বুড়ো যুদ্ধের ঘোড়া যেমন ভেরির বাজনা শুনলেই টগবগিয়ে ওঠে, ছোট প্রিন্সেসও নিজের অবস্থা ভুলে সম্পূর্ণ অচেতনভাবেই পরিচিত পূর্বরাগের জোর কদমের তালিম দিতে শুরু করল। কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য বা আত্মদ্বন্দ্বের প্রেরণায় নয়, সরল ও হাল্কা আমোদের ছলেই সে ছলাকলায় মন দিল।
আনাতোল যদিও নারীসমাজে বহু-আকাক্ষিত ক্লান্ত পুরুষের ভূমিকাই গ্রহণ করে থাকে, তবু তিনটি নারীর উপর তার প্রভাব লক্ষ্য করে সে গর্বে ডগমগ হয়ে উঠল। তাছাড়া, সুন্দরী ও উত্তেজনাময়ী মাদময়জেল বুরিয়ের প্রতি তার মনে জাগতে শুরু করেছে সেই দুর্বার পাশবিক কামনা যা তাকে সহসা গ্রাস করে বসবে এবং অত্যন্ত রূঢ় বেপরোয়া কাজের পথে তাকে টেনে নিয়ে যাবে।
চায়ের পরে সকলে বসবার ঘরে গেল, আর সেখানে প্রিন্সেস মারিকে ক্লাভিকউ (বাদ্যযন্ত্র) বাজাতে বলা হল। আনাতোল খোশ মেজাজে হাসতে হাসতে এগিয়ে গিয়ে তার মুখোমুখি এবং মাদময়জেল বুরিয়ের পাশে কনুইতে ভর দিয়ে দাঁড়াল। তার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রিন্সেস মারির মনে জাগল বেদনাময় আনন্দের অনুভূতি। তার প্রিয় সোনাতা তাকে নিয়ে গেল এক অতিপরিচিত কাব্যের জগতে, আনাতোলের চোখের দৃষ্টি সে জগৎকে করে তুলল আরো কাব্যময়। কিন্তু আনাতোলের চোখ তার উপরে থাকলেও তার মন ছিল মাদময়জেল বুরিয়ের ছোট্ট পা-খানির গতিবিধির উপর, ক্লাভিকর্ডের নিচ দিয়ে সে তখন নিজের পা দিয়ে মাদময়জেল বুরিয়ের পা-খানি ছুঁয়েছিল। মাদময়জেল বুরিয়েও তাকিয়ে আছে প্রিন্সেস মারির দিকে, কিন্তু তার মধুর দুটি চোখে তখন ফুটে উঠেছে যে বেদনাময় আনন্দ ও আশা সেটা প্রিন্সেসের কাছে একান্তই নতুন।
প্রিন্সেস মারি ভাবল, সে আমাকে কত ভালোবাসে। এখন আমি কত সুখী, আর এরকম একটি বন্ধুকে নিয়ে, স্বামীকে নিয়ে আমি কত সুখীই না হতে পারব! স্বামী? তা কি সম্ভব হবে?
নৈশভোজনের পরে সকলের যখন শুতে যাবার সময় হল তখন আনাতোল প্রিন্সেস মারির হাতে চুমা খেল। প্রিন্সেস মারি জানে না এ-সাহস সে কোথায় পেল, কিন্তু একখানি সুন্দর মুখ যখন তার স্বপ্ন-দৃষ্টি চোখ দুটির কাছে এগিয়ে এল তখন সে সোজাসুজি সেই মুখের দিকে তাকাল। প্রিন্সেস মারির কাছ থেকে সরে গিয়ে আনাতোল মাদময়জেল বুরিতেঁর হাতে চুমা খেল। (এটা শিষ্টাচারসম্মান নয়, কিন্তু সব কাজই সে করে সরলভাবে, নিশ্চয়তার সঙ্গে। মাদময়জেল বুরিয়ে লাজারক্ত হয়ে সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে প্রিন্সেসের দিকে তাকাল।
প্রিন্সেস ভাবল, কী বিনয়! আমার প্রতি এমেলির (মাদময়জেল বুরিয়ে) অকৃত্রিম স্নেহ ও অনুরাগের কোনো মূল্য না দিয়ে আমি তাকে ঈর্ষা করব, একথা তার পক্ষে ভাবাও কি সম্ভব? তার কাছে এগিয়ে গিয়ে গভীর আবেগে তাকে চুমো খেল। হোট প্রিন্সেসকে চুমো খাবার জন্য আনাতোল তার দিকে এগিয়ে গেল।
