সে বলল, আপনার কথা আমি বলছি না। আপনাকে আমি চিনি না, আর সত্যি কথা বলতে কি, চিনতে চাইও না। আমি সাধারণভাবে বেসামরিক কর্মচারীদের কথাই বলছি।
তাকে বাধা দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু শান্ত কর্তৃত্বের সুরে বলল, আর আমি আপনাকে বলতে চাই, আপনি আমাকে অপমান করতে চাইছেন, আর এবিষয়ে আপনার সঙ্গেই একমত হতে আমি রাজি যে আপনার যথেষ্ট আত্মমর্যাদাবোধ না থাকলে সে কাজটা করা খুবই সহজ হতো, কিন্তু এটা জেনে রাখুন যে আপনি স্থান ও কালটা বড়ই খারাপ বেছে নিয়েছেন। দুই একদিনের মধ্যেই আমাদের আরো অনেক বড় ও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটা লড়াইতে অংশ নিতে হবে, তাছাড়া, দুর্ভাগ্যবশত আমার মুখটা দেখেই যে আপনি অখুশি হয়েছেন সেজন্য আপনার পুরনো বন্ধু বেস্কয় মোটেই দোষী নয়। যাইহোক, সে উঠে দাঁড়িয়ে আবার বলতে লাগল, আমার নাম আপনি জানেন, আমাকে কোথায় পাওয়া যাবে তাও জানেন, কিন্তু একটা কথা ভুলে যাবেন না যে আমাকে বা আপনাকে এতটুকু অপমান করা হয়েছে বলে আমি মনে করি না, আর আপনার চাইতে বয়সে বড় বলেই আমার পরামর্শ শুনুন, এ ব্যাপারটার উপর এখানেই ইতি টেনে দিন। আচ্ছা, তাহলে শুক্রবার পরিদর্শনের পরে আমি আপনাকে আশা করব বেস্কয়। অ রিভোয়া! সোচ্চারে কথাটা বলে দুজনকেই অভিবাদন জানিয়ে সে বেরিয়ে গেল।
প্রিন্স আন্দ্রু চলে যাবার পরে রস্তভ বুঝতে পারল তার কি কথা বলা উচিত ছিল। আর সেকথা বলতে না পারায় এখনো তার রাগ গেল না। তক্ষুনি ঘোড়া আনবার হুকুম দিয়ে কোনোরকমে বরিসের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। সে কি পরের দিন হেডকোয়ার্টারে গিয়ে এই দাম্ভিক অ্যাডজুটান্টের মোকাবিলা করবে, নাকি এখানেই ব্যাপারটাকে শেষ হতে দেবে, সারাটা পথ এই প্রশ্নই তাকে বিব্রত করে তুলল। রাগের মাথায় একবার মনে হল, তার পিস্তলের পাল্লার মধ্যে পড়ে এই ছোটখাট ভঙ্গুর লোকটির ভীত অবস্থা দেখলে সে কত না খুশি হবে, কিন্তু পরক্ষণেই সে সবিস্ময়ে অনুভব করল, সে অ্যাডজুটান্টটিকে সে এত ঘৃণা করে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে তার যত সাধ, পরিচিত লোকজনদের অন্য কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করবার ততখানি সাধ তার মনে নেই।
*
অধ্যায়-৮
রস্তভ যেদিন বরিসের সঙ্গে দেখা করতে যায় তার পরদিনই অস্ট্রিয় এবং রুশ সৈন্যদের একটি অভিপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হল। যেসব সৈন্য রাশিয়া থেকে নতুন এসেছে এবং যারা কুতুজভের অধীনে অনেকদিন থেকে অভিযান চালিয়েছে–এই দুদলই সে অনুষ্ঠানে ছিল। রুশ সম্রাট তার উত্তরাধিকারী জারেভিচকে সঙ্গে নিয়ে এবং অস্ট্রিয় সম্রাট আর্চডিউককে সঙ্গে নিয়ে মিত্রপক্ষের আশি হাজার সৈন্যের কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করে।
