নাতাশার আগের মন্তব্যে অসন্তুষ্ট হয়ে পেতয়া বলল, আমি জানি ও কেন লজ্জা পাবে। কারণ সেই চশমা-পরা মোটকার সঙ্গে ও প্রেমে পড়েছিল (নতুন কাউন্ট বেজুখভকে পেতয়া এইভাবেই বর্ণনা করে), আর এখন প্রেম করছে সেই গায়কের (নাতাশার ইতালিয় সঙ্গীত-শিক্ষক) সঙ্গে, তাই ওর এত লজ্জা!
পেতয়া, তুমি ভারি দুষ্ট! নাতাশা বলল।
একজন প্রধান ব্রিগেডিয়ারের ভঙ্গিতে নয় বছরের পেতয়া বলল, তোমার চাইতে বেশি দুষ্ট নই মাদাম। ডিনারের সময় আন্না মিখায়লভনার ইঙ্গিত থেকেই কাউন্টেস নিজের মনকে তৈরি করে নিয়েছে। নিজের ঘরে ফিরে একটা হাতল-চেয়ারে বসে নস্যদানির ঢাকনার উপর আঁকা ছেলের ছোট প্রতিকৃতিটির দিকে সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, দুই চোখ জলে ভরে উঠছে। চিঠিখানা হাতে নিয়ে আন্না মিখায়লভনা পা টিপে টিপে কাউন্টের দরজার কাছে এসে থামল।
বুড়ো কাউন্টও তার পিছনেই আসছিল, তাকে বাধা দিয়ে বলল, এখন নয়, পরে আসবেন। সে ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
কাউন্ট চাবির গর্তে চোখ রেখে কান পাতল।
প্রথমে অসংলগ্ন কিছু শব্দ, তারপর আন্না মিখায়লভনার দীর্ঘ একক বক্তৃতা, তারপর কান্না, নীরবতা, তারপর খুশি গলায় দুজনের কথা, তারপর পায়ের শব্দ। আন্না মিখায়লভনা দরজা খুলে দিল। একটা শক্ত অস্ত্রোপচার শেষ করে আসা সার্জনের গর্বিত ভঙ্গি তার মুখে।
বিজয়গর্বে কাউন্টেসকে দেখিয়ে সে কাউন্টকে বলল, কাজ শেষ! এক হাতে প্রতিকৃতিসহ নস্যদানি এবং অন্য হাতে চিঠিটা ধরে সে বসে আছে, একবার এটাকে আর একবার ওটাকে ঠোঁটে ছোঁয়াচ্ছে।
কাউন্টকে দেখে সে দুহাত বাড়িয়ে তার টাক মাথাটাকে জড়িয়ে ধরল, মাথার উপর দিয়ে আর একবার চিঠি ও ছবির দিকে তাকাল এবং পুনরায় সে দুটোকে ঠোঁটের উপর চেপে ধরবার জন্য টাক মাথাটাকে একটু ঠেলে সরিয়ে দিল। এবার ভেরা, নাতাশা, সোনিয়া ও পেতয়া ঘরে ঢুকল এবং চিঠি পড়া শুরু হল। যে অভিযানে ও দুটি যুদ্ধে সে অংশগ্রহণ করেছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে এবং তার পদোন্নতির উল্লেখ করে নিকলাস বাবা ও মার হাতে চুমো খাবার কথা জানিয়ে তাদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছে এবং ভেরা, নাতাশা ও পেতয়াকেও চুমো খেয়েছে। তাছাড়া মঁসিয় শেলিং, মাদাম শোস ও বুড়ি নার্সকে শুভকামনা জানিয়ে তাদের বলেছে তার হয়ে প্রিয় সোনিয়াকে চুমো খেতে, তাকে সে আগের মতোই ভালোবাসে, তার কথা ভাবে। একথা শুনে লজ্জায় সোনিয়ার চোখে জল এসে গেল, চারদিক থেকে সকলের দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে সে ছুটে নাচ-ঘরে চলে গেল, পূর্ণ গতিতে এমনভাবে ঘুরতে লাগল যে তার পোশাকটা বেলুনের মতো উড়তে লাগল, তারপর হাসতে হাসতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। কাউন্টেস তখনো কাঁদছে।
ভেরা জিজ্ঞেস করল, তুমি কাঁদছ কেন মামণি? সে যা লিখেছে তাতে তো খুশি হওয়া উচিত, কাঁদার কথা তো নয়।
কথাটা সত্যি, কিন্তু কাউন্ট, কাউন্টেস ও নাতাশা তিরস্কারের ভঙ্গিতে তার দিকে তাকাল। কাউন্টেস ভাবল, ও আবার কার পিছনে ঘুরছে?
