একখানা প্রশংসাপত্র…ওটা আমার কোন কাজে লাগবে!
চিঠিটা তুলে ঠিকানাটা পড়ে বরিস বলল, ও কথা কেন বলছ? চিঠিটা তোমার অনেক কাজে লাগতে পারে।
আমার কিছুই চাই না, আমি কারো অ্যাডজুটান্টও হব না।
কেন হবে না? বরিস জিজ্ঞেস করল।
ওটা তো খানসামার চাকরি!
মাথা নেড়ে বরিস বলল, তুমি দেখছি সেই একই স্বপ্নদর্শীই রয়ে গেছ।
আর তুমি সেই একই কূটনীতিবিদ। কিন্তু সেটা কথা নয়।…তারপর, বল কেমন আছ? রস্তভ জিজ্ঞেস করল।
তা যেমন দেখছ। এখনো পর্যন্ত সবই ঠিক আছে, কিন্তু আমি স্বীকার করছি, আমি অ্যাডজুটান্ট হতেই চাই, রণক্ষেত্রে থাকতে চাই না।
কেন?
কারণ একবার যদি কেউ সামরিক চাকরিতে ঢোকে তাহলে জীবনে যথাসম্ভব সাফল্যলাভের চেষ্টা করাই তার পক্ষে উচিত।
ওঃ, এই কথা! রস্তভ বলল, তার মনে তখন অন্য চিন্তা। বুড়ো গ্রেবিয়েল মদ নিয়ে এল।
বরিস জিজ্ঞেস করল, এখন কি বের্গকে ডেকে পাঠাতে পারি? সে তোমার সঙ্গে মদ খেতে পারবে। আমি খাই না।
বেশ, ডেকে পাঠাও।…তারপর এই জার্মানটির সঙ্গে কেমন চলছে? তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে রস্তভ বলল।
সে খুব, খুব ভালো, সৎ ও মনের মতো লোক, বরিস জবাব দিল।
রস্তভ আর একবার একদৃষ্টিতে বরিসের চোখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বের্গ ফিরে এলে এক বোতল মদ নিয়ে বসে তিন অফিসারের মধ্যে প্রাণবন্ত আলোচনা শুরু হল। রক্ষীবাহিনীর দুই অফিসার শোনাল তাদের অভিযানের কথা, রাশিয়া, পোল্যান্ড ও অন্যত্র তাদের প্রশংসার কথা। তাদের সেনাপতি এ্যান্ড ডিউকের নানা উক্তি ও কাজের ফিরিস্তি দিল, তার দয়া-দাক্ষিণ্য ও খিটখিটে মেজাজের নানা গল্প বলল। তারপর এল রশুভের পালা। কথা বলতে বলতে সেও ক্রমেই উৎসাহিত হয়ে উঠল। স্তভ সত্যবাদী যুবক, সে কখনো ইচ্ছা করে মিথ্যা বলে না। সেইভাবে প্রকৃত ঘটনার বর্ণনা দিয়েই সে তার কাহিনী শুরু করল, কিন্তু নিজের অজ্ঞাতেই আপনা থেকে কখন যে মিথ্যা এসে তার কথার মধ্যে জুড়ে বসল তা সে বুঝতেই পারল না। আসলে সে যদি আগাগোড়া সত্য কথাই বলে যেত তাহলে হয় শ্রোতারা তাকে বিশ্বাস করত না, আর না হয়তো এ ধরনের খেলো বিবরণের জন্য রস্তভকেই দোষী সাব্যস্ত করত।
যাই হোক, তার গল্পের মাঝখানেই প্রিন্স আন্দ্রু ঘরে ঢুকল, বরিস তাকে আশাও করছিল। প্রিন্স আলু যুবকদের সাহায্য করতে ভালোবাসে, বরিস যেচে তার সহায়তা প্রার্থনা করায় সে খুব খুশি হয়েই এখানে এসেছে। জারেভিচের জন্য কিছু কাগজপত্র দিয়ে কুতুজভ তাকে পাঠিয়েছে। সে আশা করেছিল বরিসকে একলা পাবে। কিন্তু এখানে এসে যখন দেখল যুদ্ধক্ষেত্রের জনৈক হুজার তার সামরিক কার্যকলাপের বিবরণ শোনাচ্ছে (এ ধরনের মানুষকে প্রিন্স