বুড়ো প্রিন্স জানে, সে যদি মেয়েকে বলে দেয় যে সে ভুল করছে, আনাতোল চাইছে মাদময়জেল বুরিয়ের সঙ্গে পূর্বরাগ জমাতে, তাহলেই প্রিন্সেস মারির আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগবে আর তারও কার্যোদ্ধার হবে। এই কথা ভেবে মনকে শান্ত করে সে তিখোনকে ডেকে পোশাক খুলতে লাগল।
তিখোন যখন তার শুকনো বুড়ো শরীর আর পাকা চুলে ভর্তি বুকটাতে নাইট-শার্ট পরাতে ব্যস্ত তখন সে ভাবতে লাগল, কেন যে মরতে ওরা এখানে এসেছে। আমি তো নেমন্তন্ন করে আনিনি। তারা এসে আমার জীবনটাকে বিরক্তিতে ভরে তুলেছে–আর সে জীবনের কয়দিনই বা বাকি আছে।
ওরা উচ্ছন্নে যাক! শার্টে মাথাটা ঢাকা অবস্থায়ই সে বলে উঠল।
মনিবের এই সোচ্চার চিন্তার ব্যাপারটা তিখোনের জানা আছে, তাই সহজভাবেই সে মনিবের ক্রুদ্ধ মুখের দিকে তাকাল।
শুতে গেছে কি? প্রিন্স জিজ্ঞেস করল।
সব ভালো খানসামার মতোই তিখোনও মনিবের চিন্তার হদিস রাখে। সে ধরেই নিল যে মনিব প্রিন্স ভাসিলি ও তার ছেলের কথাই বলছে।
তারা দুজনই শুতে গেছেন, আর ঘরের বাতি নিভিয়ে দিয়েছেন ইয়োর অনার।
বাজে…বাজে… দ্রুত লয়ে কথা বলতে বলতে প্রিন্স চটিতে পা গলিয়ে দিল এবং ড্রেসিং-গাউনের আস্তিনে হাত ঢুকিয়ে ঘুমোবার কোচটির দিকে এগিয়ে গেল।
মুখে কোনো কথা না হলেও আনাতোল ও মাদময়জেল বুরিয়ে নিজেদের পূর্বরাগের প্রথম অংশের কথা ভালোই বুঝেছে, তারা বুঝতে পেরেছে, দুজনের মধ্যে একান্তে আরো অনেক কথা হওয়া দরকার। তাই তারা সকাল থেকেই দুজন একত্র হবার সুযোগ খুঁজছে। যথাসময়ে প্রিন্সেস মারি যখন তার বাবার ঘরে ঢুকল তখন মাদময়জেল বুরিয়ে ও আনাতোল সবজি-ঘরে গিয়ে মিলিত হল।
সেদিন সকালে বুড়ো প্রিন্সে মেয়ের সঙ্গে খুবই সস্নেহ ও সদয় ব্যবহার করল। কিন্তু বাবার মুখের এই কষ্টের ভাব প্রিন্সেস মারি ভালোই জানে। তার মুখের এই ভাব সে অনেক দেখেছে-সে যখন গণিতের কোনো অংক বুঝতে পারত না তখন এমনি মুখ করে বাবা শুকনো হাত দিয়ে তার হাতটা চেপে ধরত, একই কথা বারবার বলতে বলতে চেয়ার থেকে উঠে হাঁটতে থাকত।
সে ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে অস্বাভাবিক হাসি হেসে বুড়ো প্রিন্স বলল, তোমার ব্যাপারে একটা প্রস্তাব এসেছে। আশা করি তুমি বুঝতে পেরেছে যে আমার সুন্দর চোখের জন্য প্রিন্স ভাসিলি তার ছাত্র আনাতোলকে (যে কারণেই হোক প্রিন্স বলকনস্কি আনাতোলকে ছাত্র বলে উল্লেখ করল) সঙ্গে নিয়ে এখানে আসেননি। গত রাতে তিনি তোমার বিয়ের প্রস্তাব করেছেন, আর আমার রীতিনীতি তো তুমি জানই, তাই সে প্রস্তাব আমি তোমার কাছে রাখছি।
প্রথমে বিবর্ণ ও পরে লাজারক্ত হয়ে প্রিন্সেস বলল, তোমার ইচ্ছা কি বাপি?
