ছোট প্রিন্সেস সলজ্জভাবে বাধা দিয়ে বলল, দোষটা আমার।
পুত্রবধূর সামনে মাথাটা নুইয়ে প্রিন্স বলকনস্কি বলল, তুমি যা খুশি তাই করতে পার, কিন্তু ও তো নিজেকে তোমার হাতের পুতুল বানাতে পারে না, এমনিতেই তো ও শাদাসিদে মানুষ।
মেয়ের দিকে আর না তাকিয়ে সে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল, মেয়েটির চোখে জল এসেছে।
প্রিন্স ভাসিলি বলল, বরং আমি তো দেখছি এই চুল বাঁধাটা প্রিন্সেসকে খুব ভালো মানিয়েছে।
প্রিন্স বলকনস্কি আনাতোলের দিকে ঘুরে বলল, এই যে তরুণ প্রিন্স, তোমার নামটা কি? এদিকে এস, তোমার সঙ্গে কথা বলি, পরিচয় করি।
হেসে বুড়ো প্রিন্সের পাশে বসে আনাতোল ভাবল, এই খেল শুরু হল।
দেখ বাপু, শুনেছি তুমি বিদেশে শিক্ষা পেয়েছ, তোমার বাবা ও আমার মতো ডিয়েনের কাছে লিখতে ও পড়তে শেখনি। এখন বল তো বাপু, তুমি কি অশ্বারোহী রক্ষীবাহিনীতে কাজ করছ?
কোনোরকমে হাসি চেপে আনাতোল বলল, না, আমাকে শিবিরে বদলি করা হয়েছে।
আঃ! খুব ভালো কথা। তাহলে বাবা, জারকে ও দেশকেই তো তুমি সেবা করতে চাও? এখনো যুদ্ধের সময়। আচ্ছা, তুমি কি সীমান্তে যাচ্ছ?
না প্রিন্স, আমাদের রেজিমেন্ট সীমান্তে চলে গেছে, কিন্তু আমি যুক্ত রয়েছি…কিসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি বাপি? হেসে বাবার দিকে ফিরে আনাতোল বলল।
চমৎকার সৈনিক, চমৎকার! আমি কিসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি! হা হা, হা! প্রিন্স বলকনস্কি হেসে উঠল। আরো জোরে হেসে উঠল আনাতোল। হঠাৎ প্রিন্স বলকনস্কির চোখে ভ্রুকুটি দেখা দিল।
তুমি যেতে পার, সে আনাতোলকে বলল।
আনাতোল হেসে মহিলাদের মধ্যে চলে গেল।
আপনি তো ওকে বিদেশে লেখাপড়া শিখিয়েছেন, তাই না প্রিন্স ভাসিলি? বুড়ো প্রিন্স প্রশ্নটা করল।
আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি, আর আপনাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি যে সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের চাইতে অনেক ভালো।
হ্যাঁ, আজকাল সবকিছুই অন্যরকম হয়ে গেছে, সবকিছুই বদলে গেছে। ছেলেটি খুব সুন্দর। খুব সুন্দর, এখন আমার সঙ্গে আসুন। প্রিন্স ভাসিলির হাত ধরে বুড়ো প্রিন্স নিজের পড়ার ঘরে নিয়ে গেল। ঘরে যখন শুধু তারাই দুজন তখনই প্রিন্স ভাসিলি তার আশা ও বাসনার কথা জানাল।
বুড়ো প্রিন্স সক্রোধে বলল, আপনি কি মনে করেন আমি মেয়েকে বাধা দেব, তাকে ছাড়া থাকতে পারব না? কী যে ধারণা সব! বিয়ের জন্য আমি কালই প্রস্তুত! শুধু বলতে চাই, আমার জামাকে আমি ভালো করে জানতে চাই। আমার নীতি তো আপনি জানেন–সবকিছুই খোলাখুলি! আপনার সামনেই কাল মেয়েকে জিজ্ঞেস করব, মেয়ে যদি রাজি থাকে তো আপনার ছেলে এখানে থাকুক। সে থাকুক, আমিও সবকিছু দেখি। নাক ঝাড়ার শব্দ করে বুড়ো প্রিন্স আরো বলল সে বিয়ে করুক না, আমার কাছে সবই সমান! নিজের ছেলের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় যে মর্মভেদী স্বর ফুটেছিল তার গলায় সেইরকম আর্তস্বরেই সে কথাটা বলল।
