হোট প্রিন্সেস ফরাসিতে প্রিন্স ভাসিলিকে বলল, প্রিয় প্রিন্স, এখানে অন্তত আপনাকে একান্তভাবে আমাদের মধ্যে পেয়েছি। আনেতের প্রীতিভোজ থেকে কিন্তু আপনি সর্বদাই পালিয়ে বেড়াতেন। প্রিয় আনেৎকে নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে?
ওঃ, কিন্তু আনেতের মতো তুমিও আবার রাজনীতির কথা শুরু করবে না তো!
আর আমাদের সেই ছোট্ট চায়ের আসর!
ওঃ, হ্যাঁ।
হোট প্রিন্সেস আনাতোলকে জিজ্ঞাসা করল, আপনি কেন কখনো আনেতের বাড়ি যেতেন না? একটা চতুর কটাক্ষে হেসে সে বলল, আহা আমি জানি, আমি জানি। আপনার ভাই হিপোলিৎ আমাকে সব বলেছে। আহা, এমন কি প্যারিসে আপনার কাণ্ড-কারখানার কথাও আমি শুনেছি।
প্যারিসের কথা শুনেই মাদময়জেল বুরিয়ে সুযোগ মতো আলোচনায় যোগ দিল। সে জানতে চাইল, আনাতোল কি অনেক দিন হল প্যারিস ছেড়ে এসেছে, আর সে শহরটাই বা তার কেমন লেগেছে। আনাতোল সঙ্গে সঙ্গে এই ফরাসিনীর কথার জবাব দিল এবং সহাস্যে তার দিকে তাকিয়ে তার স্বদেশ সম্পর্কে নানা কথা বলতে লাগল। সুন্দরী বুরিয়েকে দেখে আনাতেলের মনে হল, বন্ড হিলস তাহলে খুব একঘেয়ে লাগবে না। তাকে ভালো করে দেখে নিয়ে ভাবল, মোটেই খারাপ নয়! এই ছোট্ট সঙ্গিনীটি মোটেই খারাপ নয়। আশা করি আমাদের বিয়ের পরে প্রিন্সেস একেও সঙ্গে নিয়ে যাবে, এই ছোট্ট সুন্দরীটি মনোহারিণী বটে!
বুড়ো প্রিন্স তার পড়ার ঘরে ধীরে সুস্থে সাজগোজ করতে লাগল, চোখ কুঁচকে ভাবতে লাগল, সে কি করবে। এই দুটি অতিথির আগমনে সে বিরক্তি হয়েছে। প্রিন্স ভাসিলি ও তার ছেলে আমার কে প্রিন্স ভাসিলি একটা বাজে দাম্ভিক লোক, অবশ্য তার ছেলেটি ভালো। যে অমীমাংসিত প্রশ্নটাকে সে সব সময় চেপে রাখতে চেয়েছে, নিজেকে সব সময় ঠকিয়েছে, এদের দুজনের আগমনে সেই প্রশ্নটা নতুন করে তার মনে জেগেছে বলেই তার এত রাগ। প্রশ্নটা হল, সে কি কোনোদিন মেয়েকে বিদায় দিয়ে স্বামীর ঘরে পাঠাতে পারবে। প্রিন্স কখনো প্রশ্নটাকে সরাসরি নিজের কাছে করেনি, কারণ সে জানে তাকে উচিত জবাবই দিতে হবে, আর সে উচিত জবাব যে শুধু তার মনকেই আঘাত করবে তাই নয়, আঘাত করবে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনার মূলে। তার কাছে প্রিন্সেস মারির মূল্য যত অল্পই হোক, তবু তাকে ছাড়া বেঁচে থাকার কথা সে যে ভাবতেই পারে না। সে ভাবতে লাগল, আর সে বিয়ে করবে কেন? অসুখী যে হবে সেটা তো নিশ্চিত। এই তো লিজার বিয়ে হয়েছে আন্দ্রুর সঙ্গে-আজকের দিনে তারচাইতে একটি ভালো স্বামীর কথা ভাবাই যায় না–কিন্তু নিজের ভাগ্য নিয়ে সে কি খুশি? আর ভালোবেসে মারিকে বিয়ে করবে কে? কথাটা তো যেমন সরল তেমনি অদ্ভুত! তার উচ্চ বংশ ও সম্পত্তির কথা ভেবেই তারা তাকে গ্রহণ করবে। পৃথিবীতে কি অবিবাহিতা