প্রিন্স ভাসিলি জবাব দিল, বিশ্বাস করুন প্রিন্সেস, আমার পক্ষে যা করা সম্ভব সবই করতে আমি প্রস্তুত; কিন্তু সম্রাটকে কোনো অনুরোধ করা আমার পক্ষে শক্ত। আমার কথা শুনুন, প্রিন্স গোলিসনকে দিয়ে রুমিয়ান্তসেভের কাছে আবেদন রাখুন। সেটাই সব চাইতে ভালো পথ।
বয়স্কা মহিলাটি ছিল প্রিন্সেস বেস্কায়া, রাশিয়ার একটি সেরা পরিবারের মেয়ে, কিন্তু এখন সে গরিব হয়ে পড়েছে, দীর্ঘদিন সমাজের বাইরে থাকায় আগেকার প্রভাব-প্রতিপত্তিও হারিয়ে ফেলেছে। একমাত্র ছেলের জন্য রক্ষীবাহিনীতে একটা চাকরি যোগাড় করবার জন্যই সে এখন পিটার্সবুর্গে এসেছে। আসলে শুধুমাত্র প্রিন্স ভাসিলির সঙ্গে দেখা করবার জন্যই সে আন্না পাভলভনার এই জমায়েতের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিল এবং এতক্ষণ বসে ভাইকেতের গল্প শুনেছে। প্রিন্স ভাসিলির কথাগলি তাকে ভীত করে তুলল, তার একদা সুন্দর মুখের উপর তিক্ততার একটা ছায়া পড়ল; কিন্তু সে মুহূর্তের জন্য; পরক্ষণেই আবার হেসে উঠে সে আরো জোরে প্রিন্স ভাসিলির হাতটা চেপে ধরল।
আমার কথা শুনুন প্রিন্স, সে বলতে লাগল। আজ পর্যন্ত আপনার কাছে আমি কিছুই চাই নি, আর কখনো চাইবও না; আবার বাবার সঙ্গে যে আপনার বন্ধুত্ব ছিল সে কথাও কোনোদিন আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেই নি; ঈশ্বরের নামে শুধু এই একটিবার আপনাকে অনুরোধ করছি, আমার ছেলের জন্য এটুকু আপনি করুন–আর এ জন্য চিরদিন আপনাকে আমাদের উপকারী বন্ধু বলে মনে করব, সে তাড়াতাড়ি কথাগুলি যোগ করল। না, আপনি রাগ করবেন না; আমাকে কথা দিন! গোলিৎসিনকে বলেছিলাম, তিনি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনি তো চিরদিনই দয়ালুহৃদয়, আমাকে দয়া করুন চোখে জল ভরে এলেও হাসবার চেষ্টা করে সে কথাগুলি বলল।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সুন্দর মাথাটা বেঁকিয়ে নিজের সুডৌল কাঁধের উপর দিয়ে তাকিয়ে প্রিন্সেস হেলেন বলল, বাপি, আমাদের দেরি হয়ে যাবে।
সমাজের উপর প্রভাব-প্রতিপত্তি হচ্ছে মূলধন; সেটাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে ব্যয়বাহুল্য কে অবশ্যই ছাঁটাই করতে হবে। প্রিন্স ভাসিলি সে কথা জানে; সে বোঝে, যে যখন চাইবে তার কথা রাখতেই সে যদি সম্রাটকে অনুরোধ করে, তাহলে সে তো নিজের জন্য আর কিছুই চাইতে পারবে না; তাই নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটাবার ব্যাপারে সে কিছুটা কৃপণতা অবলম্বন করে থাকে। কিন্তু প্রিন্সেস বেস্কায়ার দ্বিতীয় আবেদনের পরে সে যেন কিছুটা বিবেকের দংশন অনুভব করল। একটি সত্য কথাই মহিলাটি তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে; জীবনে উন্নতির প্রথম ধাপের জন্য তার বাবার কাছে সে সত্যি ঋণী। তাছাড়া, তার ভাবভঙ্গি দেখেই সে বুঝতে পেরেছে যে এই মহিলাটি সেই সব নারীদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মায়েদের-একজন যারা একবার মনস্থির করলে উদ্দেশ্য সিদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত থামে না, এবং দরকার হলে দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলতে পারে, এমন কি একটা হই-চই পর্যন্ত বাধাতে পারে। এই শেষ বিবেচনাটিই তাকে বিচলিত করল।
বলল, প্রিয় আন্না পাভলভনা, আপনি যা চাইছেন সে কাজ করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব; কিন্তু আপনার প্রতি আমার অনুরাগ এবং আপনার বাবার স্মৃতির প্রতি আমার শ্রদ্ধাকে প্রমাণ করতে সেই অসম্ভব কাজই আমি করব–আপনার ছেলেকে রক্ষীবাহিনীতে বদলি করা হবে। এ কাজ আমি হাতে নিলাম। আপনি খুশি তো?
