ব্যঙ্গের হাসি হেসে প্রিন্স আন্দ্রু সরাসরি আন্না পাভলভনার মুখের দিকে তাকাল! Dieu me la donne, gare a qui la touche! (ঈশ্বর আমাকে এটি দিয়েছেন, কে এটিকে স্পর্শ করবে সে বিষয়ে তিনিই সাবধান হবেন!)রাজ্যাভিষেকের সময় বোনাপাৰ্তই কথাগুলি বলেছিল। সকলেই বলছে কথাগুলি সে ভালোই বলেছে। এই মন্তব্য করে প্রিন্স ইতালীয় ভাষাতে কথাগুলির পুনরাবৃত্তি করল, Dio mi la dona, gai a qui la tocca!
আশা করি গ্লাসটা ভরে উপচে পড়ার পক্ষে এটাই হবে শেষ জলের ফোঁটা, আন্না পাভলভনা বলতে লাগল। এই লোকটা সবকিছুর পক্ষে ক্ষতিকর কোনো রাষ্ট্র তাকে সহ্য করতে পারবে না।
রাষ্ট্র? আমি রাশিয়ার কথা বলছি না, বিনীত অথচ হতাশ গলায় ভাইকোঁত বলল, রাষ্ট্রের কথা মাদাম…চতুর্দশ লুইর জন্য, মাদাম এলিজাবেথের জন্য, তারা কি করেছে? কিছু না! ভাইকোঁত আরো উত্তেজিত হয়ে উঠল। আমার কথা বিশ্বাস করুন, বুরবনদের স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার উচিত পুরস্কার তারা পাচ্ছে। আরে, সেই পরস্পাপহারীকে পূজা করবার জন্য তারা তো রাষ্ট্রদূত পাঠাচ্ছে।
ঘৃণার সঙ্গে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে সে নড়েচড়ে বসল।
প্রিন্স হিপোলিৎ কিছুক্ষণ যাবৎ চশমার ভিতর দিয়ে ভাইকোঁতকে দেখছিল; হঠাৎ সে সম্পূর্ণভাবে ছোট প্রিন্সেসের দিকে ঘুরে গেল এবং একটা উঁচ চেয়ে টেবিলের উপর একটা কুল-চিহ্ন আঁকতে শুরু করল। এমন গুরুত্বের সঙ্গে সে ছোট প্রিন্সেসকে ব্যাপারটা বোঝাতে লাগল যেন সেই তাকে ওটা আঁকতে বলেছে। আসলে সে কতকগুলি অর্থহীন উদ্ভট কথা আওড়াতে লাগল।
ভাইকোঁত বলল, বোনাপার্ত যদি আরো একটি বছর ফ্রান্সের সিংহাসনে থাকে তাহলে অবস্থা আরো অনেক দূর গড়াবে। ষড়যন্ত্র, হিংসা, নির্বাসন ও মৃত্যুদণ্ডের পথ ধরে ফরাসি সমাজ–আমি বলতে চাই সৎ ফরাসি সমাজ–চিরদিনের মতো ধ্বংস হয়ে যাবে, আর তারপরে…।
ঘাড় ঝাঁকুনি দিয়ে সে হাত দুটো বাড়িয়ে ধরল। কথাগুলি ভালো লাগায় পিয়ের কি যেন বলতে চেয়েছিল, কিন্তু আন্না পাভলভনার নজর ছিল তার উপর; সে তাকে বাধা দিল।
রাজ-পরিবারের উল্লেখমাত্রেই তার গলায় যে বিষণ্ণতার সুর বেজে ওঠে সেই সুরে সে বলে উঠল, সম্রাট আলেক্সান্দার ঘোষণা করেছেন, ফরাসি জনগণ কোন ধরনের সরকার বেছে নেবে সেটা তিনি তাদের উপরেই ছেড়ে দেবেন; আর আমার বিশ্বাস, একবার সেই পরস্বাপহারীর হাত থেকে মুক্তি পেলে সমগ্র জাতি নিশ্চয় প্রকৃত রাজার কোলেই ফাঁপিয়ে পড়বে।
সেটা সন্দেহজনক, প্রিন্স আন্দ্রু বলল। মঁসিয় লা ভাইকোঁত যথার্থই ধরেছেন যে ইতিমধ্যেই ব্যাপারটা অনেকদূর গড়িয়েছে। আমি তো মনে করি, পুরনো শাসন-ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া কঠিন হবে।