নারী কেউ নেই, আর তারা কি সুখী নয়? পোশাক পরতে পরতে প্রিন্স বলকনস্কি এই কথাগুলি ভাবছিল, অথচ যে প্রশ্নটিকে সে এতদিন চাপা দিয়ে রেখেছিল আজ তার জবাব দেবার সময় এসেছে। বিয়ের প্রস্তাব করতেই প্রিন্স ভাসিলি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে, আজ হোক কাল হোক, সে তো একটা জবাব চাইবেই। তার জন্ম তার সামাজিক মর্যাদা তো খারাপ নয়। এর বিরুদ্ধে আমার কিছু বলার নেই, প্রিন্স নিজের মনেই বলল, কিন্তু আমার মেয়ের যোগ্য হতে হবে। আর সেটাই আমাদের ভালো করে দেখতে হবে।
সেটাই আমাদের দেখতে হবে। সেটাই আমাদের দেখতে হবে! সে উচ্চকণ্ঠে বারবার বলতে লাগল।
যথারীতি সতর্ক পদক্ষেপে দ্রুত চারদিকে তাকাতে তাকাতে সে বসবার ঘরে ঢুকল। ছোট প্রিন্সেসের পোশাকের পরিবর্তন, মাদময়জেল বুরিয়ের ফিতে, প্রিন্সেস মারির বেমানান কেশ-বিন্যাস, মাদময়জেল বুরিয়ে ও আনাতোলের হাসি, আর চারপাশের কলগুঞ্জনের মধ্যে তার মেয়ের নিঃসঙ্গতা-এ সবকিছুই তার দৃষ্টি এড়াল না। বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে সে ভাবল, কেমন বোকার মতো সেজেছে! ওর লজ্জা নেই, আর ছেলেটিকেও উপেক্ষা করেছে!
সে সোজা প্রিন্স ভাসিলির দিকে এগিয়ে গেল।
আরে! কেমন আছেন? কেমন আছেন? আপনাকে দেখে খুশি হলাম!
প্রিন্স ভাসিলি তার স্বভাবসিদ্ধ দ্রুত, আত্মবিশ্বাসে ভরা সুরে বলল, বন্ধুত্বের টান দূরত্বকে উপহাস করে। এই আমার দ্বিতীয় পুত্র, দয়া করে তাকে ভালোবাসবেন, তার বন্ধু হবেন।
প্রিন্স বলকনস্কি আনাতোলকে ভালো করে দেখতে লাগল।
বলল, বড় ভালো ছেলে! বড় ভালো ছেলে! এসেছ, আমাকে চুমো খাও। সে গালটা বাড়িয়ে দিল।
আনাতোল বৃদ্ধকে চুমো খেল, কৌতূহল ও পরিপূর্ণ ধৈর্যের সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল, বাবার মুখে তার যেসব খামখেয়ালের কথা শুনেছে না জানি কতক্ষণে সেগুলো প্রকাশ পাবে।
প্রিন্স বলকনস্কি সোফার এককোণে তার নির্দিষ্ট জায়গায় বসে একটা হাতল-চেয়ার টেনে নিয়ে প্রিন্স ভাসিলিকে ইঙ্গিতে বসতে বলে নানা রাজনৈতিক ব্যাপার ও সংবাদ সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করতে লাগল। প্রিন্স ভাসিলির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেও সে বারবার প্রিন্সেস মারির দিকে তাকাতে লাগল।
প্রিন্স ভাসিলির শেষের কথাগুলির পুনরাবৃত্তি করে সে বলল, তাহলে তারা ইতিমধ্যেই পটসডাম থেকে লিখতে শুরু করেছে? তারপরই হঠাৎ সে মেয়ের কাছে চলে গেল।
বলল, তুমি কি অতিথিদের জন্যই এরকম সেজেছ, অ্যাঁ? ভালো, খুব ভালো! অতিথিদের জন্য তুমি নতুন কেতায় চুল বেঁধেছ, তাই তাদের সামনেই বলছি, ভবিষ্যতে আমার অনুমতি ছাড়া তুমি কখনো তোমার সাজগোজের পরিবর্তন করতে পারবে না।
