তার মনে হল, এই লোকটির একটিমাত্র কথায় এই বিরাট জনতা ছুটে যাবে আগুন ও জলের পথে, অপরাধ করবে, মরবে, না হয় চরম বীরত্ব প্রদর্শন করবে। তাই তার শরীর কেঁপে উঠল, সেই কথাটি শুনবার প্রত্যাশায় তার অন্তর স্তব্ধ হয়ে রইল।
চারদিক থেকে ব্রজের গর্জন উঠল হুররা! হুররা! হুররা! রেজিমেন্টের পর রেজিমেন্ট সম্রাটকে সম্ভাষণ জানিয়ে বলতে লাগল হুররা। আবার এগিয়ে চলল সকরে, আবার হুররা! হুররা! সে শব্দ ক্রমাগতই আরো জোরদার, আরো পরিপূর্ণ, আরো কান-ফাটানো।
অশ্বারোহী রক্ষীবাহিনীর ইউনিফর্ম পরিহিত টুপি মাথায় সুদর্শন যুবক সম্রাট আলেক্সান্দার সকলেরই আকর্ষণ করল।
রস্তভ ছিল ভেরিবাদকদের কাছাকাছি। জারকে চিনতে পেরে সে তার আগমনের উপর নজর রাখল। জার যখন তার থেকে বিশ পায়ের মধ্যে এসে গেল তখন নিকলাস তার সুদর্শন, খুশিভরা মুখের প্রতিটি রেখা পরিষ্কার দেখতে পেল, সঙ্গে সঙ্গে এক অজ্ঞাতপূর্ব মমতায় ও উম্মসে তার মন ভরে গেল। জারের প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি চলন তাকে মুগ্ধ করল।
পাভলোগ্রাদদের সামনে থেমে জার ফরাসিতে অস্ট্রিয় সম্রাটকে একটা কিছু বলে ঈষৎ হাসল।
সে হাসি দেখে রস্তভও আপনা থেকেই হেসে ফেলল, সম্রাটের জন্য একটা প্রবল ভালোবাসার স্রোত বয়ে গেল তার অন্তরে। তার ইচ্ছা হল, সে ভালোবাসকে বাইরে প্রকাশ করে। কিন্তু সেটা একেবারেই অসম্ভব জেনে তার কাঁদতে ইচ্ছা করল। রেজিমেন্টের কর্নেলকে ডেকে জার তার সঙ্গে কিছু কথা বলল।
রস্তভ ভাবল, হা ঈশ্বর, সম্রাট আমার সঙ্গে কথা বললে না জানি কি হতো! আমি বুঝি সুখে মরেই যেতাম!
অফিসারদের উদ্দেশ্যে জার বলল : ভদ্রমহোদয়গণ, আপনাদের সকলকেই আমি ধন্যবাদ জানাচ্ছি, সমস্ত অন্তর দিয়ে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।রস্তভের মনে হল, প্রতিটি কথা যেন স্বর্গ থেকে ভেসে এল। এই মুহূর্তে জারের জন্য সে সানন্দে মরতেও প্রস্তুত!
আপনারা সেন্ট জর্জের পতাকা লাভ করেছেন, আশা করি তার উপযুক্ত হবেন।
আহা, তার জন্য মরণেও সুখ! রস্তভ ভাবল।
জার আরো কি যেন বলল, সেটা রস্তভ শুনতে পেল না, সৈন্যরা চিৎকার করে উঠল হুররা!
জিনের উপর উপুড় হয়ে সমস্ত শক্তি দিয়ে রস্তভও চিৎকার করে বলল হুররা!
জার কয়েক মিনিট হুজারদের সামনে দাঁড়াল, যেন কি করবে বুঝতে পারছে না।
রস্তভ ভাবল, সম্রাট কি করে ইতস্তত করতে পারেন?
