বরিস ও বের্গ তখন শিবিরে বসে দাবা খেলছিল।
বরিস বলল, এই নাও, দেখি এবার কেমন করে পার পাও?
চেষ্টা তো করতে হবে, একটা খুঁটিতে হাত রেখে কথাটা বলেই বের্গ হাতটা সরিয়ে নিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরোজাটা খুলে গেল।
রস্তভ চিৎকার করে বলল, শেষপর্যন্ত দেখা পেলাম! আর বের্গও আছে! আরে, ছোট ছেলেরা, শুতে যাও, ঘুমিয়ে পড়? ছোটবেলায় তার রুশ নার্স ফরাসিতে এই কথাগুলি বলত। আর তা শুনে সে ও বরিস হো-হো করে হাসত।
আরে বাস, তুমি কত বদলে গেছ!
বরিস খেলা রেখে রস্তভের দিকে এগিয়ে গেল, নিকলাস এড়িয়ে যেতে চাইলেও বরিস বন্ধুর মতো শান্তভাবে তাকে আলিঙ্গন করল, তিনবার চুমো খেল।
প্রায় ছমাস তাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ নেই, যে বয়সে মানুষ জীবনের পথে প্রথম পদক্ষেপ করে সেই বয়সে পৌঁছে দুজনই দুজনের মধ্যে যথেষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করল, যে সমাজে তারা পা রেখেছে তারই প্রভাব পড়েছে তাদের উপর।
নিজের কাদামাখা ব্রিচেস দেখিয়ে রস্তভ বলল, আরে, তোমরা তো ফুলবাবুর দল! এত তাজা যে দেখে মনে হয় কোনো উৎসব থেকে ফিরছে, সম্মুখ সমরে রত আমাদের মতো পাপীদের মতো মোটেই নয়। রস্তভের চড়াগলা শুনে জার্মান বাড়িউলিটি দরজায় মুখ বাড়াল।
আরে, বেশ সুন্দরী, কি বল? চোখ টিপে সে বলল।
বরিস বলল, অত চেঁচাচ্ছ কেন? ওদের ভয় পাইয়ে দেবে যে। তুমি আজই আসবে আশা করিনি। কুতুজভের অ্যাডজুটান্ট বলকনস্কি আমার বন্ধু, তার হাত দিয়ে মাত্র গত কালই তো তোমাকে চিঠিটা পাঠিয়েছি। সে যে এত তাড়াতাড়ি তোমাকে চিঠিটা পৌঁছে দেবে তা ভাবিনি।…তারপর, কেমন আছ? এর মধ্যেই গোলাগুলির মুখে পড়েছ?
কোনো জবাব না দিয়ে ইউনিফর্মের সঙ্গে আটকানো সৈনিকদের সেন্ট জর্জ ক্রুশটা নেড়ে ব্যান্ডেজ-বাঁধা হাতটা দেখিয়ে রস্তভ একটু হেসে বের্গের দিকে তাকাল।
দেখতেই তো পাচ্ছ, মুখে বলল।
বটে? হা! হা! বরিসও হেসে বলল। আর আমরাও একটা চমৎকার যাত্রার ভিতর দিয়ে এসেছি। তুমি নিশ্চয়ই জান, হিজ ইম্পিরিয়াল হাইনেস সারাক্ষণই আমাদের রেজিমেন্টের সঙ্গে অশ্বারোহণে এসেছেন, কাজেই সবরকম আরাম ও সুবিধা আমরা পেয়েছি। পোল্যান্ডে সে কী অভ্যর্থনার ঘটা! কী সব ডিনার ও বল নাচ! তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। আর জারেভিচও আমাদের অফিসারদের উপর খুবই সদয় ছিলেন।
দুই বন্ধুই নিজের নিজের কাজের ফিরিস্তি দিতে লাগল, একজন বলল হুজার জীবনের হৈ-হল্লা ও রণক্ষেত্রের জীবনযাত্রার কথা, আর অপরজন শোনাল রাজপরিবারের সদস্যদের অধীনে চাকরি করার সুখ সুবিধার কথা।
রস্তভ বলল, আরে, রক্ষীবাহিনীর কথাই আলাদা! এখন কিছু মদ আনাও দেখি।