প্রিয় উপকারী বন্ধু! আপনার কাছে এইটাই আমি প্রত্যাশা করেছিলাম–আপনার দয়ার কথা আমি জানি!. প্রিন্স ভাসিলি যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল।
দাঁড়ান–মাত্র একটি কথা! সে যখন রক্ষীবাহিনীতে বদলি হবে… সে একটু থামল, মাইকেল ইলারিওনভিচ কুতুজভের সঙ্গে তো আপনার হৃদ্যতা আছেই…তাকে একটু বলবেন যেন বরিসকে তার অ্যাডজুটান্ট করে নেন। তাহলেই আমি নিশ্চিন্ত হই, আর তার পরে…
প্রিন্স ভাসিলি হাসল।
না, সে কথা আমি দিতে পারব না। আপনি জানেন না প্রধান সেনাপতিপদে নিযুক্ত হবার পর থেকে কুতুজভকে কতভাবে বিরক্ত হতে হচ্ছে। সে নিজে আমাকে বলেছে, মস্কোর সব মহিলারা তাদের সর ছেলেকে অ্যাডজুটান্ট বানিয়ে দেবার জন্য তার হাতে তুলে দেবার ষড়যন্ত্র করেছে।
না, আপনাকে কথা দিতেই হবে! আমি আপনাকে ছাড়ব না…
সুন্দরী কন্যাটি আগের মতো সুরেই বলল, বাপি, আমাদের দেরি হয়ে যাবে।
আচ্ছা, তা হলে আসি! বিদায়! ওর কথা শুনলেন তো?
তাহলে কাল আপনি সম্রাটকে বলছেন তো?
নিশ্চয়; কিন্তু কুতুজভের ব্যাপারে আমি কথা দিচ্ছি না।
কথা দিন, কথা দিন ভাসিলি। আন্না মিখায়লভনা চিৎকার করে বলল; তার ঠোঁটে সেই বালিকাসুলভ কপট প্রেমের হাসি যা তার পরিণত বয়সের চিন্তাক্লিষ্ট মুখে একান্তই বেমানান।
পরিষ্কার বোঝা যায় সে তার বয়সের কথা ভুলে গেছে; তাই অভ্যাসবশতই নারীসুলভ পুরনো ছলাকলার আশ্রয় নিতে পারছে। কিন্তু প্রিন্স চলে যাওয়ামাত্রই তার মুখে আগেকার নিরুত্তাপ নকল ভাব ফুটে উঠল। আবার সে ভাইকেতের গল্প শুনতে দলের মধ্যে ফিরে গেল এবং বাড়ি যাবার সময় না হওয়া পর্যন্ত গল্প শোনার ভানই করে যাবে। তার উদ্দেশ্য তো সিদ্ধই হয়ে গেছে।
*
অধ্যায়-৫
আন্না পাভলভনা জিজ্ঞাসা করল, মিলানে রাজ্যাভিষেক-এই সাম্প্রতিক হাসির নাটক সম্পর্কে আপনি কি মনে করেন? আবার এই যে জেনোয়া ও লুক্কার জনসাধারণ মঁসিয় বোনাপার্তের কাছে তাদের দরখাস্ত মঞ্জুর করল-এ হাসির নাটকটি সম্পর্কেই বা আপনি কি মনে করেন? প্রশংসনীয়! একটা মানুষের মুণ্ডু ঘুরিয়ে দেবার পক্ষে এই তো যথেষ্ট! দেখেশুনে মনে হয়, গোটা পৃথিবীই বুঝি পাগল হয়ে গেছে।
