আন্না মিখায়লভনা তার পাশে বসল, নিজের রুমাল দিয়ে তার চোখের জল মুছিয়ে দিল, চিঠির উপর যে চোখের জল পড়েছিল তাও মুছিয়ে দিল, তারপর নিজের চোখ মুছে কাউন্টকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। স্থির হল, ডিনারের সময় থেকে চায়ের সময় পর্যন্ত সে কাউন্টেসের মনকে ঠিক করে তারপর চায়ের পরে ঈশ্বরকে সহায় করে তাকে খবরটা জানাবে।
ডিনারে বসে আন্না মিখায়লভনা সারাক্ষণ যুদ্ধের খবর ও নিকোলেংকার খবরের কথাই বলতে লাগল, দুবার জিজ্ঞাসা করল তার শেষ চিঠি কবে এসেছে, আর সঙ্গে সঙ্গে বলল যে আজ হয়তো তার একটা চিঠি আসতে পারে। এসব শুনে কাউন্টেস যেই মাত্ৰ উৎকণ্ঠিতভাবে কাউন্ট ও আন্না মিখায়লভনার দিকে তাকাতে থাকে তখনই সে সুকৌশলে আজেবাজে কথা পেড়ে বসে। নাতাশা কিন্তু অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। এদের কথাবার্তার ভাবভঙ্গি থেকে তার নিশ্চিত ধারণা হল যে তার বাবা ও আন্না মিখায়লভনা একটা কিছু গোপন করতে চাইছে। আর সেটা নিশ্চয় তার দাদার প্রসঙ্গে। ডিনার শেষ হতে না হতেই সে আন্না মিখায়লভনার পিছু পিছু ছুট দিল এবং ছোট বসবার ঘরটায় তাকে ধরে ফেলে একেবারে তার কাঁধের উপর ঝুলে পড়ল।
মিষ্টি খালা, আমাকে বল কি হয়েছে?
কিছু তো হয়নি মামণি।
না, না, মিষ্টি খালা, মধু খালা, আমি তোমাকে ছাড়ছি না–আমি জানি তুমি কিছু জান।
আন্না মিখায়লভনা মাথা নাড়তে লাগল।
তুমি দেখছি খুব চালাক, সে বলল।
আন্না মিখায়লভনার মুখের দিকে তাকিয়েই নাতাশা চেঁচিয়ে বলল, নিকোলেংকার চিঠি এসেছে। আমি জোর করে বলতে পারি।
ঈশ্বরের দোহাই, খুব সাবধান, তুমি তো বোঝ একথা শুনলে তোমার মার অবস্থা কি হবে।
আমি জানি, তবু আমাকে বল! বলবে না? বেশ, তাহলে আমি এখনই গিয়ে বলে দিচ্ছি।
নাতাশা কাউকে বলবে না এই শর্তে আন্না মিখায়লভ অল্প কথায় চিঠির মর্ম তাকে বলে দিল।
কথা দিচ্ছি কাউকে বলব না, ক্রুশ-চিহ্ন এঁকে নাতাশা বলল। কাউকে বলব না। সঙ্গে সঙ্গে সে এক দৌড়ে সোনিয়ার কাছে চলে গেল।
বিজয়গর্বে সে ঘোষণা করে দিল, নিকোলেংকা…আহত হয়েছে…একটা চিঠি।
নিকলাস! বলেই সোনিয়া সঙ্গে সঙ্গে একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
দাদার আহত হবার সংবাদ শুনে সোনিয়ার এই অবস্থা দেখে সংবাদের দুঃখের দিকটা এই প্রথম সে অনুভব করল।
সোনিয়ার কাছে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে সে নিজেও কাঁদতে শুরু করল।
আঘাত সামান্য, কিন্তু তাকে অফিসার করা হয়েছে, এখন সে ভালো আছে, নিজেই চিঠি লিখেছে, চোখের জল ফেলতে ফেলতে সে বলল।