আমার ইচ্ছা কি! বাবা রেগে বলল। পুত্রবধূ হিসেবে প্রিন্স ভাসিলির তোমাকে পছন্দ হয়েছে, তাই তার ছাত্রের পক্ষ থেকে তোমার কাছে প্রস্তাব করেছেন। ব্যাপার তো এই! আমার ইচ্ছা কি!…সেটাই তো আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি!
প্রিন্সেস অস্ফুটে বলল, তুমি কি ভাবছ তা তো আমি জানি না বাবা।
আমি? আমি? আমার কথা কেন? আমাকে ছেড়ে দাও। বিয়েটা তো আমার হচ্ছে না। তোমার কথা কি? সেটাই আমি জানতে চাই।
প্রিন্সেস বুঝল এ ব্যাপারে তার বাবার সায় নেই, কিন্তু সেইমুহূর্তেই তার মনে হল যে এখনই যদি তার ভাগ্য নির্ধারিত না হয়তো আর কখনো হবে না।
আপনার ইচ্ছামতো কাজ করতেই আমি চাই, তবে যদি আমার ইচ্ছাই ব্যক্ত করতে হয়… সে কথা শেষ করতে পারল না। বুড়ো প্রিন্স বাধা দিল।
চমৎকার। সে চেঁচিয়ে উঠল। সে তোমাকে নেবে যৌতুকসহ, আর মাদময়জেল বুরিয়েকে নেবে ফাউ হিসেবে। সেই হবে স্ত্রী, আর তুমি…।
প্রিন্স থামল। মেয়ের উপর এই কথাগুলির ফল সে দেখতে পেল। মেয়ে মাথা নিচু করল। এখনই তার চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়বে।
প্রিন্স বলল, আরে, আরে, আমি তো ঠাট্টা করছিলাম। একটা কথা মনে রেখো প্রিন্সেস, স্বামী নির্বাচনের পরিপূর্ণ অধিকার মেয়ের আছে–এই নীতিই আমি সমর্থন করি। আমি তোমাকে স্বাধীনতা দিলাম। শুধু মনে রেখো, তোমার সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করছে তোমার জীবনের সুখ। আমার কথা ভেবো না।
কিন্তু আমি তো বুঝতে পারছি না বাবা!
আমার বলার তো কিছু নেই। সে হুকুম পেয়েছে, তোমাকে হোক যাকে হোক বিয়ে করবে, কিন্তু পছন্দ করে নেবার স্বাধীনতা তোমার আছে।…তোমার ঘরে যাও, ভালো করে ভেবে দেখ, আর এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে এসে তার সামনেই আমাকে বলে দাও :্যা কি না। আমি জানি এ নিয়ে তুমি প্রার্থনা করতে বসবে। ইচ্ছা হয় প্রার্থনা করো, কিন্তু ভালো করে ভেবে দেখো। যাও! হ্যাঁ কি না, হ্যাঁ কি না, হ্যাঁ কি না! কুয়াশার মধ্যে পথ হারাবার মতো অনিশ্চিত পা ফেলে প্রিন্সেস পড়ার ঘর থেকে চলে গেল।
তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে, ভালোই হয়েছে। কিন্তু মাদময়জেল বুরিয়ে সম্পর্কে তার বাবা যা বলল সেটা যে ভয়ংকর। কথাটা অবশ্যই মিথ্যা, তবু বড় ভয়ংকর, সে চিন্তাটাকে সে মন থেকে সরাতে পারল না। কোনোদিকে না তাকিয়ে কোনো কিছুতে কান না দিয়ে সে সোজা চলে যাচ্ছিল সবজিঘরের ভিতর দিয়ে, এমন সময় হঠাৎ মাদময়জেল বুরিয়ের পরিচিত ফিস ফিস গলা শুনে সে সজাগ হয়ে উঠল। চোখ তুলে দুপা দূরেই দেখতে পেল, আনাতোল ফরাসিনীকে জড়িয়ে ধরে তার কানে কানে কি যেন বলছে। আতংকিত মুখে আনাতোল প্রিন্সেস মারির দিকে তাকাল, কিন্তু মাদময়জেল বুরিয়ে এখনো তাকে দেখতে পায়নি, সেও সঙ্গে সঙ্গেই তার কোমর থেকে হাত তুলে নিল না।
