সেদিন সে ওলমুজে প্রিন্স আন্দ্রুর দেখা পেল না, কিন্তু যে শহরে তাদের প্রধান ঘাঁটি ও কূটনৈতিক দপ্তর অবস্থিত, দুই সম্রাট যেখানে সদলে বাস করছে, রয়েছে নানা বাড়িঘর ও আদালত, সেখানকার চেহারা দেখে সেই জগতের বাসিন্দা হবার বাসনা তার মনে প্রবলতর হল।
কাউকে সে চেনে না, তার রক্ষীবাহিনীর শোভন ইউনিফর্ম সত্ত্বেও রাজকীয় সভাসদ ও সামরিক কর্মচারীসহ যেসব পদস্থ ব্যক্তি পালক, ফিতে ও পদকে সজ্জিত হয়ে সুন্দর সুন্দর গাড়িতে চেপে পথ দিয়ে চলেছে, তারা সকলেই তার মতো একজন তুচ্ছ অফিসারের তুলনায় এত বেশি উঁচু মহলের লোক যে তারা যে তাকে দেখে শুভকামনাও জানাল না তাই নয়, তার অস্তিত্বকেই বুঝি স্বীকার করল না। প্রধান সেনাপতি কুতুজভের আপিসে বলকনস্কির খোঁজ করতে গেলে সেখানকার অ্যাডজুটান্টরা, এমন কি আর্দালিরা পর্যন্ত, এমনভাবে তার দিকে তাকাতে লাগল যেন তারা বলতে চাইছে, আরে বাপু, তোমার মতো কত অফিসার এখানে হামেশাই আসা-যাওয়া করছে, তাদের নিয়ে আমাদের এতটুকু মাথাব্যথা নেই। কিন্তু এসব সত্ত্বেও, অথবা হয়তো এই কারণেই, পরদিন ১৫ নভেম্বর ডিনারের পরেই সে আবার ওলমুজে গেল এবং যে বাড়িটা কুতুজভ দখল করেছিল সেখানে পৌঁছে বলকনস্কির খোঁজ করল। প্রিন্স আন্দ্রু ভিতরেই ছিল, বরিসকে একটা বড় হলে নিয়ে যাওয়া হল। হলটা আগে বোধহয় নাচের জন্য ব্যবহার করা হতো, কিন্তু এখন সেখানে পাঁচটা বিচানা পাতা রয়েছে, আর আছে রকমারি আসবাব : একটা টেবিল, চেয়ার ও একটা ক্ল্যাভিকর্ড। একজন অ্যাডজুটান্ট পারসিক ড্রেসিং-গাউন পরে দরজার কাছে বসে লিখছে। আর একজন লাল নেসভিৎস্কি হাতের উপর মাথা রেখে বিছানায় শুয়ে পাশে বসা জনৈক অফিসারের সঙ্গে হাসাহাসি করছে। তৃতীয়জন ক্লাভিকর্ডে ভিয়েনিজ ওয়ালজ বাজাচ্ছে, আর চতুর্থজন ক্ল্যাভিকর্ডের উপর শুয়ে গান গাইছে। বলকনস্কি সেখানে ছিল না। বরিসকে দেখে ভদ্রলোকরা কেউই নড়েচড়ে বসল না। যে লিখছিল সে বরিসের প্রশ্নের উত্তরে জানিয়ে দিল, বলকনস্কি এখন কাজে ব্যস্ত আছে, তার সঙ্গে দেখা করতে হলে দরজা পেরিয়ে অভ্যর্থনা-ঘরে যেতে হবে। অভ্যর্থনা-ঘরে গিয়ে বরিস জনাদশেক অফিসার ও অধিনায়ককে দেখতে পেল।
প্রিন্স আন্দ্রু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে চোখ নামিয়ে পদকসজ্জিত একজন বুড়ো রুশ সেনাপতির কথা শুনছিল। প্রায় আঙুলের উপর খাড়া দাঁড়িয়ে বুড়ো সেনাপতিটি রক্তিম মুখে একজন সাধারণ সৈনিকের তোষামোদী ভঙ্গি ফুটিয়ে কি যেন বলছে।
কথায় তাচ্ছিল্য প্রকাশ করতে হলেই প্রিন্স আন্দ্রু ফরাসি উচ্চারণে কথা বলে, এখনো সেইভাবেই বলল, খুব ভালো কথা, তাহলে অপেক্ষাই করুন, আর তখনই বরিসকে দেখতে পেয়ে সে মাথা নেড়ে স্মিত হাসির সঙ্গে তার দিকে এগিয়ে গেল। বুড়ো রুশ সেনাপতিটি তবু আরো কিছু কথা শোনাবার জন্য মিনতি জানাতে জানাতে তার পিছনে চলতে লাগল।
প্রিন্স আন্দ্রু বরিসকে বলল, কাল তোমার সঙ্গে দেখা না হওয়ায় আমি খুবই দুঃখিত। সারাদিন জার্মানদের সঙ্গে হৈচৈ করেই কেটেছে। যাই হোক, তুমি কি এখনো অ্যাডজুটান্ট হতে চাও? তোমার কথাই ভাবছিলাম।
