সপ্রশ্ন সুরে সে বলল।– হুম! হিজ এক্সেলেন্সি খুব দেমাকি অথচ আমিই তার চাকরি করে দিয়েছিলাম। প্রিন্স ঘৃণার সঙ্গে বলল।
তার ছেলে যে কেন আসছে বুঝতে পারছি না। হয়তো প্রিন্সেস এলিজাবেথ ও প্রিন্সেস মারি জানে। কেন যেন যে সে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আসছে তা তো জানি না। তাকে আমি চাই না। (লজ্জিত মেয়ের দিকে তাকাল) আজ কি তোমার শরীর খারাপ! অ্যাঁ? আলপাতিচ আজ সকালে যাকে মন্ত্রী বলে উল্লেখ করেছে তার জন্য ভয় পেয়েছ নাকি?
না বাপি। ডিনার শেষ করে প্রিন্স পুত্রবধূকে দেখতে গেল। হোট প্রিন্সেস একটা ছোট টেবিলের পাশে বসে দাসী মাশার সঙ্গে গল্প করছিল। শ্বশুরকে দেখে তার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল।
সে অনেক বদলে গেছে। সুন্দরী হওয়ার পরিবর্তে তার চেহারা এমন সাদাসিদে হয়ে গেছে। গাল বসে গেছে, ঠোঁট ঠেলে উঠেছে, আর চোখ নেমে এসেছে।
প্রিন্স তখন জানতে চাইল তার শরীর কেমন আছে তখন সে বলল, হ্যাঁ, একটা কষ্ট হচ্ছে।
তোমার কি কিছু দরকার আছে?
না তো।
ঠিক আছে, ঠিক আছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে প্রিন্স বিশ্রাম-ঘরে গেল, সেখানে আলপাতিচ মাথা নিচু করেই দাঁড়িয়েছিল।
বেলচা মেরে সব বরফ আবার পথে ছড়ানো হয়েছে কি?
হ্যাঁ ইয়োর এক্সেলেন্সি। ঈশ্বরের দোহাই, আমাকে ক্ষমা করুন… ওটা আমারই বোকামি।
বাধা দিয়ে প্রিন্স বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে, তারপর অস্বাভাবিক উচ্চ হাসি হেসে হাতটা আলপাতিচের দিকে বাড়িয়ে দিল চুমো খাবার জন্য, তারপর পড়ার ঘরের দিকে চলে গেল।
সেই সন্ধ্যায়ই প্রিন্স ভাসিলি এল। পথেই কোচয়ান ও পরিচারক তার সঙ্গে দেখা সরল এবং ইচ্ছা করে ছড়িয়ে রাকা বরফের উপর দিয়ে হৈহৈ করতে করতে তার স্লেজটাকে টেনে নিয়ে গেল।
প্রিন্স ভাসিলি ও আনাতোলের জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করা হল।
ওভারকোটটা খুলে রেখে আনাতোল কোণের একটা টেবিলে দুই হাত মুড়ে বসে হাসিমুখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার মনে হল, সারা জীবনটাই একটা অবিরাম আনন্দের ব্যাপার, যে কারণেই হোক কেউ না কেউ তার জন্য সে আনন্দের যোগান দিয়েই যাবে। একজন রুক্ষপ্রকৃতির বৃদ্ধ আর একটি ধনবতী কুৎসিত উত্তরাধিকারিণীর সঙ্গে দেখা করতে আসাটাকেও সে সেই দৃষ্টিতে দেখছে। সবকিছুই হয়তো একটা মজার ব্যাপার হয়ে উঠবে। সে ভাবল, মেয়েটি যখন এত টাকার মালিক তখন তাকে বিয়ে করতে আপত্তি কিসের? ক্ষতি তো কিছু হবে না।
সে দাড়ি কামাল, অভ্যাস মতোই সযত্নে ও সুচারুরূপে গন্ধ মাখল এবং সুন্দর মাথাটা উঁচু করে স্বাভাবিক বিজয়ীর ভঙ্গিতে বাবার ঘরে ঢুকল। প্রিন্স ভাসিলির দুটি খানসামা তার সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত, ছেলেকে দেখে
সে খুশি মনে ঘাড় নাড়ল, যেন বলতে চাইল, হা, তোমাকে এইরকম দেখতেই আমি চাই।
যেন পূর্ব আলোচনার জের টেনেই আনাতোল প্রশ্ন করল, ঠাট্টা নয় বাবা, সত্যি আমি জানতে চাইছি, মেয়েটি কি কদাকার?
