এই মুহূর্তে তার নিশ্চিতরূপে মনে হল, তারা দুজন যেন পবিত্র বেদীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। আসলে সেটা কীভাবে ঘটবে তা সে জানে না, সেটা যে ভালো কাজ হবে তাও সে জানে না (এমন কি বিনা কারণেই তার মনে হয় সে সেটা খারাপ কাজই হবে, কিন্তু এটা সে জানে যে এ-ঘটনা ঘটবেই)।
পিয়ের চোখ নামাল আবার চোখ তুলল, তার ইচ্ছা করছে নিজের থেকে অনেক দূরে এক দূরবর্তী সুন্দরী হিসেবে সে হেলেনকে দেখবে, এই মুহূর্তের আগে পর্যন্ত সেইভাবেই তো দেখেছে, কিন্তু এখন আর সেভাবে দেখতে পারছে না। হেলেন যে তার বড় বেশি কাছে এসে গেছে। সে তাকে অভিভূত করেছে, তাদের দুজনের মধ্যে নিজের বাসনার প্রাচীর ছাড়া আর কোনো প্রাচীর এখন নেই।
বেশ তো, তোমাদের এখানেই রেখে যাচ্ছি, আন্না পাভলভনার গলা শোনা গেল। এখন তো তোমরা ভালোই আছ দেখতে পাচ্ছি।
সে নিন্দনীয় কিছু করে বসেছে কি না বুঝবার জন্য পিয়ের সলজ্জ ভঙ্গিতে চারদিকে তাকাল। তার মনে হল, তার যা ঘটেছে সেটা যেমন সে নিজে জেনেছে তেমনই অন্য সকলকেও জেনেছে।
একটু পরে সে যখন বড় হলটার কাছে গেল তখন আন্না পাভলভনা বলল, শুনছি তুমি নাকি তোমাদের পিটার্সবুর্গের বাড়িটাকে নতুন করে সাজিয়ে তুলছ?
কথাটা সত্য। স্থপতি জানিয়েছে সেটা করা দরকার, আর কেন দরকার সেটা না জেনেই পিয়ের তাদের পিটার্সবুর্গের মস্ত বড় বাড়িটার মেরামতের কাজে হাত দিয়েছে।
খুব ভালো কথা, কিন্তু পিন্স ভাসিলির কাছ থেকে চলে যেয়ো না। প্রিন্সের মতো বন্ধু থাকা ভালো, প্রিন্স ভাসিলির দিকে তাকিয়ে মহিলাটি বলল। আমি সে ব্যাপারে কিছু কিছু জানি। কি বল? আর তুমি এখনো যুবক। তোমার পরামর্শের প্রয়োজন। বুড়িদের ক্ষমতা খাটাচ্ছি বলে আমার উপর রাগ করো না।
আন্না পাভলভনা থামল, বয়সের উল্লেখ করে সব নারীই একটা কিছু শোনার আশায় চুপ করে যায়। একদৃষ্টিতে দুজনকে দেখে নিয়ে সে আবার বলল, যদি বিয়ে করো সেটা আলাদা ব্যাপার। পিয়ের হেলেনের দিকে তাকাল না, হেলেনও তাকাল না তার দিকে। কিন্তু সে তখন পিয়েরের মারাত্মক কাছে এসে পড়েছে। পিয়ের অস্পষ্টভাবে কী যেন বলে লজ্জায় লাল হয়ে গেল।
যা ঘটে গেল সে কথা ভেবে বাড়িতে ফিরেও পিয়ের অনেকক্ষণ ঘুমতে পারল না। কী ঘটে গেল? কিছুই । সে শুধু এইটুকু বুঝেছে যে এই নারী তার হতে পারে। । কিন্তু সে তো বোকা। আমি নিজেই বলেছি সে বোকা। পিয়ের ভাবতে লাগল। সে আমার মনে যে অনুভূতি জাগিয়েছে সেটা তো কদর্য, সেটা তো অন্যায়। আমি শুনেছি যে তার ভাই আনাতোল তার প্রেমে পড়েছিল, তাই নিয়ে একটা কেলেংকারি হয়েছিল, আর সেইজন্যই আনাতোলকে দূরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। হিপোলিৎ তার ভাই… প্রিন্স ভাসিলি তার বাবা…এটা খারাপ… সে ভাবল। কিন্তু এই চিন্তার পাশাপাশি আর একটা চিন্তা মনে আসায় তার মুখে হাসি দেখা দিল। হেলেনের অযোগ্যতার কথা ভাবতে গিয়ে সে আবার এ স্বপ্নও দেখতে লাগল যে সে হবে তার স্ত্রী, সে তাকে ভালোবাসবে, সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ হয়ে উঠবে, এবং তার সম্পর্কে সে যা কিছু শুনেছে সব হয়তো মিথ্যা হয়ে যাবে। সে আবার হেলেনের দিকে তাকাল, প্রিন্স ভাসিলির মেয়ে হিসেবে নয়, একটি ধূসর পোশাকে ঢাকা একটা গোটা মানুষের দিকে। কিন্তু না! এ চিন্তা কেন আগে আমার মাথায় আসে নি? পুনরায় সে নিজেকে বলল যে এটা অসম্ভব, এ বিয়ে একটা অস্বাভাবিক, এমন কি অসম্মানজনক ব্যাপারই হবে। কিন্তু হেলেনের সম্পর্কে যত কিছুই সে ভাবুক, সেই সঙ্গেই তার মনের আর এক কোণে হেলেনের মূর্তি নারী-সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে দেখা দিল।
*
অধ্যায়-২