হ্যাঁ, প্রধান সেনাপতির কাছে কথাটা তুলব বলে ভাবছিলাম। আমার ব্যাপারে তিনি প্রিন্স কুরাগিনের কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছেন।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, বেশ তো, বেশ তো। পরে এ নিয়ে কথা হবে। আগে এই ভদ্রলোকের কাজের কথাটা শুনে আসি, তারপর তোমার সঙ্গে কথা বলব। লাল-মুখ ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা শেষ করে দুজনে বড় হল ঘরটাতে গেলে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, দেখ ভাই, তোমার কথা আমি ভেবেছি। তোমার প্রধান সেনাপতির কাছে যাবার কোনো দরকার নেই। তিনি অনেক ভালো ভালো কথা বলবেন, তোমাকে ডিনারে নেমন্তন্ন করবেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। শীঘ্রই আমাদের মতো এড-ডি-কং ও অ্যাডজুটান্টদের নিয়ে একটা সেনাদল গড়ে তোলা হবে। কিন্তু আমরা যা করব তা হল : আমার একটি ভালো বন্ধু আছে–অ্যাডজুটান্ট-জেনারেল প্রিন্স দলগরুক, আর তুমি না জানলেও আসল সত্য হল, এখন সপারিষদ কুতুজভ ও আমাদের কোনো প্রভাবই নেই। সবকিছুই হচ্ছে সম্রাটকে কেন্দ্র করে। কাজেই আমরা দলগরুকভের কাছেই যাব, এমনিতেই তার কাছে আমাকে যেতে হতো, আর তোমার কথা তাকে বলেও রেখেছি। দেখা যাক সে তোমাকে তার দলে নিয়ে নিতে পারে কি না, অথবা সূর্যের কাছাকাছি কোনো স্থানে তোমাকে বসাতে পারে কি না।
কোনো যুবককে জাগতিক সাফল্য লাভের ব্যাপারে সাহায্য করতে প্রিন্স সর্বদাই প্রস্তুত। অহংকারবশত যে কাজ সে নিজের জন্য করতে কখনো রাজি নয়, অপরের জন্য সেই জাগতিক সাফল্য লাভের চেষ্টা করতে গিয়ে সে উপর মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে, কারণ সেইসব মহলের লোকজন তাকেও আকর্ষণ করে। সে খুব সহজেই বরিসের দায়টা মাথায় নিল এবং তাকে নিয়ে দলগরুকভের কাছে গেল।
ওলমুজের যে প্রাসাদে দুই সম্রাট ও তার দলবল বাস করছিল সেখানে তারা যখন ঢুকল তখন সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। সেইদিনই সমর-পরিষদের একটা বৈঠক হয়ে গেছে, হফক্রিগসরাথের সমস্ত সদস্য এবং দুই সম্রাট তাতে অংশগ্রহণ করেছে। সেই বৈঠকে বৃদ্ধ সেনাপতি কুতুজভ ও প্রিন্স শোয়ার্তজেনবের্গের আপত্তি সত্ত্বেও স্থির হয়েছে যে অবিলম্বে অগ্রসর হয়ে বোনাপার্টের সঙ্গে যুদ্ধে নামতে হবে। সমর-পরিষদের বৈঠক সবে শেষ হয়েছে এমন সময় দলগরুকভের সঙ্গে দেখা করতে প্রিন্স আন্দ্রু বরিসকে সঙ্গে নিয়ে প্রাসাদে ঢুকল। বৈঠকের প্রভাবে তখনো সকলেই আচ্ছন্ন, সেখানে তরুণদের দলই জয়লাভ করেছে। যারা বিলম্ব করার পরামর্শ দিয়েছিল, যারা বলেছিল এখনই অগ্রসর না হয়ে অন্যকিছুর জন্য অপেক্ষা করা হোক, তাদের এমনভাবে সম্পূর্ণ চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের সব যুক্তিকে এমন অকাট্যভাবে খণ্ডন করা হয়েছে যে আসন্ন যুদ্ধ এবং তার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে জয়লাব করাটাকে এখন আর কেউ ভবিষ্যতের ব্যাপার বলে মনে করছে না–সেটা যেন অতীতের ঘটনা। সব রকম সুবিদাই তো আমাদের পক্ষে। নেপোলিয়নের সৈন্যদের তুলনায় নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠতর আমাদের সৈন্যরা সংখ্যায় প্রচুর, তারা সকলে এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয়েছে, আর ম্রাটের উপস্থিতিতে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা যুদ্ধ শুরু করতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। যেখানে যুদ্ধটা। হবে তার সমরকৌশলগত অবস্থানের প্রতিটি বিবরণ অস্ট্রিয় সেনাপড়ি ওয়েরদারের পরিচিত : সৌভাগ্যক্রমে ..