আন্দ্রু সহ্য করতে পারে না), তখন স্মিত হাসির সঙ্গে বরিসের দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে আধ-বোজা চোখে তাকাল রশুভের দিকে, ক্লান্তভাবে মাথাটা ঈষৎ নোয়াল, তারপর আলস্যবশত সোফায় গিয়ে বসল। এ ধরনের বাজে দলের মধ্যে এসে পড়ায় তার মেজাজ বিগড়ে গেল। সেটা লক্ষ্য করে রস্তভ উত্তেজিত হল, কিন্তু তাকে আমল দিল না, লোকটি নেহাই অপরিচিত। বরিসের দিকে তাকিয়ে দেখল, যুদ্ধক্ষেত্রের একজন হুজারকে নিয়ে সেও যেন লজ্জায় পড়েছে।
বরিস পরিচিত সকলের খবর জানতে চাইল এবং সুবিবেচকের মতো যুদ্ধের কথা যতটা জানতে চাওয়া উচিত সে সম্পর্কে কিছু প্রশ্নও করল।
হয়তো আমরা আরো এগিয়ে যাব, একজন অপরিচিত লোকের সামনে এর চাইতে বেশি কিছু বলতে বলকনস্কি স্বভাবতই অনিচ্ছুক।
এই সুযোগে একান্ত বিনয়ের সঙ্গে বের্গ জানতে চাইল, অফিসারদের ঘোড়ার খাদ্য বাবদ ভাতা দ্বিগুণ হবে বলে যে গুজব রটেছে সেটা সত্য কি না। তাতে প্রিন্স আন্দ্রু হেসে জানাল, এ রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নির্দেশ সম্পর্কে কোনো মতামত সে দিতে পারে না। তা শুনে বের্গ খুশিতে হেসে উঠল।
বরিসকে উদ্দেশ্য করে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, আপনার কাজের ব্যাপারে আমরা পরে কথা বলব (মুখ ঘুরিয়ে সে রস্তভের দিকে তাকাল)। পরে আমার সঙ্গে দেখা করবেন, যা সম্ভব তা আমি অবশ্যই করব।
ঘরের চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু রশুভের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। বলল, মনে হল আপনি শান গ্রেবার্নের কথা বলছিলেন? আপনি কি সেখানে ছিলেন?
যেন এড-ডি-কংকে অপমান করবার জন্যই রস্তভ রাগের সঙ্গে বলল, আমি সেখানে ছিলাম।
হুজারটির মনের অবস্থা লক্ষ্য করে বলকনস্কির মজা লাগল। ঈষৎ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, হ্যাঁ, সেখানকার ব্যাপার নিয়ে এখন অনেক গল্পই বলা হচ্ছে!
হ্যাঁ, অনেক গল্প, জোর গলায় রস্তভ কথাটার পুনরাবৃত্তি করল। তার চোখ দুটো হঠাৎ জ্বলে উঠল, সে একবার বরিসের দিকে একবার বলকনস্কির দিকে তাকাল। হ্যাঁ, অনেক গল্প। কিন্তু আমাদের গল্প সেই সব মানুষের গল্প যারা শত্রুপক্ষের গোলাগুলির সামনে দাঁড়িয়েছিল। আমাদের গল্পগুলি ওজনে ভারি, যেসব কর্মচারী কিছু না করেই পুরস্কার পায় তাদের গল্পের মতো নয়!
শান্ত, উদার হাসি হেসে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, যাদের দলের আমি একজন বলে আপনি মনে করেন?
সেই মুহূর্তে একটা অদ্ভুত ক্রোধ এবং এই লোকটির আত্মসংযমের প্রতি শ্রদ্ধার ভাব মিলে-মিশে রশুভের মনে একাকার হয়ে গেল।
