১৮০৫-৬-এর শীতকালের গোড়ার দিকে পিয়ের আন্না পাভলভনার একখানা গোলাপি চিঠি পেল, তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সে লিখেছে : যাকে দেখলেই মন ভরে সেই সুন্দরী হেলেনকে এখানে পাবে।
চিঠি পড়ে পিয়ের এই প্রথম অনুভব করল যে তার ও হেলেনের মধ্যে একটা যোগসূত্র গড়ে উঠেছে, এই চিন্তা একদিন তাকে ভীত করে তুলল, কারণ এমন একটা দায় যেন তার উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে যা সে পূর্ণ করতে পারবে না, আর এতে সে খুশিও হল, কারণ প্রস্তাবটা সুখকর বটে।
আন্না পাভলভনার এবারকার স্বাগত অনুষ্ঠানটিও ঠিক আগেকার অনুষ্ঠানেরই অনুরূপ, শুধু অতিথিদের সামনে এবার যে নতুন ব্যক্তিটিকে সে উপস্থিত করেছে সে মর্তেৰ্মার্ত নয়, বার্লিন থেকে সদ্য আগত একজন কূটনীতিবিদ, সম্রাট আলেকজান্দারের পসদাম পরিভ্রমণ এবং মানবজাতির মহাশত্রুর বিরদ্ধে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাকল্পে দুই সম্মানিত বন্ধুর মধ্যে অবিচ্ছেদ্য মৈত্রীর প্রতিশ্রুতির বিবরণ সংগ্রহ করে নিয়েই সে এখানে এসেছে। কাউন্ট বেজুখভের মৃত্যুতে সম্প্রতি পিয়েরের যে ক্ষতি হয়েছে সেটা স্মরণ করেই আন্না পাভলভনা ঈষৎ বিষণ্ণতার সঙ্গে পিয়েরকে স্বাগত জানাল। এতে পিয়েরের মন বেশ খুশিই হল। স্বাভাবিক কুশলতার সঙ্গেই আন্না পাভলভনা বিভিন্ন দলকে তার বসার ঘরে আলাদা আলাদাভাবে বসিয়েছে। বড় দলটাতে বসেছে প্রিন্স ভাসিলি, সেনপতিরা এবং নবাগত কূটনীতিবিদ। আর একটা দল বসেছে চায়ের টেবিলে। পিয়েরের ইচ্ছা ছিল বড় দলটাতেই যোগ দেয়, কিন্তু আন্না পাভলভনা তাকে দেখতে পেয়েই আঙুল দিয়ে তার আস্তিনটা চেপে ধরে বলল, একটু সবুর করো, আজ সন্ধ্যায় তোমাকে একটা জিনিস দেখাব। (হেলেনের দিকে চোখ ফিরিয়ে সে হাসল।) প্রিয় হেলেন, আমার বেচারি মাসির প্রতি একটু সদয় হও, সে তোমাকে ভালোবাসে। দশ মিনিট তার কাছে গিয়ে বসো। আর সেখানে যাতে তোমার একঘেয়ে না লাগে সেজন্য আমাদের প্রিয় কাউন্ট তোমাকে সঙ্গ দিতে আপত্তি করবে না।
সুন্দরী হেলেন মাসির কাছে চলে গেল, কিন্তু আন্না পাভলভনা পিয়রকে আটকে রাখল, মনে হল তাকে কিছু চূড়ান্ত ও প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়ার আছে।
অপসৃয়মাণ সুন্দরীকে দেখিয়ে সে পিয়েরকে বলল, খুব সুন্দরী নয় কি? আর কি আচার-আচরণ! এত অল্প বয়সে আচরণের কী মহৎ পরিপূর্ণতা! সবই যেন অন্তর থেকে উৎসারিত হচ্ছে। এ মেয়েকে যে জয় করবে সে সুখী হবে! তাকে সঙ্গিনী পেলে সংসারের অতি সাধারণ মানুষও সমাজে উজ্জ্বল আসনের অধিকারী হবে। তোমারও কি তাই মনে হয় না? আমি শুধু চেয়েছিলাম তোমার অভিমতটা জানতে, এই কথা বলে আন্না পাভলভনা পিয়রকে ছেড়ে দিল।