পিয়ের মুখ লাল করে আলোচনায় বাধা দিয়ে বলে উঠল, আমি যতদূর শুনেছি, প্রায় সব অভিজাত লোকরা ইতিমধ্যেই বোনাপার্তের দলে ভিড়ে পড়েছে।
পিয়েরের দিকে না তাকিয়েই ভাইকৌত বলল, বোনাপার্তের সমর্থকরাই একথা বলে। এই মুহূর্তে ফরাসি জনমতের প্রকৃত অবস্থা বোঝা শক্ত।
ব্যঙ্গের হাসি হেসে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, বোনাপার্তও তাই বলে।
ভাইকেতের দিকে তাকিয়ে কথাগুলি না বললেও স্পষ্টই বোঝা যায় যে লোকটিকে সে পছন্দ করে না, আর তাকে লক্ষ্য করেই সে মন্তব্যটা করেছে।
কিছু সময় চুপ করে থেকে প্রিন্স আন্দ্রু নেপোলিয়নের কথারই উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে লাগল, আমি তাদের গৌরবের পথ দেখালাম, কিন্তু তারা সে পথে গেল না। আমি বৈঠকখানা খুলে দিলাম, তারা সেখানেই ভিড় করল। এ কথা বলবার হক তার ছিল কিনা আমি জানি না।
মোটেই ছিল না, ভাইকোঁত জবাব দিল। ডিউকের হত্যার পরে তার অতিবড় পক্ষপাতীও তাকে করে বীর বলে মনে করত না। যদি বা আগে সে কারো কারো কাছে বীর সেজেছিল, ডিউকের হত্যার পরে স্বর্গে বেড়ে গেছে একজন শহীদ, আর মর্তে কমে গেছে একজন বীর।
আন্না পাভলভনা ও অন্যরা একটু হেসে ভাইকেতের মন্তব্যকে প্রশংসা করবার আগেই পিয়ের আবার আলোচনায় বাধা দিল। আন্না পাভলভনা জানত যে সে কোনো অনুপযুক্ত কথাই বলবে, তবু তাকে থামাতে পারল না।
সঁসিয় পিয়ের জোর গলায় বলল, রাজনীতির বিচারে দুক দ এনঝিনের হত্যা ছিল একান্ত প্রয়োজন; আমার তো মনে হয়, সে কাজের সম্পূর্ণ দায়িত্বটা নিজের কাঁধে নিতে ভয় করে নেপোলিয়ন আত্মিক মহত্ত্বেরই পরিচয় দিয়েছে।
অনুচ্চ ভয়ার্ত স্বরে আন্না পাভলভনা বলে উঠল, ঈশ্বর! হে আমার ঈশ্বর!
হেসে সেলাইটাকে হাতের কাছে টেনে নিয়ে ছোট প্রিন্সেস বলল, সে সিয় পিয়ের…আপনি কি মনে করেন হত্যার ভিতর দিয়ে প্রকাশ পায় আত্মিক মহত্ত্ব?
হায়! হায়! কয়েকজন সোচ্চারে বলল।
চমৎকার! প্রিন্স হিপোলিৎ ইংরেজিতে বলল; তারপর হাতের তালু দিয়ে হাঁটু বাজাতে লাগল।
ভাইকোঁত শুধুমাত্র ঘাড় ঝাঁকুনি দিল। পিয়ের চশমার উপর দিয়ে গম্ভীরভাবে শ্রোতাদের দিকে তাকিয়ে আবার বলতে লাগল, আমি তাই বলছি, কারণ জনসাধারণকে অরাজকতার মধ্যে ফেলে রেখে বুরবনরা বিপ্লবের কাছ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল; একমাত্র নেপোলিয়নই বিপ্লবকে বুঝতে পেরেছিল, তাকে শান্ত করেছিল, আর তাই সকলের মঙ্গলের জন্য একটি মানুষের জীবন বাঁচাতে মাঝপথে থেমে যায় নি।
আপনি এবার অন্য টেবিলে চলুন না? আন্না পাভলভনা বলল।