বরিস মুখটা বাঁকাল।
বলল, তুমি যদি সত্যি চাও।
বরিস বিছানার কাছে গিয়ে পরিষ্কার বালিশটার নিচ থেকে টাকার থলি বের করে মদ আনতে পাঠাল।
তারপর বলল, ও হ্যাঁ, তোমাকে দেবার জন্য আমার কাছে কিছু টাকা ও চিঠি আছে।
রস্তভ চিঠিটা নিল, টাকাটা সোফার উপর ছুঁড়ে দিয়ে দুই হাত টেবিলে রেখে পড়তে লাগল। কয়েক লাইন পড়তেই রাগত দৃষ্টিতে বের্গের দিকে তাকাল, তারপর তার চোখে চোখ পড়তেই চিঠির আড়ালে মুখ লুকাল।
ভারি থলেটার দিকে তাকিয়ে বের্গ বলল, আরে, ওরা বেশ মোটা টাকাই পাঠিয়েছে। আমাদের কথা যদি বল কাউন্ট, আমাদের বেতনের টাকাতেই চালাতে হয়। নিজের কথা তোমাকে বলতে পারি…
রস্তভ বলে উঠল, আমি বলছি বের্গ, বাড়ি থেকে যখন তোমার কোনো চিঠি আসে এখন নিজের এমন কোনো লোক আসে যার সঙ্গে তোমার অনেক কথা বলার থাকে, তখন আমি সেখানে হাজির থাকলে তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে সরে যাই।…যে কোনো জায়গায় যেখানে খুশি চলে যাও…উচ্ছন্নে যাও! চেঁচিয়ে কথাগুলি বলেই তৎক্ষণাৎ তার ঘাড়ে হাত রেখে প্রসন্ন দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের রুক্ষ স্বরকে নরম করার চেষ্টায় সে বলল, কষ্ট পেয়ো না ভাই, তুমি তো জান পুরোনো বন্ধুর কাছে আমি প্রাণ খুলেই কথা বলি।
ও কথা বল না কাউন্ট! আমি সব জানি, বের্গ বলল।
বরিস তাকে বলল, বাড়ির কর্তাদের কাছে যাও, তারা তোমাকে নেমন্তন্ন করেছে।
বের্গ সবচাইতে পরিষ্কার একটা কোট গায়ে চড়াল, কোটে একটা দাগ নেই, একবিন্দু ধুলো নেই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সম্রাট আলেক্সান্দারের মতো চুলগুলোকে কপাল থেকে উপরের দিকে ব্রাশ করে নিল, এবং কোটটা যে রস্তভের নজরে পড়েছে তার চাউনি থেকে সেটা বুঝতে পেরে স্মিত হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
চিঠি পড়তে পড়তে রস্তভ অস্ফুটে বলল, আহারে, আমি একটা জানোয়ার।
কেন?
আমি একটা শুয়োর, নইলে এতদিনে তাদের একটা চিঠি লিখিনি, তাদের এত ভয় পাইয়ে দিয়েছি। আঃ, আমি একটা শুয়োর! মুখ লাল করে সে আর একবার কথাটা বলল। ভালো, কথা, গেব্রিয়েলকে মদের জন্য পাঠিয়েছ তো? ঠিক আছে, একটু মদ খাওয়া যাক!
বাবা-মার চিঠির সঙ্গে ব্যাগ্রেশনের বরাবর একখানা প্রশংসাপত্র জুড়ে দেওয়া ছিল, আন্না মিখায়লভনার পরামর্শক্রমে কোনো পরিচিত লোক মারফৎ সেটা যোগাড় করে কাউন্টেস ছেলেকে পাঠিয়ে দিয়েছে, সে যেন প্রশংসাপত্রখানি যথাস্থানে পৌঁছে দেয় ও তার সদ্ব্যবহার করে।
যত সব বাজে! এ সবের আমার ঘোরাই দরকার! বলে রস্তভ কাগজটা টেবিলের নিচে ফেলে দিল।
ওটা ফেলে দিলে কেন? বরিস জিজ্ঞেস করল।
