রস্তভ ভাবল, কেউ আমাকে চায় না! আমাকে সাহায্য করবার, একটু করুণা দেখাবার কেউ নেই। অথচ একদিন আমি সুস্থ ছিলাম, আমার শক্তি ছিল, সুখ ছিল, সকলে আমাকে ভালোবাসত। দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়ে আপনা থেকেই সে আর্তনাদ করে উঠল।
এই, তোমার কষ্ট হচ্ছে কি? সৈনিকটি জিজ্ঞেস করল, তারপর জবাবের জন্য অপেক্ষা না করেই অসন্তুষ্ট গলায় বলল, কত লোক যে আজ পঙ্গু হয়েছে–ভয়াবহ!
রস্তভ তার কথায় কান দিল না। আগুনের উপরে ঝলসানো বরফের টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়ে গেল রাশিয়ার শীতকালের একটি আতপ্ত উজ্জ্বল গৃহকোণের কথা, তার পুরু লোমের কোট, দ্রুতগতি স্লেজ-গাড়ি, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল দেহ এবং পরিবারের সকলের স্নেহ ও যত্নের কথা। অবাক হয়ে ভাবল, কেন আমি এখানে এলাম?
ফরাসিরা পরদিন আর নতুন করে আক্রমণ করল না। ব্যাগ্রেশনের অবশিষ্ট সৈন্যরা কুতুজভের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হল।
০৩.১ প্রিন্স ভাসিলি
তৃতীয় পর্ব – অধ্যায়-১
ভেবেচিন্তে পরিকল্পনা করে সেই মতো কাজ করার লোক প্রিন্স ভাসিলি নয়। নিজের সুবিধার জন্য অন্যের ক্ষতি করার কথাও সে ভাবতে পারে না। সে একজন সাধারণ সংসারী লোক, এগিয়ে চলতে চলতে এগিয়ে চলাটাই তার স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। নিজে থেকে কোনো পরিকল্পনা সে করে না, কোনো কৌশলও উদ্ভাবন করে না, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও মানুষজনের ভিতর থেকেই তার পরিকল্পনা ও কৌশল গড়ে ওঠে। এই ধরনের পরিকল্পনা শুধু একটি-দুটি নয়, ডজন ডজন তার মাথায় ঘোরে, কতকগুলি সবে গড়ে উঠছে, কতকগুলি বাস্তবে রূপায়িত হবার পথে। আবার কতকগুলি নষ্ট হবার পথে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, সে কখনো নিজের মনে বলে না! এই লোকটির প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে, তার বিশ্বাস ও বন্ধুত্ব আমাকে অর্জন করতে হবে, এবং তাকে দিয়ে একটা বিশেষ কাজ গুছিয়ে নিতে হবে। অথবা এ কথাও সে বলে না, পিয়ের ধনী লোক, তাকে ভুলিয়ে আমার মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে, এবং তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় চল্লিশ হাজার রুবল ধার নিতে হবে। কিন্তু কোনো পদস্থ লোকের সঙ্গে দেখা হওয়া মাত্রই তার মা তাকে বলে দেয় যে এই লোকটি কাজে লাগতে পারে, আর অমনি আগে থেকে কিছু না ভেবেচিন্তেই প্রিন্স ভাসিলি প্রথম সুযোগেই তার বিশ্বাস অর্জন করে, তাকে খোসামোদ করে, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয় এবং শেষপর্যন্ত একটা অনুরোধ পেশ করে।