১৮০৫-এর নভেম্বর মাসে ভাসিলিকে চারটি ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে যেতে হল পরিদর্শন উপলক্ষে। এই পরিদর্শনের ব্যবস্থাটা সে নিজেই করে নিয়েছিল যাতে সেইসঙ্গে তার উপেক্ষিত জমিদারিগুলোকে একবার দেখে আসতে পারে এবং সেখানে রেজিমেন্টে কর্মরত ছেলে আনাতোলকে সঙ্গে নিয়ে প্রিন্স নিকলাস বলকনস্কির সঙ্গে দেখা করে সেই ধনী বৃদ্ধের মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়েটাকেও পাকা করতে পারে। কিন্তু বাড়ি ছেড়ে যাবার আগে এবং সেইসব ব্যবস্থায় হাত দেবার আগে প্রিন্স ভাসিলিকে পিয়েরের ব্যাপারটাও পাকা করতে হবে। একথা ঠিক যে ইদানীং সে বাড়িতে, অর্থাৎ প্রিন্স ভাসিলির বাড়িতেই সারাটা দিন কাটায়, হেলেনের সামনে এলেই কেমন যেন কিন্তু, উত্তেজিত ও বোকা বোকা হয়ে ওঠে (প্রেমিকরা যে রকম হয়ে থাকে), কিন্তু এখনো পর্যন্ত তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব করেনি।
একদা সকালে দুঃখের সঙ্গে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে প্রিন্স ভাসিলি মনে মনে বলল, এসবই তো ভালো লক্ষণ, কিন্তু ব্যাপারটা তো পাকাপাকি করে ফেলা দরকার তার মনে হল, তার কাছে অনেকরকম বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে পিয়েরের আচরণ ঠিক হচ্ছে না। যৌবন, হাল্কা মেজাজ… বেশ তো, ঈশ্বর তার সহায় হোন, কিন্তু একটা হেস্তনেস্ত তো করা চাই। আগামী পরশু লেলিয়ার (হেলেনের আদরের নাম) নামকরণ দিবস। সেদিন দুতিনজনকে নিমন্ত্রণ করব, তখনো যদি পিয়ের তার করণীয় না করে, তখন সে দায় আমিই নেবহ্যাঁ, তাই নেব, আমি তার বাবা।
আন্না পাভলভনা স্বাগত অনুষ্ঠানের এবং যে বিচিত্র রজনীতে পিয়ের স্থির করেছিল যে হেলেনকে বিয়ে করাটা একটা দুর্ঘটনার ব্যাপর হবে আর তাই তাকে এড়িয়ে তার এখান থেকে চলে যাওয়াই উচিত, তারপরে ছয় সপ্তাহ কেটে গেলেও সে এখনো প্রিন্স ভাসিলির বাড়ি ছেড়ে যায়নি, বরং সে সভয়ে লক্ষ্য করছে যে যত দিন যাচ্ছে ততই লোকের চোখে সে হেলেনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, হেলেনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়, আর যত ভয়ংকরই হোক হেলেনের ভাগ্যের সঙ্গেই নিজেকে ভাগ্যকে জড়াতেই হবে। হয়তো সে নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারত, কিন্তু আজকাল এমন একটা দিনও যায় না যেদিন একটা সান্ধ্য মজলিসের ব্যবস্থা করে প্রিন্স ভাসিলি পিয়েরকে সেখানে ডেকে না পাঠায়। আর দেখা হলেই কোনো বিশেষ মুহূর্তে প্রিন্স ভাসিলি পিয়েরের হাতখানি ধরে নিচের দিকে নামিয়ে নেয়, অথবা অন্যমনস্কভাবে নিজের বলিরেখাঙ্কিত পরিষ্কার কামানো মুখখানা এগিয়ে ধরে পিয়েরের চুম্বনলাভেল জন্য, আর সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে : কাল আবার দেকা হবে, অথবা ডিনারে এস কিন্তু, নইলে তোমার মুখদর্শন করব না, অথবা তোমার জন্যই তো এখানে। রয়ে গেছি, ইত্যাদি। যদিও দেখা হলে প্রিন্স ভাসিলি কদাচিৎ তার সঙ্গে দু-একটা কথা বলে, তবু তাকে হতাশ করবার শক্তি পিয়েরের নেই। প্রতিদিন সে নিজেকে একই প্রশ্ন করে : হেলেনকে বুঝবার, তার স্বরূপ সম্পর্কে মনস্থির করবার সময় এসেছে। আমি কি আগেই ভুল করেছিলাম, না কি এখন ভুল করছি? না, সে তো নির্বোধ নয়, সে চমৎকার মেয়ে, সে কখনো ভুল করে না, বোকার মতো কথা বলে না। সে কথা কম বলে, কিন্তু যেটুকু বলে তা সহজ, সরল, কাজেই সে নির্বোধ নয়। সে তো কখনো লজ্জা পেত না, এখনো লজ্জা পায় না, কাজেই। সে খারাপ মেয়েমানুষ হতে পারে না! যখনই সে কথা বলে তখনই তার মুখে ফুটে ওঠে উজ্জ্বল হাসি। পিয়ের জানে, সকলেই অপেক্ষা করে আছে কবে সে সুখ খুলবে, কবে একট বিশেষ সীমারেখা সে পার হবে, সে আরো জানে, আগে হোক পরে হোক সীমারেখা তাকে পার হতেই হবে, আর সেকথা ভাবলেই একটা দুর্বোধ্য আতঙ্ক তাকে পেয়ে বসে। এই দেড় মাস যাবত হাজারবার তার মনে হয়েছে যে সে ক্রমাগত একটা ভয়ংকর গহ্বরের। দিকে এগিয়ে চলেছে, আর ভেবেছে : এ আমি কী করছি? আমার চাই স্থিরসংকল্প। তা কি আমার নেই?