সে ইতস্ততভাব মাত্র মুহূর্তের জন্য। উঁচলো-মুখ বুট পরিহিত জারের পা তার ঘোড়র পেটে খোঁচা মারল, তার শাদা দস্তানা-ঢাকা হাতে তুলে নিল রাশ, আর এড-ডি-কং বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে জার ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। অন্যসব রেজিমেন্টের সামনে থামতে থামতে সে দূর থেকে দূরে চলে গেল, শেষপর্যন্ত রস্তভের চোখের সামনে ভাসতে লাগল শুধু তার টুপির শাদা পালকগুলো।
সে দলে রস্তভ দেখতে পেল বলকনস্কিকেও। গতকালের ঝগড়ার কথাটা রস্তভের মনে পড়ে গেল, বলকনস্কিকে দ্বৈতযুদ্ধে আহ্বান করা উচিত কি না সে প্রশ্নও মনে জাগল। এখন ভাবল, নিশ্চয়ই না। এই কি এ কথা ভাবার বা বলার উপযুক্ত সময়? এমন ভালোবাসা, এমন উন্মাদনা, এমন আত্মত্যাগের মধ্যে আমাদের ঝগড়া-বিবাদের কি দাম আছে। এখন আমি সকলকেই ভালোবেসেছি, ক্ষমা করেছি।
সম্রাট যখন প্রায় সবগুলি রেজিমেন্টকে পার হয়ে গেল তখন সৈন্যরা তার সামনে শুরু করল আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ। বেদুইনের পিঠে চেপে রস্তভও তাতে যোগ দিল।
সম্রাট বলল, পাভলোগ্রাদগণ! আপনারা খুব ভালো!
হা ঈশ্বর, এই মুহূর্তে তিনি যদি আমাকে আগুনে ঝাঁপ দিতে বলতেন তাহলে আমি ক সুখী হতাম! রস্তভ ভাবল।
কুচকাওয়াজ শেষ হবার পরে নবাগত অফিসার ও কুতুজভের অফিসাররা দলে দলে ভাগ হয়ে নানা পুরস্কারের কথা, অস্ট্রিয় সেনাদল ও তাদের ইউনিফর্মের কথা, বোনাপার্তের কথা, এখন যদি এসেন বাহিনী এসে পড়ে আর প্রাশিয়া আমাদের পক্ষে যোগ দেয় তাহলে বোনাপার্তের অবস্থা যে কাহিল হয়ে পড়বে–এইসব নানা কথা নিয়ে আলোচনা করতে লাগল।
কিন্তু প্রতিটি দলের আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল সম্রাট আলেক্সান্দার। একান্ত উচ্ছ্বাসের সঙ্গে তার প্রতিটি কথা, প্রতিটি চলনের বিবরণ চলতে লাগল। সকলের মুখে মুখে।
সকলেরই মনে একটিমাত্র বাসনা : সম্রাটের আদেশ যত শীঘ্র সম্ভব শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া। সম্রাট স্বয়ং নেতৃত্ব দিলে তারা কাউকে পরাজিত করতে পশ্চাৎপদ হবে না, তা সে যেই হোক না কেন : এই কথাই ভাবতে লাগল রস্তভ, ভাবতে লাগল অধিকাংশ অফিসার।
দুটো যুদ্ধে জয়লাভ করলেও যতটা না হত এখন তারা যুদ্ধজয় সম্পর্কে তার চাইতে নিশ্চিত বোধ করছে।
*
অধ্যায়-৯
কুচকাওয়াজের পরদিন সেরা ইউনিফর্মটি গায়ে চাপিয়ে বন্ধু বের্গের শুভেচ্ছা নিয়ে ঘোড়ায় চেপে বরিস গেল ওলমুজে বলকনস্কির সঙ্গে দেখা করতে। ইচ্ছা, তার বন্ধুত্বকে কাজে লাগিয়ে একটা চাকরি বাগিয়ে নেবে–কোনো বিখ্যাত লোকের অ্যাডজুটান্ট হতে পারলেই ভালো হয়, কারণ সেনাবাহিনীতে ঐ চাকরিটাই তার বেশি পছন্দ। রশুভের বাবা একসময় দশ হাজার রুল পাঠাতে পারে, তাই তার পক্ষে কারো খানসামা না হওয়ার কথা বলা শোভা পায়, কিন্তু আমার তো মাথার ঘিলু ছাড়া আর কিছু নেই, আমাকে তো জীবনে উন্নতি করতেই হবে, কাজেই আমি কোনো সুযোগই হারাতে পারি না, সুযোগের সদ্ব্যবহার আমাকে করতেই হবে!
