার পথের সামনে থেকে সরে যাবে। প্রিন্স আন্দ্রু কোনোটাই করল না : তার মুখে দেখা দিল শত্রুতার ভাব, ছোট লোকটিও মুখ ঘুরিয়ে বারান্দার অন্য দিকে সরে গেল।
লোকটি কে বরিস জিজ্ঞেস করল।
ইনি হচ্ছেন অত্যন্ত বিখ্যাত, কিন্তু আমার কাছে অত্যন্ত অপ্রীতিকর-পররাষ্ট্র মন্ত্রী আদম জারতরিস্কি, এদের মতো লোকরাই জাতির ভাগ্যবিধাতা, প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলকনস্কি বলল।
পরদিন শুরু হল সেনাবাহিনীর অভিযান, সেই থেকে একেবারে অস্তারলিজ যুদ্ধ পর্যন্ত বরিস কি প্রিন্স আন্দ্রুর সঙ্গে, কি দলগরুকভের সঙ্গে আর একটিবারও দেখা করতে পারল না, ততদিন সে এসমেলভ রেজিমেন্টেই থেকে গেল।