মস্কোতে পিয়েরকে হাতের কাছে পেয়ে সে তাকে শয়নকক্ষের দ্ৰজন পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করে দিয়ে রাষ্ট্রীয় কাউন্সিলের মর্যাদা পাইয়ে দিল এবং যুবকটিকে ধরে বসল, তার সঙ্গে পিটাসবুর্গে গিয়ে তার বাড়িতেই বাস করতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে আপন-ভোলা হলেও সে যে ঠিক কাজটি করছে সে বিষয়ে একান্ত নিশ্চিত হয়েই প্রিন্স ভাসিলি সাধ্যমতো চেষ্টা করতে লাগল যাতে পিয়ের তার মেয়েকে বিয়ে করে। আগে থেকে পরিকল্পনা করে নিলে ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন মর্যাদার লোকদের সঙ্গে মেলামেশার ব্যাপারে সে কখনো এত বেশি সহজ, স্বাভাবিক ও অবিচলিত হতে পারত না। এমন একটা কিছু আছে যা তাকে সর্বদাই অধিকতর ধনী ও প্রতিপত্তিশালী লোকদের দিকে টানে, আর সেই সব লোকদের দিয়ে কাজ গুছিয়ে নেবার শুভক্ষণটিকে আঁকড়ে ধরবার একটা বিরল দক্ষতাও তার অধিগত।
কিছুদিন আগেও পিয়ের ছিল নিঃসঙ্গ মানুষ, কোনো চিন্তা-ভাবনা তার ছিল না, কিন্তু এখন অপ্রত্যাশিতভাবে কাউন্ট বেজুখভও মস্তবড় ধনী মানুষ হয়ে যাওয়ায় তার ঝুট-ঝামেলা ও কাজকর্ম এত বেড়ে গেছে যে রাতে শোবার আগে সে আর নিজেকে খুঁজে পায় না। অনেক কাগজপত্রে সই করতে হয়, উদ্দেশ্য না জেনেই সরকারি অফিসে হাজিরা দিতে হয়, প্রধান নায়েবের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে হয়, মস্কোর নিকটবর্তী জমিদারি দেখতে যেতে হয়, আর এমন সব লোককে স্বাগত জানাতে হয় যারা আগে তার অস্তিত্বের খবরটাও রাখত না, অথচ এখন তাদের সঙ্গে দেখা না করলে তারা অসন্তুষ্ট হবে, ক্ষুব্ধ হবে। এই সমস্ত লোকজন ব্যবসায়ী, আত্মীয় ও পরিচিত জন-সকলেই এই তরুণ উত্তরাধিকারীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব কামনা করে তার স্তাবকতা করে, সকলেরই দৃঢ় ধারণা যে পিয়ের বহু সদগুণের অধিকারী। এমন কি যে সব লোক আগে তার প্রতি বিরূপ ছিল, তার সঙ্গে অমিত্রসুলভ আচরণ করত, তারাও এখন তার প্রতি অনুরক্ত ও স্নেহশীল হয়ে উঠেছে। এমন কি সেই কোপনস্বভাবা বড় রাজকুমারীও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরে পিয়েরের ঘরে এসেছিল। চোখ নামিয়ে বারবার মুখটা লাল করে সে তাকে বলেছে : অতীতের ভুল-বোঝাবুঝির জন্য সে খুবই দুঃখিত, সে জানে যে পিয়েরে কাছে। কোনো কিছু চাইবার অধিকার তার নেই, তবু যে বাড়িকে সে এত ভালোবাসে, যে বাড়িতে সে অনেক কিছু ত্যাগ করেছে, সেই বাড়িতে আরো কয়েক সপ্তাহ থাকবার অনুমতি সে চাইছে। বলতে বলতে সে কেঁদে ফেলল। প্রস্তর-মূর্তিটির মতো অবিচল এই রাজকুমারীর এতাদৃশ পরিবর্তন দেখে পিয়ের তার হাতটি ধরে তার কাছে ক্ষমা চাইল, অথচ কিসের জন্য ক্ষমা তা সে জানে না। সেদিন থেকেই পিয়েরের প্রতি বড় রাজকুমারীর মনোভাব সম্পূর্ণ বদলে গেল, সে পিয়েবের জন্য একটা ডোবা-কাটা স্কার্ফ বুনতে শুরু করল।
রাজকুমারীর উপকারের জন্য একটা দলিল সই করাতে সেটাই পিয়েরের হাতে দিয়ে প্রিন্স ভাসিলি বলল, আমার জন্য তুমি এটা কর বাবা, আর যাই হোক, মৃত ব্যক্তিটির জন্য সে অনেককিছু সহ্য করেছে।