পিয়েরও জবাবে হেলেনের আচরণের পূর্ণতা সম্পর্কে তার সঙ্গে ঐকমত্যই প্রকাশ করল। অবশ্য হেলেনের কথা ভাবতে গিয়ে তার রূপ ও নিঃশব্দ মর্যাদা প্রকাশের উল্লেখ্যযোগ্য নৈপুণ্যের কথাই তার মনে পড়েছে।
বৃদ্ধা খালা দুটি যুবক-যুবতাঁকে তার ঘরে স্বাগত জানালেও মনে হল সে যেন হেলেনের প্রশংসা করার বদলে আন্না পাভলভনর প্রতি ভীতিকে প্রকাশ করতেই অধিক ইচ্ছুক। বোনঝির দিকে তাকিয়ে সে যেন জানতে চাইল, এদের নিয়ে সে কি করবে। যাবার আগে আর একবার পিয়েরের আস্তিন ধরে আন্না পাভলভনা বলল, আশা করি তুমি বলবে না যে আমার বাড়িটা বড় একঘেয়ে লাগে। সে আর একবার হেলেনের দিকে তাকাল।
হেলেন হাসল, তার চোখের দৃষ্টি যেন বলতে চাইল, তাকে যে দেখবে সেই মজবে-একটা সম্ভব বলে সে মনে করে না। মাসি কাশল, ঢোক গিলল, ফরাসিতে বলল যে হেলেনকে দেখে সে খুব খুশি হয়েছে, তারপর পিয়েরের দিকে ঘুরে সেই একইভাবে তাকিয়ে একই অভ্যর্থনা জানাল। কথাবার্তার মাঝখানে হেলেন উজ্জ্বল সুন্দর হাসি হেসে পিয়েরের দিকে তাকাল। পিয়ের এ ধরনের হাসিতে অভ্যস্ত, তার কাছে এ হাসি অর্থহীন, তাই সেদিকে সে নজরই দিল না। মাসি পিয়েরের বাবা কাউন্ট বেজুখভের নস্যি-দানির সংগ্রসের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে নিজের নস্যি-দানিটা তাদের দেখাল। প্রিন্সেস হেলেন নস্যি-দানির ঢাকনাতে মাসির স্বামীর প্রতিকৃতিটা দেখাতে বলল।
অন্য টেবিলের আলোচনায় কান রেখেই টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়ে নস্যদানিটা নেবার জন্য হাত বাড়িয়ে পিয়ের একজন বিখ্যাত ক্ষুদ্রচিত্রশিল্পীর নাম উল্লেখ করে বলল, এটা বোধ হয় ভিনেসের হাতের কাজ।
চলে যাবার জন্য কিছুটা উঠে দাঁড়াতেই মাসি হেলেনের পিঠের পিছন দিয়ে নস্য-দানিটা পিয়েরের দিকে বাড়িয়ে দিল। জায়গা করে দেবার জন্য একটু ঝুঁকে হেলেন ছোট্ট করে হাসল। সান্ধ্য মজলিসে যাবার মতো সামনে পিছনে খুবই নিচু-কাটের পোশাক হেলেন পরেছে। তার শরীরটা পিয়েরের কাছে সবসময়ই মর্মরমূর্তি বলে মনে হয়, এখন সে পিয়েরের এত কাছে এসেছে যে তার স্বল্প দৃষ্টি চোখ দুটিতেও ধরা পড়েছে হেলেনের গলা ও কাঁধের জীবন্ত আকর্ষণ, সেগুলো তার ঠোঁটের এত কাছে যে মাথাটা একটু নোয়ালেই তাদের ছোঁয়া যায়। তার দেহের উত্তাপ, নির্যাসের গন্ধ ও পোশাকের খসখস শব্দ সম্পর্কে সে এখন সম্পূর্ণ সচেতন।
হেলেন যেন বলতে চাইছে, তাহলে কি তুমি আগে খেয়াল করনি যে আমি কত সুন্দরী? হ্যাঁ, আমিই এক নারী যে যে-কোনো পুরুষের হতে পারে–তোমারও, তার চোখের দৃষ্টি যেন এই কথাই বলছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে পিয়ের বুঝতে পারল, হেলেন যে তার স্ত্রী হতে পারে তাই শুধু নয়, হেলেনকে তার স্ত্রী হতেই হবে, এর অন্যথা হতে পারে না।
