কারুকার্যখচিত পোর্টফোলিওতে যা রয়েছে তাকে নিজের অংশ সম্পর্কে রাজকুমারী যাতে কোনো প্রশ্ন না তোলে সেজন্য এই হাড়ের টুকরো-তিরিশ হাজার রুবলের একটা বিল–তাকে দেওয়াই সমীচীন-অনেক ভেবে প্রিন্স ভাসিলি এই সিদ্ধান্তেই এসেছে। পিয়ের দলিলে সই করে গিদল, আর তার পর থেকে রাজকুমারী তার প্রতি আরো সদয় হয়ে উঠল। ছোট রাজকুমারীরাও তার প্রতি সদয় হয়ে উঠল, বিশেষ করে গালে তিলওয়ালী একেবারে ছোট সুন্দরীটির হাসি তো প্রায়ই তাকে বিব্রত করে তোলে, আবার পিয়েরের সঙ্গে দেখা হলেই সে নিজেও বিব্রত হয়ে পড়ে।
সকলে যে তাকে ভালোবাসে সেটা পিয়েরের কাছে এতই স্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে হয়েছে যে চারদিককার লোকজনের আন্তরিকতায় বিশ্বাস না করে সে পারে নি। আসলে এই লোকগুলি আন্তরিক কি না সে প্রশ্ন করবার সময়ই তার ছিল না। সে সদাই ব্যস্ত, সর্বদাই তার সময় কাটছে একটা মধুর নেশার মধ্যে।
প্রথম দিকে অন্য সকলের তুলনায় প্রিন্স ভাসিলিই পিয়েরের বিধিব্যবস্থা এবং স্বয়ং পিয়েরকে বেশি করে নিজেরকর হাতে তুলে নিয়েছে। কাউন্ট বেজুখভের মৃত্যুর পর থেকে কখনো এই ছেলেটিকে হাতছাড়া হাতে দেয় নি, সে এমন ভাব দেখাতে লাগল যেন কাজকর্মের চাপে অত্যন্ত শ্রান্ত ও বিপর্যস্ত হলেও পুরোনো বন্ধুর ছেলে ও প্রভূত অর্থের অধিকারী এই অসহায় যুবকটির সে ভাগ্যের খেয়ালখুশি ও দুষ্ট লোকের চক্রান্তের হাতে ছেড়ে দিতে পারে না। কাউন্ট বেজুখভের মৃত্যুর পরে যে কটা দিন সে মস্কোতে ছিল তখন সে হয় পিয়েরকে ডেকে পাঠাত, আর না হয়তো নিজেই তার কাছে যেত এবং ক্লান্ত গলায় কর্তব্য সম্পর্কে তাকে নানা রকম নির্দেশ দিত, প্রতিবারই সে যেন বলত : তুমি তো জান কাজকর্ম নিয়ে আমি একেবারে ডুবে আছি, আর শুধু তোমার ভালোর জন্যই তোমার কথা ভাবছি, তুমি তো ভালো করেই জান যে আমি যা বলছি একমাত্র সেটাই হওয়া সম্ভব।
দেখ বাপু, কাল তাহলে আমরা রওনা হচ্ছি, একদিন প্রিন্স ভাসিলি চোখ বুজে পিয়েরের কনুইতে হাত বুলোতে বুলোতে এমন সুরে কথা বলতে লাগর যেন এ ব্যাপারটা অনেক আগেই স্থির হয়ে আছে এবং এখন আর তার কোনো পরিবর্তন ঘটতে পারে না। কাল আমরা রওনা হচ্ছি আর আমার গাড়িতে তোমার জন্য একটা জায়গাও রেখেছি। আমি খুব খুশি হয়েছি। এখানে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির ব্যবস্থা হয়ে গেছে, অনেক আগেই আমার এখান থেকে যাওয়া উচিত ছিল। এটা পেয়েছি চ্যান্সেলরের কাছ থেকে। তোমার জন্য তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তোমাকে কূটনৈতিক বিভাগে নিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং শয্যা-কক্ষের দ্রজনের পদ দেওয়া হয়েছে।
