একটু দূর থেকে প্রিন্সেস মারিকে নজর করে লিজা বলল, সত্যি ভাই, তোমার এ পোশাকটা মোটেই ভালো নয়। তোমার যে লাল রঙের পোশাকটা আছে সেটা আনাও। সত্যি! তুমি তো বোঝ তোমার গোটা ভাগ্যই এর উপর নির্ভর করছে। কিন্তু এ পোশাকটা বড় বেশি হাল্কা, তোমাকে ঠিক মানাচ্ছে না।
কিন্তু লাল পোশাকটা পরিয়ে চুল বাঁধার ঢং বেশ খানিকটা পাল্টে দেবার পরেও ব্যবস্থাটা তার ঠিক মনঃপুত হল না। দুই হাত এক করে সে বলল, না, এটাও চলবে না। না মারি, এ পোশাকটাও তোমাকে মানাচ্ছে না। তোমার সেই রোজকার পরার ছোট ধূসর পোশাকটাই ভালো মনে হচ্ছে। দয়া করে সেটাই পর। কাতি, যাও তো প্রিন্সেসের ধূসর পোশাকটা নিয়ে এস। তুমি দেখো মাদময়জেল বুরিয়ে, কী রকম একখানা সাজিয়ে দি।
কিন্তু কাতি যখন নির্দিষ্ট পোশাকটা এনে দিল প্রিন্সেস মারি তখনো আয়নার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইল, আয়নার মধ্যেই সে দেখতে পেল, তার চোখ দুটি জলে ভরে উঠেছে, মুখটা কাঁপছে, যে কোনো সময় সে কান্নায় ভেঙে পড়বে।
মাদময়জেল বুরিয়ে বলল, এদিকে এস তো প্রিন্সেস মারির কাছে গিয়ে বলল, দেখে নিও, এবার একটা মানানসই অথচ সহজ সরল সাজেই তোমাকে সাজিয়ে দেব।
প্রিন্সেস মারি বলল, না, আমাকে রেহাই দাও।
তার কণ্ঠস্বরে এতখানি গাম্ভীর্য ও বিষণ্ণতা ফুটে উঠল যে অন্যদের তরল কণ্ঠের কলকাকলি তৎক্ষণাৎ থেমে গেল। বড় বড়, চিন্তাৰিত ও অপূর্ণ সুন্দর চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে তারা বুঝতে পারল যে এ নিয়ে আর পীড়াপীড়ি করা নিরর্থক, নিষ্ঠুরতাও বটে।
ছোট প্রিন্সেস বলল, অন্তত কেশ-বিন্যাসটি পাল্টে নাও! মাদময়জেল বুরিয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আগেই বলিনি, এ ধরনের চুলবাঁধা মারির মুখে মানায় না। মোটেই মানায় না! দয়া করে ওটা বদলে দাও।
চোখের জল না ফেলবার আপ্রাণ চেষ্টা করে জবাব এল, আমাকে ছেড়ে দাও, দয়া করে আমাকে ছেড়ে দাও। আমার কাছে সবই সমান।
মাদময়জেল বুরিয়ে ও ছোট প্রিন্সেস দুজনই নিজেদের কাছে স্বীকার করল যে এ সাজে প্রিন্সেস মারিকে স্বাভাবিক অবস্থার চাইতেও খারাপ দেখাচ্ছে, কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। চিন্তাৰিত, বিষণ্ণ যে-দৃষ্টিতে সে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে তাকে তারা চেনে। প্রিন্সেস মারির মুখের এই ভাব দেখে তারা ভয় পেল না, কিন্তু তারা জানে যে এ ভাব যখন তার মুখে ফুটে ওঠে তখন সে মূক হয়ে যায়, তাকে কোনোমতেই সংকল্পচ্যুত করা যায় না।
লিজা বলল, তুমি কি এটা পাল্টাবে না? প্রিন্সেস মারি কোনো জবাব না দেওয়াতে সে ঘর থেকে চলে গেল।
প্রিন্সেস মারি ঘরে একা রইল। অসহায়ভাবে হাত দুটো ঝুলিয়ে চোখ নিচু করে বসে সে ভাবতে লাগল। তার কল্পনায় ভেসে উঠল একটি শক্তিমান, প্রভাবশালী, আশ্চর্য সুন্দর পুরুষের ছবি যে হবে তার স্বামী, তার সঙ্গে সে যেন চলে গেল এক খুশির জগতে। একটি শিশুর ছবি ফুটে উঠল তার কল্পনায়, তার নিজের সন্তান–আগেরদিন যেমনটি সে দেখেছিল তার নার্সের মেয়ের কোলে রয়েছে তার কোলে, আর পাশে দাঁড়িয়ে স্বামী তাদের দুজনকে দেখছে। অমনি তার মনে হল, না, এ অসম্ভব, আমি যে বড় বেশি কুৎসিত।
দরজায় দাসীর গলা শোনা গেল, দয়া করে চা খেতে আসুন। প্রিন্স এখনই তার ঘর থেকে বের হবেন।