খুব হয়েছে! কী বাজে কথা বলছ! যাই কর, বুড়ো প্রিন্সের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় সাবধান থেকো, শ্রদ্ধাশালী হয়য়া।
প্রিন্স আনাতোল বলল, হৈচৈ বাধালে আমি কিন্তু কেটে পড়ব। ঐ সব বুড়োদের আমি সইতে পারি না, হ্যাঁ।
মনে রেখো, এর উপরেই তোমার সবকিছু নির্ভর করছে।
এদিকে দাসীমহলে সকলেই জেনে গেছে যে মন্ত্রী ও ছেলে পৌঁছে গেছে, তাদের চেহারার ছবি নিয়ে খুঁটিনাটি বর্ণনাও চলেছে। প্রিন্সেস মারি নিজের ঘরে একলা বসে বৃথাই মনের উত্তেজনা চাপবার চেষ্টা করছে।
আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ওরা কেন চিঠি লিখল, লিজাই বা এ-কথা আমাকে বলল কেন? এখন আমি বসবার ঘরে ঢুকব কেমন করে? তাকে যদি পছন্দও হয় তবু তো তার সামনে আমি সহজ হতে পারব না। বাবার চাউনির কথা মনে হতেই সে ভয়ে সারা হল। ছোট প্রিন্সেস ও মাদময়জেল বুরিয়ে ইতিমধ্যেই দাসী মাশার কাছ থেকে মন্ত্রীপুত্রের সব খবরই পেয়ে গেছে-সে কি সুন্দর, গোলাপি গাল, ঘন ভুরু, বাবা যখন পা টেনে টেনে দোতলায় উঠছিল, ছেলে তখন তার পিছন পিছন ঈগল পাখির মতো এক এক করে তিনটে করে ধাপ পেরিয়ে যাচ্ছিল। এই খবর শুনেই তারা দুজন খলবল করতে করতে প্রিন্সেস মারিয়ার ঘরে ঢুকল।
ঢুকেই একটা হাতল-চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ে ছোট প্রিন্সেস বলল, তারা এসেছে সে-খবর শুনেছ কি মারি?
সকালে সাধারণত যে ঢিলে গাউনটা সে পরে তার বদলে এখন পরেছে একটা খুব ভালো পোশাক। চুল সযত্নে পাট করা, মুখখানি উজ্জ্বল। তবু তার শাদাসিদে পোশাক দেখে মাদময়জেল বুরিয়ে বলে উঠল, একি! প্রিয় সখি, তুমি কি এইরকমই থাকবে নাকি? এখনই তো ভদ্রলোকদের বসবার ঘরে ঢোকার কতা ঘোষণা করা হবে, আর আমাদেরও নিচে নামতে হবে, অথচ তুমি মোটেই সাজগোজ করনি।
ছোট প্রিন্সেস উঠে দাসীকে ডাকবার জন্য ঘণ্টা বাজাল, আর প্রিন্সেস মারিকে কীভাবে সাজানো হবে তাড়াতাড়ি তার একটা পরিকল্পনা করে ফেলল। একজন পাণিপ্রার্থীর আগমনে সে যে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে এতে প্রিন্সেস মারির আত্মসম্মানে আঘাত লেগেছে। সে যদি এখন বলে যে নিজের ও তাদের দুজনের ব্যবহারে সে লজ্জা বোধ করছে তাহলে তার নিজের উত্তেজনাটাই ধরা পড়বে, আবার তাদের সাজপোশাকের ব্যাপারে বাধা দিলেও তারা সামনে ঠাট্টা-তামাশা করতে থাকবে। সে লজ্জা পেল, সুন্দর চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে এল, মুখে লালের ছোপ লাগল, মাদময়জেল বুরিয়ে ও হোট প্রিন্সেসের হাতে পড়লেই তার মুখে এই রকম আকর্ষণীয় শহিদসুলভ ভাব ফুটে ওঠে। দুই সখী কিন্তু আন্তরিকভাবেই তাকে সুন্দরী করে তুলতে চেষ্টা করতে লাগল। ভালো সাজসজ্জা যে কোনো মুখকে সুন্দর করে তুলতে পারে–মেয়েদের এই দৃঢ় ধারণার বশেই তারা আন্তরিকতার সঙ্গেই প্রিন্সেস মারিকে সাজাতে বসল।