পিয়ের কি যেন বলতে চাইল, কিন্তু তাকে বাধা দিয়ে প্রিন্স ভাসিলি আবার বলল, না হে বাপু, যা করেছি নিজের জন্যই করেছি, আমার বিবেককে পরিতুষ্ট করতেই করেছি, সেজন্য ধন্যবাদ জানাবার কিছু নেই। ভালোবাসার বাড়াবাড়ির কোনো অভিযোগ আজ পর্যন্ত কেউ করেনি, তাছাড়া, তুমি ইচ্ছা করলেই কাল সব ছুঁড়ে ফেলে দিতে পার। কিন্তু পিটার্সবুর্গে গেলে সবকিছুই তো নিজের চোখে দেখতে পারবে। এখানকার ভয়ংকর স্মৃতির হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য তোমার এখান থেকে চলে যাবার সময় হয়ে গেছে। প্রিন্স ভাসিলি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হ্যাঁ, হ্যাঁ বাবা। আমার খানসামা তোমার গাড়িতে যেতে পারবে। আরে, আমি তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। তুমি তো জানো বাবা, তোমার বাবার সঙ্গে আমার কিছু দেনা পাওনার ব্যাপর ছিল, আর তাই রিয়াজান জমিদারি থেকে পাওনাটা আমি নিয়ে নিয়েছি, ওটা আমার কাছেই থাকবে, তোমার ওটা দরকার হবে না। হিসাব-নিকাশটা পরে করা হবে।
রিয়াজান জমিদারি থেকে পাওনা বলতে প্রিন্স ভাসিলি চাষীদের কাছ থেকে পাওয়া কয়েক হাজার রুবল খাজনার কথাই বলতে চাইল, টাকাটা সে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছে।
যেমন মস্কোতে তেমনি পিটার্সবুর্গেও পিয়ের সেই একই ভদ্রতা ও স্নেহের পরিবেশই পেল। প্রিন্স ভাসিলি তার জন্য যে চাকরি, বরং বলা যায় পদমর্যাদার (কারণ তাকে কিছুই করতে হয় না) ব্যবস্থা করে দিয়েছে সেটাকে সে অস্বীকার করতে পারেনি, ফলে নানাবিধ আমন্ত্রণ ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা এত বেশি বেড়ে গেছে যে অবিরাম হৈ-হল্লায় সে বড়ই বিব্রত বোধ করতে লাগল।
তার আগেকার পরিচিত বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই এখন পিটার্সবুর্গে নেই। রক্ষীবাহিনী রণক্ষেত্রে চলে গেছে, দলখভের পদাবনতি ঘটেছে, আনাতোল যুদ্ধে যোগ দিয়ে মফস্বলে কোথাও চলে গেছে, প্রিন্স আন্দ্রু বিদেশ, কাজেই পিয়ের ইচ্ছামতো রাত কাটার সুযোগ পাচ্ছে না, বা কোনো শ্রদ্ধাভাজন বন্ধুর কাছে মন খুলে কথা বলতেও পারছে না। ডিনারে আর বলনাচেই তার সবটা সময় চলে যাচ্ছে, তার দিন কাটছে প্রধানত প্রিন্স ভাসিলির বাড়িতে তার স্ত্রী, সুন্দরী কন্যা হেলেন ও রাজকুমারীর সাহচর্যে।
সমাজে অন্য সকলের মতোই পিয়েরের প্রতি আন্না পাভলভনা শেরেরের মনোভাবের ও পরিবর্তন ঘটেছে।
আগেকার দিন আন্না পাভলভনার সামনে গেলেই পিয়েরের মনে হত সে যা কিছু বলছে সেটাই অবান্তর, বুদ্ধিহীন ও বেমানান, অথচ পিহোলিতের অত্যন্ত বোকা বোকা কথাগুলিও কত চতুর ও মানানসই। এখন তো পিয়ের যা কিছু বলে তাই সুন্দর।
