হেলেনের নামরকণ দিবসে নিজেদের লোকজনের একটা ছোট দল প্রিন্স ভাসিলির বাড়িতে নৈশভোজে মিলিত হল। সব বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকেই বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে সেই সন্ধ্যায়ই একটি তরুণীর ভাগ্য নির্ধারিত হবে। অতিথিরা সকলেই নৈশভোজে বসেছে। সুন্দরী প্রিন্সেস কুরাগিনা বসেছে প্রধানার আসনে, তার দুই পাশে বসেছে অধিকতর মর্যাদাসম্পন্ন অতিথিরাজনৈক বৃদ্ধ সেনাপতি ও তার স্ত্রী এবং আন্না পাভলভনা শেরার। টেবিলের অপর প্রান্তে বসেছে অন্য সব অতিথি, তরুণ-তরুণীরা এবং পরিবারের লোজন, পিয়ের ও হেলেন বসেছে পাশাপাশি। প্রিন্স ভাসালি নিজে নৈশভোজনে যোগ দেয়নিঃ খুশি মনে সে টেবিলের চারধারে ঘুরছে, কখনো এর পাশে কখনো ওর পাশে একটু বসছে। গোটা টেবিলকে সে জমিয়ে রেখেছে। মোমবাতিগুলো জ্বলছে, লাল উর্দিপরা চাকররা ঘুরছে, আর চিনেমাটির পাত্র, ছুরি-কাঁটা ও গ্লাসের টুং-টাং-এর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে নানা আলোচনার প্রাণবন্ত গুঞ্জন ধ্বনি।…
এই পরিবেশের মধ্যে বসে শিয়ের পরিষ্কার বুঝতে পারছে যে এসব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু সে নিজে, আর তাতেই সে যুগবৎ তুষ্ট ও বিব্রত বোধ করছে। সে যেন একটা কাজের মধ্যে সম্পূর্ণ ডুবে গেছে। কোনো কিছুই সে দেখছে না, শুনছে না, বা স্পষ্ট করে বুঝছে না।
সে ভাবল, এবার সব শেষ। আর কেমন করে এটা ঘটল? এত দ্রুত! এখন বুঝতে পারছি, শুধু তার জন্য । নয়, শুধু আমার জন্যও নয়, কিন্তু এখানকার প্রত্যেকের জন্যই সেটা অনিবার্যভাবেই ঘটবে। তারা সকলেই এটা আশা করছে, এটা যে ঘটবেই সে সম্পর্কে তারা এতই সুনিশ্চিত যে আমি তাদের হতাশ করতে পারি না, পারি না। কিন্তু কেমন করে ঘটবে? আমি জানি না, কিন্তু অবশ্যই ঘটবে!
অথবা হঠাই সে যেন লজ্জিত হয়ে উঠল, অথচ সে লজ্জার কারণ সে জানে না। এই যে সকলেরই মনোযোগ তার দিকেই আকৃষ্ট হয়েছে, সকলেই তাকে ভাগ্যবান ভাবছে, এবং তার মুখের দিকে তাকাচ্ছে হেলেনবিজয়ী প্যারিসের মতো–এটাই তার কাছে অদ্ভুত লগছে। কিন্তু এ বিষয়ে তো কোনো সন্দেহ নেই যে এইরকমই হয়ে থাকে, আর অবশ্যই হবে! এই বলে সে নিজেকে সান্ত্বনা দিল। তাছাড়া এটা ঘটাতে আমি আর কী করছি? কোথায় এর সূচনা? প্রিন্স ভাসালির সঙ্গে আমি মস্কো থেকে এখানে এসেছি। তখন তো কিছুই ছিল না। কাজেই তার বাড়িতে আমি থাকব কেন? তারপর হেলেনের সঙ্গে তাস খেলেছি, তার থলিটা হাতে নিয়ে তার সঙ্গে গাড়িতে চেপে বেড়াতে গেছি। কিন্তু এ ব্যাপারটা শুরু হলো কখন, আর কেমন করেই বা ঘটল? আর আজ সে তার পাশেই বসে আছে তার বাকদত্ত স্বামীরূপে, তাকে দেখছে, তার কথা শুনছে, তার সান্নিধ্য, তার নিঃশ্বাস, তার চলন, তার রূপ উপভোগ করছে। হঠাৎ সে শুনতে পেল একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর দ্বিতীয়বার তাকে কি যেন বলল। কিন্তু পিয়ের এতই আত্মমগ্ন হয়ে পড়েছিল যে সে কথার কোনো অর্থই তার কাছে বোধগম্য হলো না।