সে উঠে দাঁড়াল। নিজের চিন্তায় নিজেই শংকিত হল। নিচে নামবার আগে সে পাশের ঘর গেল। সেখানে সব দেবমূর্তি ঝোলানো রয়েছে। ত্রাণকর্তার একটি বড় মূর্তির কালো মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দুই হাত জোড় করে সে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। একটা বেদনার্ত সন্দেহে তার মন ভরে উঠল। ভালোবাসার আনন্দ কি তার ভাগ্যে আছে? বিয়ের কথা ভাবতে গেলেই প্রিন্সেস মারি সুখের স্বপ্ন দেখে, সন্তানের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু অন্তরের গভীরে যে প্রবল বাসনাকে সে লুকিয়ে রেখেছে তার লক্ষ্য পার্থিব ভালোবাসা। নিজের কাছ থেকে, অন্যের কাছ থেকে এই বাসনাকে সে যতই লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করছে ততই সেটা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সে বলল, হে ঈশ্বর, অন্তরের এই শয়তানী লোভকে আমি কেমন করে চেপে মারব? শান্তির পথে তোমার ইচ্ছাকে পূর্ণ করবার জন্য এই নিচ কল্পনাকে আমি কেমন করে চিরতরে পরিত্যাগ করতে পারব? প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গেই ঈশ্বর তার মনের মধ্যেই একটা উত্তরও দিয়ে দিল। নিজের জন্য কিছুই কামনা করো না, কিছুই খুঁজো না, উদ্বেগ বা ঈর্ষাকে মনে স্থান দিও না। মানুষের ভবিষ্যৎ আর তোমার ভাগ্য তোমার কাছে লুকানোই থাকবে, কিন্তু সব সময় সবকিছুর জন্য প্রস্তুত থেকো। বিবাহের কর্তব্য পালনের ভিতর দিয়ে তোমাকে পরীক্ষা করাই যদি ঈশ্বরের ইচ্ছা হয়, তো তাঁর সেই ইচ্ছা পূর্ণ করতে প্রস্তুত থেকো। মনের মধ্যে এই সান্ত্বনার বাণী শুনে প্রিন্সেস মারি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্রুশ-চিহ্ন এঁকে নিচে নেমে গেল, নিজের গাউন বা চুল-বাধার কথা, অথবা কেমন করে সে চলবে ও কি কথা বলবে সে-কথাও সে একবারও ভাবল না। আর যে ঈশ্বরের চেষ্টায় ভিন্ন মানুষের মাথার একটা চুলও পড়তে পারে না, তার ইচ্ছার তুলনায় এ সবের মূল্যই বা কতটুকু?
*
অধ্যায়-৪
প্রিন্সেস মারি নিচে নেমে দেখল বসবার ঘরে প্রিন্স ভাসিলি ও তার ছেলে ছোট প্রিন্সেস ও মাদময়জেল বুরির্টের সঙ্গে কথা বলছে। ভারী পা ফেলে সে ঘরে ঢুকতেই ভদ্রলোক দুটি ও মাদময়জেল বুরিয়ে উঠে দাঁড়াল, আর ছোট প্রিন্সেস তাকে দেখিয়ে ভদ্রলোকদের বলল : এই হল মারি। প্রিন্সেস মারি সকলকেই বেশ ভালোভাবেই দেখল। দেখল প্রিন্স ভাসিলির মুখ, প্রথমে গম্ভীর, কিন্তু একটু পরেই মুখে হাসি, মারি অতিথিদের মনের উপর কতটা দাগ কাটতে পেরেছে সেইদিকেই ছোট প্রিন্সেসের কড়া নজর। সে দেখল, মাদময়জেল বুরির্টের ফিতে বাঁধা মুখ অস্বাভাবিক উজ্জ্বল দৃষ্টি যুবকটির উপর নিবদ্ধ, কিন্তু সে নিজে তাকে দেখতে পাচ্ছে না, সে শুধু দেখল একটা মস্তবড়, উজ্জ্বল ও সুন্দর কিছু তার দিকে এগিয়ে আসছে। প্রথমে এগিয়ে এল প্রিন্স ভাসিলি, প্রিন্সেস মারি তার ঝুঁকে-পড়া টাকওয়ালা কপালে চুমো খেল, আর তার প্রশ্নের উত্তরে জানাল যে তাকে তার ভালোভাবেই মনে আছে। তারপর এগিয়ে এল আনাতোল। এখনো সে তাকে দেখতে পেল না। শুধু অনুভব করল একটা নরম হাত তার হাতটাকে চেপে ধরল আর সে একটি শাদা কপালে তার ঠোঁট দুটি ছোঁয়াল, সে কপালের উপরকার হাল্কা বাদামি রঙের চুলে পমেডের গন্ধ। তার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে প্রিন্সেস মারি তার রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। ইউনিফর্মের একটা বোতামের নিচে ডান হাতের বুড়ো আঙুলটি রেখে সে দাঁড়িয়ে আছে, প্রশস্ত বুক, পিঠটা একটু বাঁকানো, একটা পা ঈষৎ দোলাতে দোলাতে মাথাটাকে একটু নুইয়ে উজ্জ্বল মুখে সে প্রিন্সেসের দিকে তাকাল, কিন্তু কোনো কথা বলল না, বরং মনে হল তার কথা সে ভাবছেই না। আনাতোল খুব তাড়াতাড়ি কিছু বুঝতে পারে না, আলাপ-পরিচয়ের ব্যাপারেও সে পটু নয়। প্রিন্সেস সেটা বুঝতে পেরে তার বাবার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু আসর জমিয়ে তুলল ছোট প্রিন্সেস লিজা। প্রিন্সে ভাসিলির কাছে গিয়ে সে চপলতার সঙ্গে এমন সব পুরোনো ঠাট্টা ও মজার স্মৃতির উল্লেখ করতে লাগল যা কোনোদিন ঘটেনি। আনাতোলকেও সে এই আলোচনায় ডেকে আনল। মাদময়জেল বুরিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিল। এমন কি প্রিন্সেস মারিও এবার পিছিয়ে রইল না।