বড় বড় পা ফেলে ঘরময় পায়চারি করতে করতে পেতয়া বলে উঠল, এই দেখ! দেখছি তোমরা মেয়েরা সব্বাই কাঁদুনে খুকি। আমি কিন্তু খুব খুশি হয়েছি, দাদার এই উন্নতির কথা শুনে সত্যি খুশি হয়েছি। তোমরা শুধু কাঁদতেই জান, কিছু বোঝ না।
নাতাশা চোখের জলের মধ্যেও হেসে ফেলল।
তুমি তো চিঠিটা পড়নি? সোনিয়া জিজ্ঞেস করল।
না, কিন্তু খালা বলেছে সব ঠিক হয়ে গেছে, আর এখন সে একজন অফিসার।
কুশ-চিহ্ন এঁকে সোনিয়া বলল, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! কিন্তু খালা হয়তো তোমাকে ধোকা দিয়েছে। চল মামণির কাছে যাই।
পেতয়া কিছুক্ষণ নিঃশব্দে পায়চারি করে একসময় বলে উঠল, নিকোলেংকার জায়গায় যদি আমি হতাম তাহলে আরো অনেক বেশি ফরাসিকে মেরে ফেলতাম। তারা তো সব ঘৃণ্য জানোয়ার! আমি তাদের এত বেশি মারতাম যে মৃতদেহের স্কুপ হয়ে যেত।
চুপ কর পেতুয়া, কি হাঁসের মতো প্যাঁক-প্যাঁক করছ!
পেতয়া বলল, হাঁস আমি নই, যারা তুচ্ছ ব্যাপারে কাঁদে তারাই হাঁস।
একমুহূর্ত চুপ করে থেকে নাতাশা হঠাৎ প্রশ্ন করল, তার কথা তোমার মনে আছে? সোনিয়া হাসল।
নিকলাসকে মনে আছে কি না?
তা নয় সোনিয়া, কিন্তু তার সবকিছু ঠিক ঠিক মনে আছে কি না? একটা বিশেষ ভঙ্গি করে নাতাশা বলল। নিকোলেংকাকে আমারও মনে আছে, ভালোভাবেই মনে আছে। কিন্তু বরিসের কথা মনে নেই। তাকে একটুও মনে পড়ে না।
সে কি! বরিসকে তোমার মনে পড়ে না? সোনিয়া সবিস্ময়ে বলল।
মনে পড়ে না তা ঠিক নয়–তার চেহারাটা মনে আছে, কিন্তু নিকোলেংকাকে যেভাবে মনে আছে ঠিক তেমনটি নয়। তাকে–চোখ বুজলেই দেখতে পাই, কিন্তু বরিস…না! (সে চোখ বন্ধ করল) না! কিছু নেই।
আঃ, নাতাশা! উম্মসভরে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে সোনিয়া বলে উঠল।
দুটি বিস্মিত চোখ তুলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নাতাশা সোনিয়ার দিকে তাকাল, মুখে কিছুই বলল না। সোনিয়ার মনের কথা সে জানে, সে তার দাদাকে ভালোবাসে। এ ভালোবাসার অভিজ্ঞতা আজও নাতাশার হয়নি। সে বিশ্বাস করে ভালোবাসা আছে, কিন্তু বুঝতে পারে না।
তুমি কি তাকে চিঠি লিখবে? নাতাশা জিজ্ঞেস করল।
সোনিয়াকে চিন্তিত দেখাল। নিকলাসকে কি লিখবে, লেখা উচিত কি না, এইসব প্রশ্ন তাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে। আজ সে অফিসার হয়েছে, আহত নায়ক হয়েছে, তাকে এখন নিজের কথা বলা, স্বেচ্ছায় স্বীকৃত দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া কি ঠিক হবে?
সলজ্জভাবে জবাব দিল, আমি জানি না। মনে করি, সে যদি লেখে তো আমিও লিখব।
তাকে চিঠি লিখতে তোমার লজ্জা করবে না?
সোনিয়া হাসল।
না।
আর আমার কিন্তু বরিসকে চিঠি লিখতে লজ্জা করবে। আমি লিখছি না।
লজ্জা করবে কেন?
তা জানি না। ব্যাপারটা যেন কেমন, আমার লজ্জা করবে।