প্রিন্স ভাসালি তৃতীয়বার বলল, আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করছিলাম বলকনস্কির কাছ থেকে শেষ চিঠি তুমি কবে পেয়েছ? তুমি কেমন করে যেন অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছে।
প্রিন্স ভাসালি হাসল, পিয়ের লক্ষ্য করল, তাকে ও হেলেনকে দেখে সকলেই হাসছে। সে মনে মনে বলল, বেশ তো, আপনারা যদি সব জেনেই থাকেন, তাতে হলোটা কী? কথাটা তো সত্যি! শিশুর মতো সরল হাসি ফুটল তার মুখে, হেলেনও হাসল।
তুমি কবে চিঠি পেয়েছ? চিঠিটা কি ওলমুজ থেকে লেখা একটা বিতর্কের মীমাংসা করার জন্যই যেন প্রিন্স ভাসালি কথাটা জানতে চাইল।
পিয়ের ভাবল, এই সব তুচ্ছ কথা মানুষ বলেই বা কেমন করে আর ভাবেই বা কেমন করে? একটা নিঃশ্বাস ফেলে জবাব দিল, হ্যাঁ, ওলমুজ থেকে।
নৈশ ভোজনের পরে সঙ্গিনীকে নিয়ে পিয়ের অন্য সকলের সঙ্গে বসবার ঘরে গেল। অতিথিরা চলে যেতে
শুরু করল, কেউ কেউ হেলেনের কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই চলে গেল, কেউ-বা মুহূর্তের জন্য তার সঙ্গে দেখা করেই তাড়াতাড়ি বিদায় নিল। বিষণ্ণ নিঃশব্দের মধ্যে কুটনীতিবিদ বসার ঘরে ছেড়ে গেল। তার মনে হলো, পিয়েরের সুখের তুলনায় তার কুটনৈতিক সাফল্যের গর্ব কত অর্থহীন। বৃদ্ধ সেনাপতির স্ত্রী যখন জানতে চাইল তার পা কেমন আছে তখন সে খেঁকিয়ে উঠল।
মনে মনে বলল, হায় নির্বোধ বুড়ি! পঞ্চাশ বছর বয়সেও প্রিন্সেস হেলেন এমনি সুন্দরীই থাকবে।
বৃদ্ধা প্রিন্সেসকে চুমো খেয়ে আন্না পাভলভনা.তার কানে কানে বলল, মনে হচ্ছে আপনাকে অভিনন্দন জানাতে পারি। মাথার যন্ত্রণাটা না দেখে দিলে আরো কিছুক্ষণ থেকে যেতে পারতম।
বৃদ্ধ পিন্সেস জবাব দিল না, নিজের মেয়ের সুখের প্রতি ঈর্ষায় তার অন্তর জ্বলছে।
অতিথিরা একে একে বিদায় নিয়ে চলে গেল। হেলেনকে সঙ্গে নিয়ে পিয়ের সারাক্ষণ ঘোট বসবার ঘরটাতেই কাটিয়ে দিল। গত ছয় সপ্তাহ ধরে অনেক সময়ই সে হেলেনের সঙ্গে একা কাটিয়েছে, কিন্তু কোনো সময়ই তাকে ভালবাসার কথা বলেনি। এখন সে জেনেসে যে সেটা অনিবার্য, তবু চুড়ান্ত পদক্ষেপ করবার জন্য সে মনস্থির করতে পারছে না। সে লজ্জা পেল, তার মনে হলো, হেলেনের কাছে অন্য কারো আসন সে দখল করতে চলেছে। একটা অন্তর্নিহিত কণ্ঠস্বর যেন তাকে চুপি চুপি বলছে, এ সুখ তোমার জন্য নয়। তোমার মধ্যে যা রয়েছে তা যাদের মধ্যে নেই এ সুখ তাদের জন্যই।
