আনাতোলের মুখের ভাব দেখে মনে হল সে যেন বলতে চায় : কে ওখানে? কিসের জন্য? একমুহূর্ত অপেক্ষা কর! প্রিন্সেস মারি নিঃশব্দে তাদের দিকে তাকাল। সে ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। অবশেষে মাদময়জেল বুরিয়ে আর্তনাদ করে দৌড়ে পালিয়ে গেল। প্রিন্সেস মারির দিকে তাকিয়ে আনাতোল মৃদু হেসে মাথা নোয়াল, যেন এই অদ্ভুত ঘটনা দেখে তাকেও হাসতে বলল, তারপর কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে তার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
একঘন্টা পরে তিখোন এল প্রিন্সেস মারিকে ডাকতে, সে আরো জানাল যে প্রিন্স ভাসিলিও সেখানে আছে। তিখোন ঘরে ঢুকে দেখল, প্রিন্সেস মারি তার সোফায় বসে ক্রন্দনরতা মাদময়জেল বুরিয়েকে জড়িয়ে ধরে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। গভীর মমতা ও করুণাময় বিগলিত উজ্জ্বল দুটি সুন্দর চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
না প্রিন্সেস, তোমার স্নেহ আমি চিরদিনের মতো হারিয়েছি, মাদময়জেল বুরিয়ে বলল।
প্রিন্সেস মারি বলল, তা কেন? আমি তোমাকে আগের চাইতেও বেশি ভালোবাসি, আর তোমার সুখের জন্য সবকিছুই করতে চেষ্টা করব।
কিন্তু তুমি আমাকে ঘৃণা কর। তোমার হৃদয় পবিত্র, তাই কামনার টানে মানুষ যে কতদূর যেতে পারে। তা তুমি বুঝতে পারবে না।
বিষণ্ণ হাসি হেসে প্রিন্সেস মারি বলল, আমি খুব বুঝতে পারি। তুমি শান্ত হও। আমি বাবার কাছে যাচ্ছি। সে বেরিয়ে গেল।
প্রিন্স ভাসিলি পায়ের উপর পা তুলে দিয়ে একটা নস্য-দানি হাতে নিয়ে বসেছিল। তার মুখে গভীর আবেগের হাসি। এমন সময় প্রিন্সেস মারি ঢুকল। সেও তাড়াতাড়ি একটিপ নস্য নিল।
উঠে দাঁড়িয়ে প্রিন্সেস মারির হাত দুটি ধরে বলে উঠল, এই যে সোনা আমার, এস। তারপর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার ছেলের ভাগ্য এখন তোমার হাতে। তোমাকে তো চিরদিন মেয়ের মতোই দেখে এসেছি, এবার তুমি মনস্থির করে ফেল।
সে ফিরে দাঁড়াল, তার চোখে সত্যিকারের অশ্রুবিন্দু।
ফ্র…ফ্র…, প্রিন্স বলকনস্কির নাকের শব্দ হলে। প্রিন্স তোমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করছেন তার ছাত্রের মানে তার ছেলের নামে। তুমি কি প্রিন্স আনাতোল কুরাগিনের স্ত্রী হতে চাও, না চাও না? জবাব দাও, হ্যাঁ কি না, তবেই আমার নিজের মতামত আমি জানাব। প্রিন্স ভাসিলির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার অনুরোধভরা দৃষ্টির জবাবে সে আবার বলল, হ্যাঁ। আমার মতামত, একমাত্র আমার মতামত। বল, হ্যাঁ কি না?
