কিন্তু কিছু তো বলতেই হবে, তাই হেলেনকে সে জিজ্ঞেস করল, আজকের ভোজসভায় সে খুশি হয়েছে কি না। হেলেন জবাবে জানাল যে নামকরণ দিবসের অনুষ্ঠান তার খুবই ভালো লাগে।
কিছু কিছু নিকট আত্মীয় এখনো চলে যায়নি। সকলেই বড় বসার ঘরটায় বসে আছে। অবসন্ন পায়ে প্রিন্স ভাসালি পিয়েরের কাছে এগিয়ে এল। পিয়ের উঠে দাঁড়াল। প্রিন্স ভাসালি কঠোর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। কিন্তু তার পরেই মুখের ভাব বদলে পিয়েরের হাত ধরে তাকে বসিয়ে দিয়ে সস্নেহে হাসল।
সঙ্গে সঙ্গেই মেয়ের দিকে ফিরে আদর করে বলল, এই যে লেলিয়া? পরমুহূর্তেই পুনরায় পিয়েরের দিকে ফিরে অস্ফুট স্বরে কী যেন বলে হঠাৎ সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পিয়েরের মনে হলো, প্রিন্স ভাসালি খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছে, তাতে সেও দুঃখিত হল, হেলেনের দিকে তাকিয়ে মনে হলো সেও মনে কষ্ট পেয়েছে, তার চোখ যেন বলতে চাইছে, দেখ, এটা তোমার দোষ!
পিয়ের ভাবল, চূড়ান্তভাবে পা ফেলতেই হবে, কিন্তু আমি পারছি না, পারছি না।
বসার ঘরে ফিরে গিয়ে প্রিন্স ভাসালির কানে এলো তার স্ত্রী জনৈকা বর্ষিয়সী মহিলাকে পিয়েরের কথাই বলছে।
অবশ্য এটা একেবারে রাজযোটক, কিন্তু সুখের কথা কেউ…
মহিলাটি বলল, বিয়ে তো বিধাতার হাতে।
না শোনার ভান করে তাদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গিয়ে প্রিন্স ভাসালি ঘরের একেবারে এককোণে একটা সোফায় গিয়ে বসল। দুই চোখ বুজে যেন ঝিমুতে লাগল। মাথাটা সামনে ঝুঁকে পড়তেই আবার সজাগ হয়ে উঠল।
স্ত্রীকে বলল, এলিন, যাও তো দেখে এসো ওরা কী করছে।
প্রিন্সেস দরজাটা পার হয়ে ছোট ঘরটার দিকে তাকাল। পিয়ের ও হেলেন আগের মতোই কথা বলছে।
সে স্বামীকে বলল, সেই একই অবস্থা।
প্রিন্স ভাসালির চোখে ভুকুটি ফুটে উঠল, মুখটা বেঁকে গেল, গাল টুটো কাঁপতে লাগল, মুখে দেখা দিল একটা কর্কশ অসন্তোষের ভাব। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে মাথাটাকে পিছন দিকে ঠেলে দিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে মহিলাদের পাশ কাটিয়ে সে বসার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দ্রুত পায়ে সানন্দে সে পিয়েরের কাছে গেল। তার মুখের অস্বাভাবিক জয়োল্লাসের দীপ্তি লক্ষ করে পিয়ের সভয়ে উঠে দাঁড়াল।
প্রিন্স ভাসিলি বলল, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! আমার স্ত্রী আমাকে সব কথাই বলেছে!-(এক হাত দিয়ে সে পিয়েরকে জড়িয়ে ধরল, অন্য হাতে জড়িয়ে ধরল মেয়েকে।) বাবা… লেলিয়া… আমি খুব খুশি হয়েছি। (তার গলার স্বর কাঁপছে।) তোমার বাবাকে আমি ভালোবাসতাম… স্ত্রী হিসেবে ওকে তোমার ভালোই লাগবে… ঈশ্বর তোমাদের আশীর্বাদ করুন!…
সে মেয়েকে আলিঙ্গন করল তারপর পিয়েরকেও-দুর্গন্ধ মুখে তাকে চুম্বন করল। সত্যিকারের চোখের জলেই তার দুই গাল ভিজে গেল।
চিৎকার করে ডাকল, প্রিন্সেস, এখানে এসো!