এরকম একজন তীক্ষ্ণদৃষ্টির মানুষের কাছে চালাকি করে কোনো ফল হবে না বুঝতে পেরে প্রিন্স ভাসিলি বলল, সব কথাই খোলাখুলিভাবে আপনাকে বলব। আপনি তো সবই বোঝেন, মানুষের ভিতরটা পর্যন্ত আপনি দেখতে পান। আনাতোল প্রতিভাধর নয়, কিন্তু সে সৎ ও উদার অন্তঃকরণের ছেলে, পুত্র হিসেবে, আত্মীয় হিসেবে সে চমৎকার।
ঠিক আছে, ঠিক আছে, দেখাই যাক।
যেসব নারী দীর্ঘদিন পুরুষসমাজ থেকে দূরে থাকে তাদের বেলায় সাধারণত যা ঘটে থাকে এক্ষেত্রেও তাই ঘটল, আনাতেলের আবির্ভাবে প্রিন্স বলকনস্কির পরিবারের তিনটি নারীরই মনে হল, এতদিন তারা সত্যিকারের জীবনের স্বাদ পায়নি। তাদের চিন্তার, অনুভূতির ও পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা সঙ্গে সঙ্গে দশগুণ বেড়ে গেল, তাদের যে জীবন এতদিন কেটেছে অন্ধকারে, সহসা তা উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে পরিপূর্ণ তাৎপর্যের উজ্জ্বল আলোয়।
নিজের মুখ ও চুল বাঁধার কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেল প্রিন্সেস মারি। যে লোকটি তার স্বামী হতে পারে তার সুন্দর চিন্তায় সে বিভোর হয়ে রইল। তার মনে হল, এই মানুষটি দয়ালু, সাহসী, স্থিরসংকল্প, পুরুষোচিত ও উদার। সে বিষয়ে তার মনে কোনো সন্দেহ নেই। তার কল্পনায় ভেসে বেড়াতে লাগল অনাগত পারিবারিক জীবনের হাজার স্বপ্ন। সে তাদের মন থেকে তাড়িয়ে দিল, লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করল।
প্রিন্সেস ভাবল, কিন্তু আমি কি তার প্রতি বড় বেশি উদাসীন হইনি? আমি গম্ভীর হতে চেষ্টা করছি, কারণ অন্তরের গভীরে ইতিমধ্যেই আমি তার বড় বেশি কাছে এসে পড়েছি, কিন্তু আমার মনের কথা তো সে জানতে পারবে না, হয়তো ভাববে আমি তাকে পছন্দ করি না।
প্রিন্সেস মারি নতুন অতিথিটির প্রতি সদয় হতে চেষ্টা করল, কিন্তু পেরে উঠল না। আনাতোল ভাবল, বেচারি, মেয়েটি জঘন্য রকমের কুৎসিত!
মাদময়জেল বুরিয়ের চিন্তা অন্যরকমের। প্রিন্স বলকনস্কির বাড়িতে সারাজীবন কাটাবার ইচ্ছা তার মোটেই নেই। অনেকদিন ধরে সে অপেক্ষা করে আছে কবে একটি রুশ প্রিন্স এসে তাকে একনজর দেখেই এই শাদাসিদে, বিশ্রী সাজসজ্জার রুশ প্রিন্সেসটির তুলনায় তার শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করতে পারবে, তার প্রেমে পড়বে এবং তাকে নিয়ে চলে যাবে, আর অবশেষে এই তো এসেছে সেই রুশ প্রিন্স-এসেছে গল্পের রাজপুত্র। সে তাকে নিয়ে যাবে, তাকে বিয়ে করবে। আনাতোলের সঙ্গে প্যারিস শহর নিয়ে আলোচনার মুহূর্ত থেকেই এই ভবিষ্যৎ জীবনের ছবি তার মাথায় ঢুকেছে। তার মনেও বাসনা জাগল আনাতোলকে খুশি করবে, আর যথাসম্ভব সেই চেষ্টাই সে করতে লাগল।