নিকলাসের চিঠিটা একশোবারের বেশি পড়া হল, চিঠি শোনার উপযুক্ত বলে যাদের বিবেচনা করা হল তারা সকলেই কাউন্টেসের কাছে এসে শুনে গেল কারণ চিঠিটা হাত ছাড়া করতে সে নারাজ। শিক্ষকরা এল, নার্সরা এল, দিমিত্রি এল, এল আরো অনেক পরিচিত জন, কাউন্টেস প্রতিবারই নতুন আনন্দে চিঠি পড়ে শোনাল, আর প্রতিবারই চিঠিতে নিকোলেংকার নতুন নতুন গুণ আবিষ্কার করতে লাগল।
চিঠি পড়তে পড়তে সে বলে ওঠে, লেখার কী ভঙ্গি! বিবরণ কত আকর্ষণীয়! আর কী তার মন! নিজের সম্পর্কে একটা কথাও বলেনি… একটা কথাও না! এক দেনিসভ ও অন্য অনেকের কথা লিখেছে, কিন্তু আমি জোর গলায় বলতে পারি তাদের চাইতে সে অনেক বেশি সাহসী। নিজের দুঃখকষ্টের কথা কিছুই লেখেনি। কী অন্তঃকরণ! এ তো তারই উপযুক্ত! আর কী সুন্দর সকলকেই মনে রেখেছে। কাউকে ভোলনি। তার এতটুকু বয়স থেকে আমি এসেছি–সব সময় বলে এসেছি…
এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে প্রস্তুতি চলল, নিকলাসকে লেখা বাড়ির সকলের চিঠির খসড়া তৈরি করা হল, সেগুলি নকল করা হল, এবং কাউন্টেসের তত্ত্বাবধানে ও কাউন্টের উদারতায় নতুন পদোন্নত অফিসারের ইউনিফর্ম ও অন্যান্য জিনিসের জন্য টাকা তোলা হল। আন্না মিখায়লভনার চেষ্টার স্থির হল, চিঠি ও টাকা গ্র্যান্ড ডিউকের পত্রবাহক মারফৎ পাঠানো হবে বরিসকে, আর বরিস সেগুলি পাঠাবে নিকলাসকে। চিঠি লিখল বুড়ো কাউন্ট, কাউন্টেস, পেতয়া, ভেরা, নাতাশা ও সোনিয়া, আর শেষপর্যন্ত বুড়ো কাউন্ট ছেলেকে পাঠাল পোশাকের জন্য ছহাজার রুবল ও টুকিটাকি নানা জিনিস।
*
অধ্যায়-৭
১২ অক্টোবর তারিখে ওলমুজের সামনে শিবির ফেলে অবস্থানরত কুতুজভের সেনাবাহিনী পরিদর্শনের প্রস্তুতি, নিয়ে ব্যস্ত ছিল, রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার দুসম্রাট পরদিন বাহিনী পরিদর্শনে আসবে। রাশিয়া থেকে আগত রক্ষীবাহিনী ওলমুজ থেকে দশ মাইল দূরে রাত কাটিয়ে পরদিন সকাল দশটায় সোজা চলে আসবে ওলমুজ প্রান্তরে।
নিকলাস রস্তভ সেইদিনই বরিসের একটা চিঠি পেল, সে লিখেছে, ইসমালভ রেজিমেন্ট ওলমুজ থেকে দশ মাইল দূরে রাতের মতো ঘাটি পেতেছে, তার ইচ্ছা নিকলাস তার সঙ্গে দেখা করে, কারণ তার চিঠি ও টাকা এসেছে বরিসের কাছে। রশুভেরও তখনো টাকার খুবই দরকার, যুদ্ধক্ষেত্রে কিছুদিন কাটাবার পরে সৈন্যরা এখন ওলমুজে ঘাটি করেছে, অনেক রকম জিনিসপত্র নিয়ে ভাণ্ডারীরা শিবিরে এসে ভিড় জমিয়েছে, অস্ট্রিয় ইহুদিরা এসেছে নানারকম মনোহরী মালপত্র নিয়ে। অভিযানে নানারকম পুরস্কার পাওয়ায় পাভলোগ্রাদরা ভোজসভার পর ভোজসভা দিচ্ছে মাঝে মাঝেই, তারা ওলমুজে গিয়ে ক্যারোলিন নামক জনেক হাঙ্গেরিয়র সম্প্রতি ভোলা রেস্তোরাঁতে ভিড় করছে! মেয়েরাই সেখান খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করে। রস্তভও কর্নেলপদে উন্নীত হওয়া উপলক্ষে একটা ভোজসভার আয়োজন করেছে, দেনিসভের ঘোড়া বেদুইনকে কিনেছে এবং তার ফলে বন্ধুবান্ধব ও ভাণ্ডারীদের কাছে অনেকটা টাকা ধার করে বসেছে। বরিসের চিঠি পেয়েই একজন সহকর্মী অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে সে ওলমুজ-এর পথে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল, সেখানে আহারাদি সেরে, এক বোতল মদ গলায় ঢেলে পুরোনো খেলার সাথীর সঙ্গে দেখা করতে একাকি রক্ষী-শিবিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।