না! না! না! তোমার বাবা যখন আমাকে চিঠি লিখে জানাবেন যে তোমার স্বভাব ভালো হয়েছে তখনই তোমাকে আমার হাতে চুমো খেতে দেব। তার আগে নয়! ছোট প্রিন্সেস বলে উঠল। হেসে আনাতোলকে লক্ষ্য করে একটা আঙুল তুলে সে ঘর থেকে চলে গেল।
*
অধ্যায়-৫
সকলে যার যার মতো চলে গেল। বিছানায় শোয়ামাত্রই আনাতোল ঘুমিয়ে পড়ল, কিন্তু বাকি সকলেই সে রাতটা অনেকক্ষণ জেগে কাটাল।
এই যে লোকটি অপরিচিত হয়েও এত সদয়-হা, সদয় হওয়াটাই বড় কথা-সে কি সত্যি আমার স্বামী হবে-এই কথাটা ভাবতেই প্রিন্সেস মারির মনে ভয় দেখা দিল। চারদিকে তাকাতেও তার ভয়–তার মনে হল যেন ঘরের অন্ধকার কোণে পর্দার আড়ালে একজন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সেই একজন সে-শয়তান–আবার শাদা কপাল, কালো ভুরু ও লাল ঠোঁটের এই মানুষটিও সে।
ঘন্টা বাজিয়ে দাসীকে ডাকল, তাকে বলল তার ঘরে এসে ঘুমোতে। সেই রাতে মাদময়জেল বুরিয়ে বৃথাই একজনের প্রত্যাশায় দীর্ঘ সময় সবজি-ঘরে পায়চারি করে বেড়াল। ছোট প্রিন্সেস দাসীকে বকুনি দিল, বিছানাটা ঠিকমতো করা হয় নি। না উপুড় হয়ে না এক পাশে কোনোভাবেই সে শুতে পারছে না। যেভাবে পোবার চেষ্টা করছে তাতেই অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। ড্রেসিং-গাউন ও রাত-টুপি পরে সে একটা হাতল-চেয়ারে বসে রইল, আর ঘুম-ঘুম চোখে গজগজ করতে করতে কাতি তৃতীয়বার তার পালকের বিছানাটা ঠিকঠাক করে দিল।
ছোট প্রিন্সেস আরো একবার বলল, তোমাকে তো বলেছি, বিছানার কোথাও ফুলে উঠেছে, কোথাও নিচু হয়েছে। আমি তো ঘুমতে পারলেই খুশি হই, কাজেই দোষটা আমার নয়। ক্রন্দনমুখী। শিশুর মতো তার গলাটা কাঁপছে।
বুড়ো প্রিন্সও ঘুমতে পারল না। আধা ঘুমের মধ্যে তিখোন শুনতে পেল, সে সক্রোধে ঘরময় পায়চারি করছে আর গড় গড় করছে। তার মনে হচ্ছে, মেয়ের জন্য সে অপমানিত হয়েছে। সে অপমান তাকে আরো বেশি বেজেছে কারণ অপমানটা তার নয়, তার মেয়ের, আর সেই মেয়েকে সে নিজের অধিক ভালোবাসে। সে বারবার নিজেকে বলতে লাগল, সমস্ত ব্যাপারটা ভেবে দেখতে হবে, কোনটা ঠিক আর তার কি করা উচিত তাও স্থির করতে হবে, কিন্তু তার বদলে সে ক্রমাগত উত্তেজিত হয়ে উঠতে লাগল।
প্রথম একটা পুরুষ মানুষকে দেখল-অমনি বাবাকে ভুলে গেল, সবকিছু ভুলে গেল, ছুটে উপরে গিয়ে চুল বেঁধে ল্যাজ নাড়তে লাগল, আর একেবারেই বদলে গেল! বাবাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েই খুশি! আর সে জানে যে সবই আমার নজরে পড়ে! ফ্র..ফ্র..ফ্র…! আমি কি দেখতে পাচ্ছি না যে সে বোকাটার নজর পড়েছে। বুরিতেঁর উপরতাকে এবার তাড়াতে হবে। আর এটা বুঝবার মতো আত্মমর্যাদাও কি তার নেই? নিজের মর্যাদাবোধ যদি নাও থাকে, আমার মর্যাদাটাও তো রাখতে হবে। তাকে চোখ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে যে ওই মুখখুটা তার কথা মোটেই ভাবছে না, সে আছে বুরিয়ের তালে। না, তার কোনো মর্যাদাবোধই নেই…কিন্তু আমি তাকে দেখিয়ে দেব…