খুব সকাল থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চটপটে সৈনিকদের চলাফেরা শুরু হয়ে যায়, দুর্গের সম্মুখস্থ মাঠে তারা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ে। বেলা দশটা নাগাদ সব ব্যবস্থা সুসম্পন্ন হয়ে যায়। প্রকাণ্ড মাঠে সৈন্যরা সমবেত হয়েছে। গোটা বাহিনীতে তিনটি সারিতে সাজানো হয়েছে : সকলের আগে অশ্বারোহী বাহিনী, তার পিছনে গোলন্দাজ বাহিনী এবং তারও পরে পদাতিক বাহিনী।
প্রতি দুই সারি সৈন্যের মাঝখানে রাস্তার মতো চওড়া একটা জায়গা ফাঁকা রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনীর তিনটি অংশকে পরিষ্কার আলাদাভাবে চেনা যাচ্ছে : কুতুজভের যুদ্ধরত সেনাদল (পাভলোগ্রাদরা রয়েছে সামনের সারির ডান দিকে), রক্ষীবাহিনী ও সেনাবারিকের রেজিমেন্টসহ যেসব সৈন্য সম্প্রতি রাশিয়া থেকে এসেছে তারা এবং
অস্ট্রিয় সেনাদল। কিন্তু সকলেই দাঁড়িয়েছে একই সারিতে, একই সেনাপতির অধীনে এবং একই পর্যায়ক্রমে।
গাছের পাতার উপর বাতাসের মতো একটা উত্তেজিত গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল : তারা আসছেন। তারা আসছেন! শোনা গেল অনেক আতংকিত কণ্ঠস্বর, গোটা বাহিনী চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে দুলে উঠল।
তাদের সম্মুখে ওলমুজের দিক থেকে একটা দলকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা দমকা হাওয়া সেনাবাহিনীর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়ায় তাদের বর্শার ফলাগুলি ঝিলমিল করে উঠল, খোলা পতাকাগুলি দণ্ডের গায়ে লেগে পৎ পৎ করতে লাগল। মনে হল যেন গোটা বাহিনীটি নড়েচড়ে দুই সম্রাটের আগমনে আনন্দ প্রকাশ করছে। শোনা গেল একটি উচ্চ কণ্ঠস্বর : সামনে তাকাও! তারপর সূর্যোদয়ের কালে মোরগের ডাকের মতো নানাদিক থেকে সেই একই কথার প্রতিধ্বনি করা হল। আবার সব চুপচাপ।
সেই মৃত্যু-স্তব্ধতার মধ্যে শোনা যেতে লাগল শুধু অশ্বক্ষুরের ধ্বনি। সম্রাটদ্বয়ের দল এগিয়ে আসছে। দুই সম্রাট অশ্বারোহণে এগিয়ে এল, প্রথম অশ্বারোহী রেজিমেন্টের ভেরি বেজে উঠল। মনে হল, এ যেন ভেরির বাদ্য সে নয়, সম্রাটদ্বয়ের আগমনে উৎফুল্ল গোট-বাহিনীই বুঝি সঙ্গীতে মেতে উঠেছে। তারই মধ্যে শোনা গেল সম্রাট আলেক্সন্দারের যৌবনদীপ্ত কণ্ঠস্বর। সকলকে সে জানাল সাদর সম্ভাষণ, আর প্রথম রেজিমেন্ট গর্জে উঠল হুররা! সে গর্জন কানে তালা লাগিয়ে একটানা চলতে লাগল, আর তা শুনে বুঝি সৈনিকরাও ভয় পেয়ে গেল।
রস্তভ দাঁড়িয়েছিল কুতুজভের বাহিনীর সামনের সারিতে। জার সেই দিকেই প্রথম এগিয়ে এল। সেনাদলের অন্য প্রতিটি লোকের মতোই একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল রস্তভের : আত্মবিস্মৃতির অনুভূতি, শক্তির গর্বিত চেতনা, আর এই জয়-গৌরবের মূলাধার মানুষটির প্রতি সানুরাগ আকর্ষণ।