বৃদ্ধা প্রিন্সেস এল, সেও কেঁদে ফেলল। বর্ষিয়সী মহিলাটিও চোখে রুমাল চাপা দিল। পিয়েরকে চুমো খাওয়া হল, সেও বারকয়েক সুন্দরী হেলেনের হাতে চুমো খেল। কিছুক্ষণ পরে আবার তাদের একা রেখে সকলেই চলে গেল। পিয়ের ভাবল, এ সবই ভবিতব্য, এর অন্যথা হতে পারত না, কাজেই এটা ভালো কি মন্দ সে প্রশ্ন বৃথা। এটা ভালোই, কারণ এটা স্পষ্ট, আর এর ফলে একটা যন্ত্রণাদায়ক সন্দেহের অবসান ঘটল। নিঃশব্দে বাকদত্তার হাতখানি ধরে পিয়ের তার সুন্দর বুকের ওঠা নামা দেখতে লাগল।
হেলেন! একবার ডেকেই সে থেমে গেল।
তার মনে হল, এসব ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু বলতে হয়, কিন্তু লোকে কী বলে তা স্মরণ করতে পারল না। হেলেনের মুখের দিকে তাকাল। হেলেন আরো কাছে সরে এল। তার মুখ লজ্জায় রাঙা।
পিয়েরের চশমা জোড়া দেখিয়ে হেলেন বলে উঠল, আঃ, ওটা খুলে ফেল… ওটা…।
পিয়ের চশমা খুলে ফেলল। হেলেনের হাতের উপর ঝুঁকে পড়ে তাকে চুমো খেতে উদ্যত হল, কিন্তু একটা দ্রুত, জান্তব গতিতে মাথাটা সরিয়ে নিয়ে হেলেন তার ঠোঁট দুটিকে থামিয়ে দিয়ে নিজের ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরল। তার মুখের পরিবর্তিত, উত্তেজিত ভাব দেখে পিয়ের অবাক হয়ে গেল।
এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, কাজ শেষ, তাছাড়া, আমি ওকে ভালোবাসি, পিয়ের ভাবল।
এইসব মুহূর্তে কী বলতে হয় সেটা তার মনে পড়ে গেল, সে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি! কিন্তু নিজের কণ্ঠস্বরের দুর্বলতায় সে নিজেই লজ্জা পেল।
ছয় সপ্তাহ পরে তার বিয়ে হয়ে গেল, কাউন্ট বেজুখবের আসবাবপত্রে সাজানো পিটার্সবুর্গের মস্ত বড় বাড়িতে বিখ্যাত সুন্দরী স্ত্রীকে নিয়ে এবং লক্ষ টাকার মালিক হয়ে সে সুখের সংসার পাতল।
*
অধ্যায়-৩
১৮০৫-এর নভেম্বর মাসে বৃদ্ধ প্রিন্স নিকলাস বলকনস্কি প্রিন্স ভাসিলির একটা চিঠি পেল, সে জানিয়েছে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করতে আসছে। লিখেছে, আমি পরিদর্শনের কাজে যাচ্ছি, কাজেই আমার সম্মানিত হিতসাধকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বাড়তি সত্তর মাইল পথ পরিক্রমা করতে আমার কোনো আপত্তি থাকতে পারে না। সেনাবাহিনীতে যোগদানের পথে আমার ছেলে আনাতোলও আমার সঙ্গে যাবে তাই আমি আশা করি, বাবার দেখাদেখি সেও আপনার প্রতি যে গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে সেটা যাতে সে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থেকে আপনাকে জানাতে পারে সে অনুমতি আপনি দেবেন।
খবরটা শুনে হোট প্রিন্সেস হঠাই বলে ফেলল, মনে হচ্ছে মেরিকে আর বাইরে বের করতে হবে না? পাণিপ্রার্থীরা নিজেদের তাগিদেই আমাদের কাছে আসছে।