বাবা, আমার ইচ্ছা কোনোদিন তোমাকে ছেড়ে যাব না, তোমার জীবন থেকে আমার জীবনকে আলাদা করব না। আমি বিয়ে করতে চাই না, সুন্দর চোখ দুটি মেলে প্রিন্স ভাসিলি ও বাবার দিকে তাকিয়ে সে স্পষ্ট জবাব দিল।
ফাঁকি! অর্থহীন! ফাঁকি, ফাঁকি ফাঁকি! প্রিন্স বলকনস্কি চেঁচিয়ে উঠল। মেয়ের হাত দুটি চেপে ধরল, কিন্তু তাকে চুমো খেল না, শুধু নিজের কপালটাকে তার কপালের কাছে নিয়ে আস্তে চুঁইয়ে দিল, আর হাতটাকে এত জোরে চাপ দিল যে মেয়ে আর্তনাদ করে উঠল।
প্রিন্স ভাসিলি উঠে পড়ল।
সোনা আমার, আমাকে বলতেই হবে যে এই মুহূর্তটিকে আমি ভুলব না, কোনোদিন ভুলব না। কিন্তু সোনা, কিছু আশাও কি তুমি আমাকে দেবে না? অন্তত বল হয়তো…ভবিষ্যৎ তো অনেক দীর্ঘ। বল, হয়তো।
প্রিন্স, যা আমার অন্তরের কথা তাই আপনাকে বলেছি। আপনার প্রস্তাবের জন্য ধন্যবাদ কিন্তু আমি কোনোদিই আপনার পুত্রবধূ হব না।
বুড়ো প্রিন্স বলল, তাহলে তো ও পাট শেষই হয়ে গেল। আপনার দেখা পেয়ে খুব খুশি হয়েছি। খুব খুশি! প্রিন্সেস, তোমার ঘরে যাও। যাও! প্রিন্স ভাসিলিকে আলিঙ্গন করে সে পুনরায় বলল, আপনার দেখা পেয়ে খুব খুশি হয়েছি।
প্রিন্সেস মারি ভাবতে লাগল, আমার কর্তব্য সম্পূর্ণ পৃথক। অন্য এক ধরনের সুখ, ভালোবাসা ও আহোসর্গের যে সুখ তার ভিতর দিয়ে সুখী হওয়াই আমার আদর্শ। যে মূল্যই দিতে হোক, বেচারি এমেলির সুখের ব্যবস্থা আমি করব। আমাকে সে কত ভালোবাসে, আজ তার অনুতাপের অন্ত নেই। তাদের দুজনের বিয়ের জন্য আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব। যুবকটি যদি ধনী না হয়, আমি তাকে অর্থ দেব, বাবাকে বলব, আন্দ্রুকে বলব। সে যখন এই যুবকের স্ত্রী হবে তখন আমি খুব খুশি হব। সে বড় ভাগ্যহীনা, অপরিচিতা, একলা, অসহায়! যে ঈশ্বর, আজকের কথা ভুলতে পারলে সে আমাকে কত না ভালোবাসবে! হয়তো আমিও এই করতাম!… প্রিন্সেস মারি ভাবতে লাগল।
*
অধ্যায়-৬
অনেকদিন হয়ে গেল রস্ত পরিবারের কাছে নিকলাসের কোনো খবর আসেনি। অবশেষে শীতের মাঝামাঝি সময়ে কাউন্টের হাতে এল একটা চিঠি, ছেলের নিজের হাতে তার ঠিকানা লেখা। চিঠিটা পেয়েই সকলের নজর এড়াবার জন্য সভয়ে অতিদ্রুত পা টিপেটিপে সে তার পড়ার ঘরে ঢুকল, দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে চিঠিটা পড়তে শুরু করল।
আন্না মিখায়লভনা এ বাড়ির সব খবরই জানতে পারে। চিঠি এসেছে শুনেই সে মৃদু পায়ে ঘরে ঢুকে দেখল, চিঠি হাতে নিয়ে কাউন্ট যুগপত কাঁদছে ও হাসছে।
নিজের অবস্থার উন্নতি হলেও আন্না মিখায়লভনা এখনো রস্তভদের বাড়িতেই আছে।
সহানুভূতি জানাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে সে বিষণ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে বন্ধু?
কাউন্ট আরো বেশি করে কেঁদে উঠল।
নিকোলেংকা (নিকলাসের আদরের নাম)… একটা চিঠি…আ…হ…ত…হয়েছে…আদরের খোকা… কাউন্টেস অফিসার পদে উন্নতী হয়েছে.. ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ছোট কাউন্টেসকে কেমন করে বলব!
